মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যু পরবর্তী গার্ড অব অনার প্রদান সম্বন্ধীয় সংসদীয় কমিটির প্রস্তাবে সংক্ষুব্ধ দেশের ২৪ বিশিষ্টজন

সম্প্রতি জাতীয় পত্রিকায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার প্রদানে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও)বিকল্প নির্ধারণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। গত ১৩ জুন ২০২১ রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়েছে বলে পত্রিকা সূত্রে জানাগেছে। প্রকিাশিত সংবাদ অনুযায়ী- সাধারণত নারীরা জানাজায় অংশ নেন না এবং এটি নিয়ে সমাজে অনেকে প্রশ্ন তোলেন- এমন অযুহাতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে যেখানে নারী ইউএনও আছেন, সেখানে বিকল্প পুরুষ কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা এ ধরনের কোনো কর্মকর্তাকে বিকল্প হিসেবে নির্ধারণের জন্য সংসদীয় কমিটি সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও তা সুপারিশ আকারে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দেশের ২৪ বিশিষ্ট নাগরিক।আজ (১৪ জুন) বিবৃতি দাতাদের অন্যতম ও সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে নাগরিক’রা বলেন, ‘আমরা সংক্ষুব্ধ-ব্যথিত।’ তাছাড়া এধরনের প্রস্তাব ও সুপারিশ মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অর্জনের ফসল জাতীয় সংসদকে হেয় প্রতিপন্ন করাসহ জাতীয় আকাঙ্খার প্রতিও অসম্মান প্রদর্শন করেছে বলেও মনে করেন উক্ত নাগরিকরা।
এদিকে এ ধরনের প্রস্তাব ও সুপারিশ ধর্মীয় মিশেলে রাষ্ট্রাচার তৈরির একটি গভীর ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করে আরো বলা হয় যে, এই প্রস্তাব সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮ (১) ও (২) এ বর্ণিত যথাক্রমে- “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীÑপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না” এবং “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরের নারীÑপুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন” এর লঙ্ঘন। সাংসদ কর্তৃক সংবিধান লঙ্ঘনের অপরাধ অগ্রহণযোগ্য ও নৈতিকতার পরিপন্থি বলেও মনে করেন নাগরিকরা।
যারা জাতীয় সংসদে এ ধরনের প্রস্তাব ও সুপারিশ প্রণয়নের সাথে যুক্ত তারা কোনোভাবেই নারীর মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় দাবী করে বিবৃতিদাতারা আরো উল্লেখ করেন যে, গার্ড অব অনার রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন এর সাথে জানাজার তুলনা করাও দুঃখজনক। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যারা, এই প্রস্তাব ও সুপারিশ প্রণয়ন করেছেন, তারা প্রত্যেকেই সংবিধান রক্ষার শপথ ভঙ্গ করেছেন বলেও মনে করেন বিবৃতিদাতারা।

এছাড়া একজন সাংসদ যখন সংবিধান রক্ষার শপথ রক্ষায় ব্যর্থ হন তখন মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ তার কাছে কোনোভাবেই নিরাপদ থাকেনা দাবী করে বিবৃতিদাতারা গভীর উদ্বেগের সাথে জানান যে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অভ্যন্তরে যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তির প্রকাশ্য প্রবণতা বিদ্যমান, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্খা সুদূর পরাহত। অনতিবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রস্তাব ও সুপারিশ প্রত্যাহারের আহবানও জানান বিবৃতিদাতারা।
এ ধরনের সুপারিশ থেকে বিরত থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে সংসদীয় কমিটি সচেষ্ট হবেন আশা করে বিবৃতি দাতারা আরো বলেন, এ ধরনের সুপারিশ ও ধর্মের নামে যারা নারীর সমÑঅধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধেও দেশের বিবেকবান মানুষদের সোচ্চার হওয়ার আহবানও জানান তাঁরা।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী নাগরিকরা হলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, ঐক্য ন্যাপ সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ বিরোধী মঞ্চের সদস্য সচিব ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত, মহিলা পরিষদ সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নারী নেত্রী খুশী কবির, উন্নয়ন কর্মী রোকেয়া কবীর, জাতীয় শ্রমিক জোট সভাপতি মেসবাহ উদ্দীন আহমেদ, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল বারী, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদেও চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ পিন্টু, ঢাবি’র সিনেট সদস্য রনজিৎ কুমার সাহা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, সংস্কৃতি কর্মী এ কে আজাদ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি পারভেজ হাসেম, আইনজীবি, গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক জীবনানন্দ জয়ন্ত, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক, দীপয়ন খীসা, সংস্কৃতি কর্মী ড. সেলু বাসিত, বাংলাদেশ ছাত্র মেত্রীর সভাপতি কাজী আব্দুল মোতালেব জুয়েল ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল) সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রাহাত প্রমুখ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *