ধুবুরাজ বানাইদের ৩টি গরুর সন্ধান কি আর হবে না!- সোহেল হাজং

ধুবুরাজ বানাইয়ের সাথে আজ কথা হল। অনেকটা আক্ষেপ করে বলল, “আমাদের বিষয়টা কোন অগ্রগতি দেখছি না। কেমন হবে!”
ধুবুরাজ চন্দ্র বানাই। গ্রাম মোহনপুর, থানা মধ্যনগর, উপজেলা-ধর্মপাশা, জেলা-সুনামগঞ্জ। সে নেত্রকোণা কলেজের বাংলা বিভাগের একজন অনার্সের ছাত্র। ফেসবুকে তার সাথে আমার পরিচয়।

গত ৫ জুন সে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানায়, আগের দিন অর্থাৎ ৪ জুন সন্ধ্যায় তাদের গোয়াল ঘর থেকে ১টি ষাঁড় গরু, ও ২টি গাভী (গর্ভবতী) কারা যেন বের করে নিয়ে গেছে। সে এর সাথে যে তথ্যটি দিয়েছিল তা আরো ভয়ানক- একজন প্রতিবেশি বাঙালি তাদের জমি জোর করে দখল করে খাচ্ছে। বিকেলে এ ভূমি বিষয়টি নিয়ে ভূমিদস্যুদের সাথে তাদের কথা কাটাকাটি হয় এবং ভূমিদস্যুরা তাদেরকে হুমকিও দেয়। সেজন্য এ গরুগুলো চুরির সন্দেহের তীরটি তাদের দিকে। এ বিষয়ে মধ্যনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গরুগুলো তারা খুঁজে দেখবেন। কিন্তু ধুবুরাজ জানাল, গত এক সপ্তাহে এই নিষ্পাপ প্রাণিগুলোর খোঁজ কোথাও মেলেনি। কেউ এ নিয়ে কোন আশার কথা তাদের শোনাতে পারছে না। করোনার এই মহাদূর্যোগের দিনে দরিদ্র পরিবারের অন্যতম সম্বল লক্ষাধিক টাকার গরুগুলো হারিয়ে ধুবুরাজের পরিবার এখন অনেকটা অসহায়। পাশে কেউ নেই।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এরকম ঘটনা কি একটুও অদ্ভুত ও বেমানান মনে হচ্ছে না! এখনও প্রভাবশালী মহল এদেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিরীহ ও সংখ্যালঘু আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেয়। দেশান্তরি করার হুমকি দেয়। নারীদের প্রতি সহিংসতা চালায়। কোন গবাদিপশু পালনের চেষ্টা করলেও সেটাও কেড়ে নেয়। প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের কাছে বিচার চাইলে তারা বলে ব্যাপারটি দেখবে। এ পর্যন্তই। অসহায়, নিরীহ ও প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা আর ন্যায় বিচার পায় না। একসময় তারা সবকিছু হারিয়ে লজ্জায়, ঘৃণায়, নিরবে এদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

সেরকমই সমতলের বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি বিলীয়মান, অসহায় ও সংখ্যায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নাম ‌’বানাই’। হাজংদের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে তাদের সংস্কৃতির অনেকটা মিল। এই বানাই জাতিগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা কমতে কমতে আজ মাত্র কয়েকশতে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ বলেন তাদের বর্তমান মোট জনসংখ্যা এক হাজারের বেশি হবে না।

ছবি: মোহনপুর গ্রামের বানাই শিশু।

সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর থানার মেঘালয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মোহনপুর ও বহেরাতলি এই দুইটি গ্রামেই দেশের অধিকাংশ বানাইদের বসবাস। মোহনপুর গ্রামে বানাইদের অবস্থা সম্পন্ন বলতে ধুবুরাজ বানাইদের পরিবারটিই কিছুটা ছিল। ধুবুরাজের বাবা সত্যলাল বানাই এবং কাকা হেমলাল বানাই, তারা আপন দুই ভাই। উত্তরাধিকারসূত্রে পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি এই দুই ভাইয়ের মধ্যে একভাই হেমলাল বানাই আস্তে আস্তে প্রতিবেশি প্রভাবশালী ওদুদ মিয়া নামে এক বাঙালির কাছে টাকা নিয়ে তার ভাগের ১৮ কাঠা জমি বিক্রি করেন। কিন্তু এই ওদুদ মিয়ার প্রতি বানাই দুই ভাইয়েরও সম্পত্তি (৩৬ কাঠা) দখল করে বসে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জমির দলিল ও কাগজ সব বানাইদের নামে। ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা (যাকে সমতলের আদিবাসীদের ভূমির রক্ষাকবচ বলা হয়) এখানে যেন অকার্যকর! কিছুতেই বিক্রি না হওয়া জমিটি উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও এলাকার মাতব্বরদের কাছে বিচার চাইলে, ভূমিদস্যুসহ সবাই বলে গ্রাম্যসালিশ করে বিষয়টি সুরাহা করবে কিন্তু সে সময় আর আসে না। বিষয়টিও আর সুরাহা হয় না। আর এদিকে বানাইদের জমিটি নির্দ্বিধায় ভূমিদস্যুরা দখল করেই খাচ্ছে।

কেউ যেন দেখেও দেখছে না, শুনেও শুনছে না। সত্যলাল বানাই ও তার পরিবার এ অবৈধ দখলের বিপক্ষে বাধা দিলে গেলে উল্টো বাঁধে বিপত্তি ও তাদের ওপরে আসে নানাধরনের হুমকি। ধুবুরাজ বানাই এসব অন্যায়ের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করলে তাকেও লোকজন দিয়ে ফোন করিয়ে হুমকি দেয়া হয়। এভাবেই চলে রাষ্ট্র থেকে দুর্বল, নিরীহ ও আদিবাসীদের নির্যাতন ও বিতাড়নের চিরায়ত ষড়যন্ত্র। সরকারের শত প্রতিশ্রুতি থাকলেও, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে গলা উঁচু করে অনেকে কথা বললেও এসব দুর্বলদের পাশে সময়মতো কাউকে পাওয়া যায় না। কোন কোন ক্ষেত্রে কিছুটা হৈচৈ হলেও প্রকৃত ক্ষতিটা অপূরণই থেকে যায়। দিনশেষে পাড় পেয়ে যায় অপরাধী, ভূমিদস্যু ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। আদিবাসীরা হয় দেশান্তরী অথবা নিঃস্ব।

ধুবুরাজ বানাইয়ের ৩টি গরু কিংবা ভুমি হারানোর বিষয়টি কি কারো কাছে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে? কিন্তু এ বিষয়টি ঠিকই ধুবুরাজ বানাই, তার পরিবার কিংবা গ্রামের অসহায় আদিবাসী মানুষের জীবনে অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রাষ্ট্র যদি এটি বুঝবার চেষ্টা না করে তাহলে “কাউকে পেছনে ফেলে নয়” কিংবা ‘সকলের জন্য সমান রাষ্ট্র’ এসব কথা বলার মানে কি!

সোহেল হাজং- সদস্য, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।
১১ জুন ২০২১।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *