২৫ বছরেও খোঁজ নেই কল্পনার: রাষ্ট্রের চরম অমনোযোগীতা ও অবহেলা দেখছেন বিশিষ্টজনরা

আজ ১২ জুন ২০২১। চাঞ্চল্যকর কল্পনা চাকমা অপহরণের ২৫ বছর হতে চলেছে। ১৯৯৬ সালের এই দিনেই দিবাগত রাত আনুমানিক ১:৩০ টা হতে ২:০০ টার মধ্যে রাঙ্গামাটি জেলাধীন বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউলাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত কর্তৃক নির্মমভাবে অপহরণের শিকার হন। অপহরণকারীরা এসময় কল্পনার দুই বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা (কালীচরণ) ও লাল বিহারী চাকমা (ক্ষুদিরাম)কেও বাড়ির বাইরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করে।এই অপহরণের ঘটনায় সামনে আসে আইন রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যের জড়িত থাকার কথা।

উক্ত অপহরণের পর কল্পনার বড় ভাইয়েরা জানান যে তাঁরা স্পষ্টতই টর্চের আলোতে অপহরণকারীদের মধ্যে তাদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী কজইছড়ি সেনাক্যাম্পের কমান্ডার লেঃ মো: ফেরদৌস কায়ছার খান এবং তার পাশে দাঁড়ানো ভিডিপি সদস্য মো: নূরুল হক ও মো: সালেহ আহম্মদকে চিনতে পারেন।

কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার পর দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ও নিন্দার মুখে সরকার কিছুদিনের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও বিগত ২৩ বছরেও সরকার সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি বলে ক্ষোভ রয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও পাহাড়ের নারী তথা আদিবাসী সংগঠনসমূহের মধ্যে।

এদিকে কল্পনা অপহরণের বিষয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা লিখেছেন, কল্পনা চাকমা অপহরণের ২৫ বছর। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আয়ুষ্কালের অর্ধেক। ২৫ টি বছরে এই অপহরণের সাথে জড়িত কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। মামলার এজাহারে তৎকালীন কজইছড়ি সেনাক্যাম্পের কমান্ডার লেঃ ফেরদৌস সহ বেশ কয়েকজনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কল্পনা চাকমা হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। কাচলং কলেজে বিএ ছাত্রী ছিলেন। দূর জনপদের এক প্রান্তজনের প্রতিবাদী কণ্ঠ রাষ্ট্রের এক দাম্ভিক প্রতিনিধির সহ্য হয়নি। কল্পনা চাকমার দ্রোহী আওয়াজ রাষ্ট্রীয় ঐ দাপুটে কর্তার নিকট ঔদ্ধত্য মনে হয়েছে। তাই অপহরণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার পথে হেঁটেছে সেই দাপুটে কর্তা।

তিনি আরেক পোস্টে লিখেছেন, আজ ২৫ বছরে সেই স্মৃতি এখনও অম্লান। অপহরণ মামলার আাসামীরা কেউ একজন গ্রেফতারও হয়নি। কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটাবলী খতিয়ে দেখার জন্য একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনও গঠন করা হয়। কমিশনের সেগুন বাগিচার অস্থায়ী কার্যালয়ে আমিও সাক্ষ্য প্রদান করেছিলাম। সেই কমিশন তাদের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেনি দীর্ঘ ২৫ বছরে। ইতিহাসের এই কলংক মোচন হয়নি এখনও। রাষ্ট্র বড়ই নির্বিকার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন আইপিনিউজকে বলেন, কল্পনার অপহরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানাভাবে ছাপ ফেলে। তার মধ্যে তিনটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত এই ঘটনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় মদদে পাহাড়ে নারী নিপীড়ন তথা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দাপটকে স্পষ্ট করে, দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের জাতীয় নারী আন্দোলন ও পাহাড়ের নারীদের আন্দোলনের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপিত হয় এবং তৃতীয়ত, পাহাড়ের নারী হিসাবে কল্পনা চাকমা পুরো বাংলাদেশের নারী নিপীড়নের প্রতীক হিসাবে উঠে আসে।

তবে কল্পনা চাকমা’কে কেবল দিবস ভিত্তিক স্মরণ না করে সমগ্র লড়াই ও আন্দোলনের সকল ক্ষেত্রে কল্পনাকে স্মরণের কথাও আইপিনিউজকে বলেন ঢাবির এই শিক্ষক। কল্পনা অপহরণের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এতেই প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্র এখানে অনেক কিছু লুকানোর চেষ্টা করেছে।রাষ্ট্রের অমনোযোগীতা ও অবহেলার মধ্য দিয়ে পাহাড়ে নারী নিপীড়নকে কার্যত বৈধতা দেয়া হচ্ছে বলেও মনে করেন এই শিক্ষক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কল্পনার সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শান্তি দেবী তঞ্চঙ্গ্যা আইপিনিউজকে বলেন, ২৫ বছর ধরে কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে সন্ধান না দেয়ার জবাব রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না। কল্পনা চাকমা অপহরণ তদন্ত ঢিলেমি ও বিচারহীনতা জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জুম্ম জাতি সমূহের প্রতি চরম নির্যাতন ও বৈষম্যকে উন্মোচিত করেছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসহ কল্পনা চাকমার অপহরণকারীদের শাস্তির দাবিও জানান।

এদিকে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নিপন ত্রিপুরা লিখেছেন, ২৫ বছর ধরে খোঁজ না পাওয়া বোন কল্পনাকে রাষ্ট্র বোধহয় আর হদিস দিবে না। শাসকগোষ্ঠী কল্পনাকে অপহরণ করে ভুল করেছে। জুম্মদের আন্দোলনের ভিত্তিভূমি থেকে সরিয়ে দিতে শাসকগোষ্ঠী অপহরণ করেও সরিয়ে দিতে পারেনি, (তার) বদলে জুম্মরা আরো বেশী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে।

এদিকে কল্পনা অপহরণের ২৫ বছর’কে সামনে রেখে আজ রাঙ্গামাটিতে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির উদ্যোগে সকালে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া বিকালে চট্টগ্রামে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও হিল ‍উইমেন্স ফেডারেশনের উদ্যোগে প্রতিবাদী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।

কল্পনা অপহরণ ঘটনার সর্বশেষ:
১৯৯৬ সালের এই দিনেই দিবাগত রাত আনুমানিক ১:৩০ টা হতে ২:০০ টার মধ্যে রাঙ্গামাটি জেলাধীন বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউলাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করা হয়। কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনাটি আজ ২৩ বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও এই রাষ্ট্র, সরকার, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল বিভিন্ন বিভাগ ও প্রশাসন কল্পনা চাকমার হদিস দিতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। এছাড়াও অভিযুক্ত অপহরণকারীদের কাউকেই গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে পারেনি। অপরদিকে কল্পনা অপহরণ ঘটনার প্রতিবাদে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে ডাকা ২৭ জুন ১৯৯৬ অর্ধদিবস সড়ক অবরোধ চলাকালে আবার তৎকালীন বাঘাইছড়ি সেনা কর্তৃপক্ষের মদদে স্থানীয় ভিডিপি ও সেটেলারদের সাম্প্রদায়িক হামলায় বাবুপাড়া ও মুসলিম ব্লক এলাকায় গুলি করে রূপন চাকমাকে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমাকে নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রেও সরকার বা প্রশাসন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করে আসছে পাহাড়ের আদিবাসী সংগঠনগুলো। সর্বশেষ কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনা ও মামলার বিশ বছর ও পাঁচ মাসের অধিক সময় পর গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ মামলার ৩৯তম তদন্ত কর্মকর্তা রাঙ্গামাটির তৎকালীন পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান তাঁর চূড়ান্ত রিপোর্ট রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কগনিজেন্স আদালতে দাখিল করেন।তাঁর রিপোর্টেও পূর্বের রিপোর্টের মত বলা হয় যে, ‘…সার্বিক তদন্তে লেঃ ফেরদৌস, ভিডিপি নূরুল হক ও পি.সি সালেহ আহমেদের উক্ত ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নি। এমনকি রিপোর্টে ‘কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছে মর্মে প্রাথমিকভাবে সত্য বলিয়া প্রমাণিত হয়’ বলে স্বীকার করা হলেও ‘দীর্ঘ ২০ বৎসর ৩৯ জন তদন্তকারী অফিসারের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কল্পনা চাকমাকে অদ্যাবধি উদ্ধার করা সম্ভব হয় নাই এবং অদূর ভবিষ্যতেও সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ’ বলে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ‘ভবিষ্যতে কল্পনা চাকমা সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া গেলে বা তাহাকে উদ্ধার করা সম্ভব হইলে যথানিয়মে মামলাটির তদন্ত পুনরুজ্জীবিত করা হইবে’ বলে কার্যত মামলার কার্যক্রম বা তদন্ত কাজ বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *