প্রথমবারের মতো “আদিবাসী যুব সংলাপ” অনুষ্ঠিত

গত ৩ জুন ২০২১, বৃহস্পতিবার, দুপুর ১২.০০ টায় বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো অনলাইন আদিবাসী যুব সংলাপ ২০২১: কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসী তরুণ ও যুবদের ভূমিকা ও সার্বিক অবস্থা শীর্ষক অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সহ-সভাপতি চন্দ্রা ত্রিপুরার সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আন্তনী রেমার সঞ্চলনায় উক্ত অনলাইন আলোচনায় ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক রিপন চন্দ্র বানাই, শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী তপু ত্রিপুরা, শিক্ষক ধীরেন মাহাতো, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি ম্যাথিউ চিরান, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সদস্য অনুপ মুন্ডা, সদস্য স্যালভেসন সুচিয়াং , উদ্যোক্তা ত্রিশিলা চাকমা ও স্বাস্থ্যকর্মী ডচেংনু চৌধুরী। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আদিবাসী ছাত্র, নারী ও যুব প্রতিনিধিবৃন্দ ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সহ-সভাপতি চন্দ্রা ত্রিপুরা তাঁর সূচনা বক্তব্যে বলেন, “ককমা” ত্রিপুরাদের ভাষা, যার অর্থ হচ্ছে সংলাপ। এটি বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম প্রতিষ্ঠার পর প্রথম অনলাইন সংলাপ। এ সংলাপের মধ্য দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করা আদিবাসীদের সার্বিক অবস্থা, বিশেষত আদিবাসী যুবদের নানা সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা করা হবে। বৈশ্বিক এ মহামারি করোনার সময়ে আদিবাসীদের শিক্ষা, চিকিৎসা, সংস্কৃতি, কর্মসংস্থান ও মানবাধিকার পরিস্থিতি দেশে কোন পর্যায়ে রয়েছে তা নিয়ে আমাদের বিশদভাবে আলোকপাত করা দরকার বলে মনে করেন চন্দ্রা ত্রিপুরা। আদিবাসী যুবদের এ সংলাপ মাসে একবার করে অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানান তিনি।

আদিবাসী যুব ফোরামের সদস্য অনুপ মুন্ডা বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি কোভিড-১৯ মহামারি এ এলাকায় আদিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে এখানকার স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীরা ইটের ভাটায় দিনমজুরের কাজ করছে। করোনার এ মহামারিতে স্কুল-কলেজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থীর মূল্যবান শিক্ষাজীবন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

করোনার এ মহামারিতে আদিবাসীদের ভূমি প্রতিনিয়ত দখল হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন আদিবাসী যুব ফোরামের অন্যতম সদস্য স্যালভেশন সুচিয়াং । তিনি আরো বলেন, গত ৩১ মে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় খাঁসিয়া পুঞ্জিতে হাজার হাজার পানগাছ কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তাছাড়া বনখোলা পুঞ্জিও দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। তিনি আদিবাসী যুবদের প্রশংসা করে বলেন, যুবরাই হচ্ছে তারুণ্যের শক্তি, যেমনিভাবে গ্রামে গ্রামে সচেতনতার মধ্য দিয়ে আমাদের খাঁসিয়া পুঞ্জিগুলোতে কোভিড-১৯ সময়ে কঠোর লকডাউন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি ম্যাথিও চিরান বলেন, কোভিড-১৯ সময়ে এদেশের আদিবাসীরা মারাত্মকভাবে মানবাধিকার লংঘণের শিকার হয়েছেন। সমতল অঞ্চলে হোক বা পার্বত্য চট্টগ্রামে হোক সব জায়গায় মানবাধিকার লংঘণের পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি বান্দরবানে চিম্বুকের নাইতং পাহাড়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সিকদার গ্রুপ কর্তৃক ভুমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। তথাকথিত উন্নয়নের নামে সেখানে তারা পাঁচ তারকা “ম্যারিয়ট হোটেল” নির্মাণ করার পায়তারা চালাচ্ছে। পাশাপাশি মধুপুর বানাঞ্চলে মান্দিদের শশ্বানভূমি, সিলেটের কুলাউড়ায় খাঁসিয়াদের পানগাছ, সাতক্ষীরায় মুন্ডাদের জায়গা জমিসহ দেশের বেশকিছু এলাকায় আদিবাসীদের জায়গা জমি দখলের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

আদিবাসী তরুণ শিক্ষক তপু ত্রিপুরা বলেন, করোনার সময়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠির পাশাপাশি আদিবাসী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকার অনলাইনের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল রাখার চেষ্টা করলে দুর্গম পাহাড়ী এলাকার শিক্ষার্থীরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েই গেছে। যেখানে আদিবাসীরা দু’বেলা পর্যাপ্ত খেতে পাচ্ছে না, সেখানে ইন্টারনেট প্যাক বা ডাটা ক্রয় করে তাদের ছেলেমেয়েদের অনলাইনে ক্লাস করানো তাদের পক্ষে রীতিমত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া দুর্গম পার্বত্য এলকায় পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক না থাকায় এখানকার আদিবাসী শিক্ষার্থীরা নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। ফলে শিক্ষকরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন বলেও জানান আদিবাসী এই তরুণ শিক্ষক।

বনফুল আদিবাসী গ্রীন হার্ট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক ধীরেন মাহাতো বলেন, পাহাড়ের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সমতলের আদিবাসীদের শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং অন্যান্য বিষয়গুলো একেবারেই আলাদা। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন আদিবাসী এলাকায় করোনা সংক্রমণ না থাকলেও তাদের কর্মসংস্থান ও আয়ের নানা উৎসগুলো সংকুচিত হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীই শ্রমিক বা বিভিন্ন খন্ডকালীন কাজ করছে। আবার যারা কোন ধরনের কাজ যোগার করতে পারেনি তাঁরা হতাশার মধ্যে আছে। অনেকেই মাদক সেবনসহ অন্যান্য অসামাজিক কার্যকলাপে যুক্ত হচ্ছে। এখনই কোন ব্যাবস্থা না নেওয়া গেলে সামনে আদিবাসী যুবদের অবস্থা আরও শোচনীয় হবে বলে মনে করেন তিনি।

স্বাস্থ্যকর্মী ডচেংনু চৌধুরী বলেন, এই করোনা মহামারীর সময়ে আদিবাসী যুবদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি হয়েছে। আয়ের উৎস কমে যাওয়ায় কিংবা আয়ের উৎস অনেকের বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ আদিবাসী কিশোরীরা মাসিকের সময় স্যনিটারি ন্যাপকিন কিনতে কিনতে পারছেনা। স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে না পারার কারণে কাপড় ব্যবহার বা বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর উপায় অবলম্বন করছে। যেটা তাদেরকে আরও বেশি স্বাস্থ্যঝুকির মধ্যে ফেলছে।

এদিকে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এখন মোবাইল গেমসে আসক্ত হয়ে আছে। যেটা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে খিটখিটে মেজাজ সহ নানাবিধ মানসিক রোগের শিকার হচ্ছে। তাছাড়া পড়াশোনা শেষ না হওয়ায় এবং আয়ের উৎস না থাকায় অনেকেই হতাশার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। হতাশাগ্রস্থ অনেকেই নানা মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এখনই আমাদের এ ব্যাপারে কার্যকঅরি পদক্ষে নেওয়া উচিত।

আদিবাসী তরুণী উদ্যোক্তা ত্রিশিলা চাকমা বলেন, করোনার এই সময়ে আদিবাসী যুব সমাজের মধ্যে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অনেকে চাকরি হারিয়ে হতাশার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছেন। কেউ কেউ অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছেন। আদিবাসীদের অনলাইন ব্যবসার অন্যতম প্লাটফর্ম “সাবাংগী”। এর মাধ্যমে অনেকে নিজেদের প্রোডাক্ট রীতিমতো ক্রয়-বিক্রয় করে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে বলেও মনে করেন তরুণী এ উদ্যোক্তা।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের এ মহতি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক রিপন চন্দ্র বানাই বলেন, বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনার প্রভাব পড়েনি, এমন কোন ক্ষেত্র নেই। সবখানেই এর প্রভাব পড়েছে। করোনার সময়ে আদিবাসী যুবদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, যুবরাই তারুণ্যের অন্যতম শক্তি। তাদের দৈহিক ও মানসিক মনোবল থাকার কারণে অনেক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে এই করোনার সময়ে। “বনফুলের জন্য জুম্ম তারুণ্যের ভালবাসা” এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে আদিবাসী পাহাড়ী যুবক-যুবতীরা পাহাড়ের খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের ঘরে সকলের ভালবাসাস্বরুপ ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন। এটি যুবদের একটি অন্যতম মাইলফলক বলে মনে করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, কোভিড-১৯ সময়ে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি চরমভাবে লংঘিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের ভূমি কেড়ে নিয়ে তাদেরকে ভিটেমাটি থেকে বাস্তচ্যুত করা হচ্ছে। পার্বত্য এলাকায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ছত্রছায়ায় প্রতিনিয়িত সেটেলার বাঙালী কর্তৃক পাহাড়ীদের জায়গা জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে আদিবাসীদের হয়রানি, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়নের খবর রয়েছে। পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এর অন্যতম কারন বলে মনে করেন তিনি। তাই এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে পার্বত্য চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসহ আদিবাসীদের জোর করে নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ বন্ধের দাবি জানান আদিবাসী ফোরামের এই নেতা ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *