ঝুমন দাসের নিঃশর্ত মুক্তি চেয়ে ২৪ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি

সুনামগঞ্জের শাল্লার ঘটনার জেরে আটক ঝুমন দাস আপনের মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ২৪ বিশিষ্ট নাগরিক। আজ শুক্রবার (৪ জুন) আপনের নি:শর্ত মুক্তির দাবীতে উক্ত নাগরিকরা বিবৃতিতে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে বেড়ানো ও সামাজিক সংহতি বিনষ্টকারী সংগঠন হেফাজত ইসলামকে সমীহ করতে গিয়ে রাষ্ট্র ভিক্টিমদের ন্যায়বিচার বঞ্চিত করছে। এমতাবস্থায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঝুমন দাস আপনসহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতারকৃত সকলের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন এই বিশিষ্ট নাগরিকরা।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় যে, গত ১৭ মার্চ, ২০২১ তারিখ একটি ফেইসবুকের পোস্টকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের সমর্থকরা সুনামগঞ্জের শাল্লায় একটি গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে। ঘটনায় প্রকাশ হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বক্তব্যের প্রতিবাদে হবিপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামে এক যুবক ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন গত ১৬ মার্চ। এ ঘটনাকে ধর্মীয় উস্কানির অজুহাত দিয়ে ওই এলাকার হেফাজত নেতার অনুসারীরা রাতে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং পুলিশ ঐ রাতেই ঝুমন দাস আপনকে গ্রেফতার করে। কিন্তু ১৭ মার্চ সকালে কাশিপুর, নাচনী, চন্ডিপুরসহ কয়েকটি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামের মসজিদে মাইকিং করে সেখানে আক্রমনের জন্য লোকজন জড়ো করে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের কয়েক হাজার অনুসারী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে নোয়াগাও গ্রামে অতর্কিত পরিকল্পিতভাবে হামলা- ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।

বর্নিত ঘটনায় মামলা দায়েরের পর কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয় এবং এর প্রায় এক সপ্তাহ পর ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ঝুমন দাস আপনের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদি হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করে উল্লেখ করে বিবৃতিতে আরো বলা হয়, যে মামলায় ঝুমন দাস আপন আজ ৮০ দিন ধরে কারাগারে আটক রয়েছে। ঝুমন দাসের বিরুদ্ধে দায়েরককৃত মামলায় সুনামগঞ্জ মখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট জামিন প্রদান না করায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ঝুমন দাসের জামিনের আবেদন করা হয়। কিন্তু কয়েকদফা শুনানী শেষে বিজ্ঞ আদালত ঝুমনের জামিন মঞ্জুর করেননি। যদিও ইতোমধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসতিতে হামলা ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামিদের অনেকেরই জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে।

বিবৃতিদাতাদের অন্যতম ও সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ স্বাক্ষরিক উক্ত বিবৃতিতে আরো বলা হয়, শাল্লার নোয়াগাঁওয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসতিতে হামলা,ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। এর আগেও কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বসতিতে, যশোরের মালোপাড়া, ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়া-কর্ণাই, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, ব্রাক্ষ্ণণবাড়ীয়ার নাসিরনগর, রংপুরের পাগলাপীর, ভোলার বোরহান উদ্দিন, কুমিল্লার মুরাদনগরসহ বিভিন্ন স্থানে একইভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবীকে কটাক্ষ করে পোস্ট দিয়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অনুভুতিতে আঘাত দেওয়ার অযুহাত দেখিয়ে সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে।

এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় কঠোরতার বিপরীতে ভিক্টিমের প্রতিই রাষ্ট্রের কঠোরতা দৃশ্যমান, যা স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ একইসাথে সংবিধান পরিপন্থি বলেও মনে করেন বিবৃতিদাতারা।

ঝুমন দাস আপনের মুক্তি চেয়ে বিবৃতিদাতা বিশিষ্ট নাগরিকরা হলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, ঐক্য ন্যাপ সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সহ-সভাপতি রামেন্দু মজুমদার, মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি’র সভাপতি এস.এম. এ সবুর, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জাহিদুল বারী, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ বিরোধী মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার, মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির, উন্নয়ন কর্মী রোকেয়া কবির, ঢাবি অধ্যাপক ড. এম. এম. আকাশ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি এডভোকেট পারভেজ হাসেম, জাতীয় শ্রমিক জোট সভাপতি মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব) সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপয়ন খীসা, গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক জীবনানন্দ জয়ন্ত, সংস্কৃতি কর্মী ড. সেলু বাসিত, উঠোন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি অলক দাস গুপ্ত, আনন্দন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ক এ কে আজাদ, সমন্বয়ক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বিসিএল) সভাপতি গৌতম শীল প্রমুখ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *