খাসিদের জীবন অস্তিত্ব এবং জীবিকা দিনকে দিন আরও কোণঠাসা হচ্ছে – সিলভানুস লামিন

এক.
আমার ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে! কী করবো, কী বলবো বা কিভাবে প্রতিবাদ করবো, কোন ভাষা ব্যবহার করে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর পৌছাবো যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে? আজ সারাদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং কিছু কিছু পত্রিকায় বড়লেখার আগাড় পুঞ্জির হাজারও অধিক পান গাছের লতা কেটে দেওয়ার ছবি দেখলাম। কী করুণ সেই চিত্র! ধ্বংসাবশেষের পাশে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বেশ কয়েকজন মানুষ, যাদের চোখেমুখে অসহায়ত্ব এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যত স্পষ্ট দেখতে পাই। খাসি মানুষের কান্নারত সেই মুখমন্ডলগুলো আমার বুকে তীরের মতো বিদ্ধ করলো। কষ্টে, ক্রোধে আমার অন্তরাত্মা যেন কেঁপে উঠলো! কারণ আমিও তো খাসি মানুষ! আমার পরিবারও তো পানচাষ করে, পানচাষের মাধ্যমে আমরা জীবিকা নির্বাহ করি, এই পান চাষের আয় থেকেই আমি উচ্চশিক্ষা লাভ করেছি! আমার মতো অসংখ্য খাসি শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ ও তরুণীরাও পানচাষের আয় থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করছে! আগার পুঞ্জিতেও নিশ্চয়ই এরকম শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের অভিভাবকদের জীবিকায়নে এমন আঘাত নিশ্চয়ই তাদের শিক্ষালভাবে প্রভাব পড়বে! তাদের পড়ালেখার এখন কী হবে? তাদের অভিভাবকদের জীবন ও জীবিকা কীভাবে চলবে? ভাবতেই কেমন জানি বুকে মোচড় দিয়ে উঠে! কারণ এর আগে কুলাউড়ার ইছাছড়া, নুনছড়া, ঝিমাইসহ আরও অনেক খাসি গ্রামে এমন হামলা চালানো হয়েছে! প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবন-জীবিকা খাসিদের জীবন, অস্তিত্ব এবং জীবিকা দিনকে দিন আরও কোণঠাসা হয়েছে, আরও বিপন্ন হয়েছে এবং আরও অনিশ্চয়তায় ধাবিত হয়েছে। প্রশ্ন জাগে মনে, অদূর ভবিষ্যতে খাসিরা কী তাদের বাপ-দাদার বসতিভিটা ও জায়গা জমি ধরে রাখতে পারবে?

দুই
প্রকৃতির ওপর এমন আঘাত প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানও আহত হয়েছে, রক্তক্ষরণ হয়েছে। খাসিরা পরম যত্নে প্রকৃতির প্রধান উপাদান গাছসহ অন্যান্য উপাদান যেমন ঘাস, গুল্ম, বেত, ঝোপঝাড় সংরক্ষণ, রক্ষা পরিচর্যা করে আসছে। বনের প্রতিটি উপাদানই পানচাষের জন্য সহায়ক। ঘাস, বেত, গুল্ম ঝোপঝাড় খাসিদের পানবাগানের প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে আর গাছ তো পান চাষের প্রধান অবলম্বন। প্রতিটি খাসি গ্রামগুলোও প্রাকৃতিক উপাদানে ভরপুর। প্রকৃতিতে একটি খাদ্যশৃঙ্খল রয়েছে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানই একে ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা খাদ্যের জন্য, বাসস্থানের জন্য, শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য, সুস্থ থাকার জন্য এবং সর্বোপরি, জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য এই উপাদানগুলো পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল! বনের ওপর আঘাত কিংবা বনের উপাদানের ওপর সহিংস আচরণ তাদের এই নির্ভরশীলতার বন্ধনকে ছিন্ন করে। ফলশ্রুতিতে, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে নানান দুর্যোগ তৈরি হয়। প্রকৃতির প্রাকৃতিক যে উপাদান রয়েছে সেগুলো কিন্তু কৃত্রিমভাবে তৈরি বনাঞ্চলের (তথাকথিত সামাজিক বনায়ন, যা বিদেশী আগাসী বৃক্ষরোপণকে উৎসাহিত করে) উপাদানকে চিনে না। যেমন বুলবুলি পাখি ম্যানজিয়াম গাছের ফুল খায় না, কিংবা কাঠবিড়ালী আকাশী গাছ চিনে না! ইউক্যালিপটাস গাছের কোন কাজে আসে না প্রকৃতির প্রজাপতিসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র উপাদানগুলোর জন্য। খাসি এলাকায় এখনও জৈববৈচিত্র্য ভরপুর রয়েছে। কারণ খাসিরা তাদের জীবিকা প্রয়োজনেই বনসহ প্রকৃতিকে সুরক্ষা করে যাচ্ছে নিরন্তরভাবে! তাই খাসি গ্রামের পানসহ অন্যান্য সম্পদ নষ্ট করা মানে প্রকৃতিকে সহিংসতায় ফেলে দেওয়া।

তিন
প্রতিটি খাসি গ্রামই একেকটি কার্বন সিঙ্ক (Carbon Sink)! যারা নগরে বাস করেন (ঢাকাসহ অন্যান্য মেগাসিটি) তাদের বিলাসী জীবনে যেসব কার্বন নিঃসরণ হয় সেইসব কার্বন শোষণ করে খাসিদের ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা বনাঞ্চলগুলো। নগরে বা শহরে আমরা এসি, ফ্রিজসহ অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স ব্যবহার করি, কলকারখানায় নানান ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করে উৎপাদন করে আরাম আয়েশে জীবনযাপন করি। এসব ব্যবহারে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয় সেগুলো শোষণ করার জন্য আমাদের দেশের পর্যাপ্ত বনাঞ্চল নেই। ইউরোপ দেশগুলোতে কার্বন ক্রেডিট নামে একটি বাণিজ্য আছে যেখানে একটি দেশের সাথে আরেকটি দেশ কিংবা একটি এলাকার সাথে আরেকটি এলাকার কার্বন বাণিজ্য করতে পারে। এই বাণিজ্যে একটি দেশ বা একটি এলাকা তাদের কলকারখানা কিংবা অন্যান্য উৎপাদন ব্যবস্থায় যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করবে সেই পরিমাণ কার্বন শোষণ করার জন্য আরেকটি দেশ বা এলাকার বনাঞ্চল ক্রয় করে ওইসব কার্বন শোষণ করার জন্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের ঢাকা ৩০ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ করবে তার একটি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করার জন্য। কিন্তু সেই কার্বন শোষণ করার জন্য ঢাকার পর্যাপ্ত পরিমাণ বনাঞ্চল নেই! তাই এই কার্বন শোষণ করার জন্য ঢাকা সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক বনাঞ্চলকে কার্বণ শোষক হিসেবে বেছে নেয়। আর এই জন্য ঢাকা সিলেটকে একটি পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। খাসিদের সুদক্ষ ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা বনাঞ্চলগুলো কত মিলিয়ন টন কার্বন শোষণ করে আসছে তা পরিমাপ করা হলে বুঝা যাবে খাসিরা দেশের কত উপকার করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনে প্রশমনে তারা কত ভূমিকা রেখে আসছে।পরিবেশবাদীগণ এই বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। তবে এর জন্য খাসিরা এক পয়সা পায়নি! বরং বনাঞ্চলকে সুরক্ষার জন্য তাদেরকে নানানভাবে বির্সজন দিতে হয় জীবন ও জীবিকাকে।

চার
বাংলাদেশে একটি অসম্প্রদায়িক দেশ। এদেশে নানান ভাষার, ধর্মের, বর্ণের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে বসবাস করে আসছেন। মুষ্টিমেয় মানুষের হিংস্রতা, দুষ্কৃতি আচরণ, লোভ কিংবা হিংসা এ সম্প্রীতির অবয়বে দাগ লাগাতে চান। তাই তো তারা হামলা করেন, বিনষ্ট করেন নানান প্রাকৃতিক সম্পদ, বিপন্ন করেন নানান পেশার, শ্রেণীর, বর্ণের ও ধর্মের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে। আমরা ভালো করেই জানি, খাসিরা যে এলাকায় বাস করেন সে এলাকায় সদয়, উদার, অসম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষের সংখ্যাই বেশি। এই মানুষগুলো সাংবাদিক হতে পারেন, সরকারি কর্মকর্তা হতে পারেন, জনপ্রতিনিধি হতে পারেন কিংবা হতে পারেন ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ মানুষ। খাসিদের সাথে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নানান আদান প্রদান ও মিথষ্ক্রিয়া করেন। খাসিদের সাথে সহভাগিতা করেন নানান নানান পরামর্শ, বিনিময় করেন নানান উপকরণ। খাসিরাও তাদের সাথে একইভাবে বিনিময় ও সহভাগিতা করেন। যারা আগাড়সহ অন্যান্য পুঞ্জিতে আক্রমণ বা হামলা চালিয়েছেন তাদের চিহ্নিত করতে হবে সম্মিলিতভাবে। খাসিরা এই দেশের প্রাচীন বাসিন্দা, বহিরাগত নয়। এদেশের সম্পদ ভোগ করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। ক্ষমতা প্রয়োগ, অসাধু উপায় অবলম্বন কিংবা পেশীশক্তি প্রদর্শন করে কারও সম্পত্তি দখল করা যায়না; দেশের প্রচলিত আইনও এর বিপক্ষে। আশা করছি, প্রশাসনসহ এলাকায় উদার, অসম্প্রায়িক মানসিকতার মানুষ খাসিদের পাশে দাঁড়াবে, খাসিদের জীবন ও জীবিকা বাঁচানোর জন্য তারাও খাসিদের পাশে থাকবে।

সিলভানুস লামিন: গবেষক ও সাংবাদিক
(ফেসবুক থেকে সংগ্রহীত)

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *