ঝুমন দাসের নিঃশর্ত মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি ১৬ বিশিষ্ট নাগরিকের

সম্প্রতি সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংঘটিত ঘটনার জেরে আটক ঝুমন দাসের নিশর্ত মুক্তি ও তার বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবী জানিয়েছে ষোল বিশিষ্ট নাগরিক। সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাঁরা এই দাবী করেন। বিবৃতি দাতাদের অন্যতম এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা স্বাক্ষরিত উক্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, গত ১৭ মার্চ, ২০২১ তারিখ একটি ফেইসবুকের পোষ্টকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের সমর্থকরা সুনামগঞ্জের শাল্লার নোয়াগাঁও একটি গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণ থেকে জানা যায়, হেফাজতে ইসলামীর বিতর্কিত নেতা মামুনুল হকের সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অশালীন ও উগ্রবাদী বক্তব্যের প্রতিবাদে হরিপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামে এক যুবক ফেইসবুকে একটি পোষ্ট দেন গত ১৬ মার্চ, ২০২১ তারিখে। এ ঘটনাকে ধর্মীয় উস্কানির অজুহাত দিয়ে ওই এলাকার হেফাজত নেতার অনুসারীরা রাতে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং ঐ রাতেই ঝুমন দাস আপনকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয় যে, (গত) ১৭ মার্চ হেফাজত নেতা মামুনুল হকের কয়েক হাজার অনুসারী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে নোয়াগাও গ্রামে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ৭০/৭৫টি বাড়ী বাড়ীঘরসহ ৬টি মন্দির ভাংচুর করে এবং যথেচ্ছা লুটপাট চালায়। এখানেই শেষ নয় তথাকথিত ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া নিরাপরাধ ঝুমন দাসের বিরুদ্ধে পুলিশ ধর্মীয় অবমাননা, ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। কার্যত ঝুমন দাশ কোন অপরাধ না করেই এখনো জেল-হাজতেই রয়েছে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে কার্যতঃ তার কোন আইনগত ভিত্তি নেই বলেও উল্লেখ করেন বিবৃতি দাতারা।

বর্তমান সময়ে ফেসবুকে মিথ্যা স্ট্যাটাস দিয়ে ধর্মীয় অবমাননা করা হয়েছে এই অজুহাতে সংখ্যালঘুদের বাড়ী ঘরে হামলা করা, আগুন লাগানো একটি নির্যাতনের কৌশল হয়ে দাড়িয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে আরো বলা হয়, পাবনার সাঁথিয়া (২০১৩ সাল) , কক্সবাজারের রামু (২০১২ সাল), ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার নাসিরনগর (২০১৬ সাল) সব ক্ষেত্রে একই ধরণের গল্প তৈরীর প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। রংপুরের গংগাচড়া এবং ভোলার মনপুরার ঘটনাও এর ব্যতিক্রম নয়। এই সবক্ষেত্রেই কথিত ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দাতাকে গ্রেফতার করা হয়।
তাছাড়া যার নামে ফেসবুকে কথিত স্ট্যাটাস দেয়ার কথা বলা হয় পুলিশ তাকেই গ্রেফতার করে এবং বেশিরভাগ ঘটনার তদন্ত শেষ হয়না ও প্রকৃত অপরাধীরা কখনোই আইনের আওতায় আসেনা দাবী করে বিশিষ্টজনরা আরো বলেন, এ ধরনের ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগ, তারা নিরাপরাধী হয়েও লম্বা সময় জেল খেটেছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।

নাসিরনগরের নিরক্ষর রসরাজ এবং রামু’র উত্তম বড়–য়ার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এবং রংপুরের টিটু রায়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সর্বশেষ সুনামগঞ্জের শাল্লায় ঝুমন দাসের সাথেও ঐ একই ঘটনা ঘটেছে। সুতরাং সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতন, তাদের হয়রানির ঘটনায় ফেইসবুকে একটি অন্যায়ের প্রতিবাদসরূপ তথাকথিত পোষ্ট দেয়া নিরাপরাধ ঝুমন দাসের নিঃশর্ত মুক্তি এবং তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবিও জানান বিবৃতিদাতারা।

একই সাথে হিন্দু পল্লী আক্রমন ও লুটপাটের মূল হোতাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি এবং মাঠ প্রশাসন ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে সকল কর্মকর্তা সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা রুখতে ব্যর্থ হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনেরও দাবিও জানান বিশিষ্টজনরা।

উক্ত বিবৃতিতে স্বাক্ষর কারীরা হলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট সুলতানা কামাল, বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক, নারী নেত্রী ও সমন্বয়ক খুশী কবির, নিজেরা করি,টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এডভোকেট রাণা দাশগুপ্ত, সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আরেক আইনজীবি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য এডভোকেট জেড আই খান পান্না, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়ন আইনজীবি এডভোকেট তবারক হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস, রিব এর নির্বাহী পরিচালক ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি কাজল দেবনাথ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, বেলা’র প্রধান নির্বাহী এডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, এবং এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা প্রমুখ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *