খাসিয়াদের সহস্রধিক পানগাছ কর্তন: বিচারহীনতায় বাড়ছে এমন ঘটনা, বলছেন আদিবাসী নেতারা

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার আগারপুঞ্জির খাসিয়াদের প্রায় এক হাজারে অধিক পান গাছ কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ছোট ছোট টিলায় পানের জুম। এই পান জুমই খাসিয়া আদিবাসীদের জীবিকার নির্ভরতা। নানা প্রজাতির উঁচু গাছের শরীর বেয়ে লতিয়ে উঠা পানগাছ কেটে ধ্বংস করে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। অধিকাংশ পানগাছের গোড়া কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় খাসিয়া’রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সোমবার কাটা পানগাছগুলো টেনে এনে স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। এর চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন খাসিয়া সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষেরা। তাঁদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বলেও জানান তারা।

পুঞ্জির বাসিন্দারা বলেন, সেখানে ৪৮টি খাসিয়া পরিবারের বাস। পানচাষই তাদের একমাত্র জীবিকা। এখন পানের ভরা মৌসুম। রোববার সকালে পুঞ্জির লোকজন জুমে পান সংগ্রহ করতে যান। তাঁরা এ সময় প্রায় এক হাজার পানগাছ কাটা দেখতে পান। এ ব্যাপারে পুঞ্জির মন্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) সুখমন আমসে বাদী হয়ে রোববার বিকেলে বড়লেখা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বলে জানা যায়।

পুঞ্জিপ্রধান সুখমন আমসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, স্থানীয় কারও সঙ্গে তাঁদের পূর্ববিরোধ নেই। পানগাছ কাটায় তাঁদের সাত-আট লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কে বা কারা এ কাজটি করল, সেটা তাঁরা বুঝে উঠতে পারছেন না।

এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং আইপিনিউজকে মুঠোআলাপে বলেন, খাসিয়াদের উপর সম্প্রতি বড়লেখার আগারপুঞ্জি ছাড়াও কাঁকড়াছড়া ও ইছাছড়া পুঞ্জিতে তাঁদের জীবন-জীবিকার উপর হামলা হয়েছে।কিন্তু কোনোটার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয়নি। মৌলভীবাজারের স্থানীয় প্রশাসন এই ঘটনাগুলোর বেপারে নির্বকার। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই ঘটনাগুলো বারংবার সংঘটিত হচ্ছে বলেও অভিমত এই আদিবাসী নেতার।
আইপিনিউজকে তিনি আরো বলেন, সমতল আদিবাসীদের ভূমি সম্বন্ধীয় জটিলতাগুলো দেখার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো কমিশন নেই। এই কমিশন না থাকার কারণে নানা ধরণের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে আদিবাসীদের। তাই অবিলম্বে এই কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। বড়লেখার আগারপুঞ্জিতে সংঘটিত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি দিতে হবে। নইলে খাসিয়া আদিবাসীরা ক্রমান্বয়ে এদেশ থেকে বিতাড়িত হবে বলেও মনে করেন তিনি।

খাসিয়া-গারোদের স্থানীয় সংগঠন কুবরাজের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে অবিলম্বে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

এ বিষয়ে বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি তাঁরা তদন্ত করে দেখছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই উপজেলার বনখলাপুঞ্জির তিনটি পানজুম দখলের অভিযোগ:

এদিকে একই উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের বনাখলাপুঞ্জির তিনটি পানের জুম বহিরাগত লোকজন দখল করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে পুঞ্জির বাসিন্দা ও ছোটলেখা চা-বাগানের পক্ষ থেকে বড়লেখা থানায় দুটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।

চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ও পুঞ্জির বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, ছোটলেখা চা-বাগান কর্তৃপক্ষ চা চাষের জন্য ১ হাজার ৯৬৮ একর টিলাভূমি সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেয়। পরে তারা ২৭২ একর জমি বার্ষিক ১০ লাখ টাকা মূল্যে খাসিয়াদের কাছে উপ-ইজারা দেয়। ২০০৭ সালে খাসিয়ারা ওই জমিতে বনাখলাপুঞ্জি নামে বসতি স্থাপন করে। এরপর সেখানে পান চাষ শুরু করে। পুঞ্জিতে বর্তমানে ৩৬টি খাসিয়া পরিবারের দেড় শতাধিক সদস্য থাকে। প্রতিটি পরিবারের আলাদা পানের জুম আছে। ২৮ মে বহিরাগত একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পুঞ্জিতে ঢুকে তিনটি পানের জুমের দখল করে নেন। এ সময় তাঁরা সেখানে একটি অস্থায়ী ঘরও নির্মাণ করেন।

পুঞ্জির নারী মন্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) নরা ধার ও ছোটলেখা বাগানের প্রধান টিলা করণিক দেওয়ান মাসুদ রোববার থানায় পৃথকভাবে দুটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে ১৬ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ৩০-৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়ি আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়।

পুঞ্জির মন্ত্রী নরা ধার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা নিরীহ মানুষ। পান চাষ করে সংসার চালাই। জুম দখল হওয়ার পর থেকে খুব ভয়ে আছি। আমাদের হুমকি–ধমকি দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ বলেছে ব্যবস্থা নেবে।’

ছোটলেখা চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শাকিল আহমদ বলেন, স্থানীয় কিছু ভূমিদস্যু চা-বাগানের নামে ইজারাভুক্ত জমি দখল করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত কাজে ছুটিতে রয়েছেন। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে তাঁরা উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছেন।

দখলের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে নাম আসা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় দক্ষিণ গান্ধাই গ্রামের বাসিন্দা আতিক মিয়া ও লেছই মিয়া।
বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার বলেন, তাঁরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। তদন্ত করে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *