মধুপুরের বনটা কার? – রাজীব নূর

মধুপুরের বনটা কার? মান্দিদের আদি ধর্ম সাংসারেক বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষ থেকে বনের প্রাণী, গাছপালা সবাই বাগবার সন্তান, পরস্পর নাড়ির সম্পর্কে সম্পর্কিত। আপনি যেমন সহোদর ভাই-বোনকে নিজের সম্পত্তি বলে দাবি করতে পারবেন না, তেমনি দাবি করতে পারেন না বনের মালিকানাও। নাড়ির সম্পর্কে সম্পর্কিত কোনো কিছুর মালিকানা হয় না। ভাই-বোন যেমন আপনার সম্পদ, তেমনি বনটাও। নিজের বাঁচার জন্য তাদের কাছ থেকে কিছু নিতে পারেন, বিনিময়ে তাদের জন্য কিছু করবেন নিশ্চয়ই, কিন্তু তাদের মালিকানা দাবি করতে পারবেন না।

মধুপুর গড়ের বনজীবী আদিবাসীরা এই রকম বিশ্বাস থেকে শালবনটাকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে বহুকাল ধরে। সম্পত্তি হিসেবে কুক্ষিগত করেনি কখনো। বনকে কুক্ষিগত করা শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে, যখন ওখানে বনবিভাগ প্রতিষ্ঠা পেল। এরপর ১৯৬২ সালে মধুপুরের শালবনটিকে জাতীয় উদ্যান বলে ঘোষণা করার পর থেকে সংকট ঘনীভূত হয়েছে। বনরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারের এই বিভাগটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন পাতাঝরা বনের একটি আমাদের মধুপুরের শালবনে আকাশমণির মতো গাছ লাগানোর প্রকল্প হাতে নিল। বনজীবী মান্দি ও কোচরা অনুভব করল, এই বন তাদের নয়।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ Mustafizur Rahman
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ Mustafizur Rahman

ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে এবং তারও আগে মধুপুর শালবনে চাষাবাদের জন্য খাজনা দিতে হতো বনজীবীদের। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলে যখন বনটি নাটোর রাজার অধীনে আসে তখন খাজনা দেওয়াটা বাধ্যতামূলক করা হয়। রাজা যোগীন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে ১৮৬০ থেকে মান্দি গ্রামপ্রধানদের জমি বিষয়ক চুক্তি হয় এবং বনের অধিবাসীরা রাজার রায়ত হিসেবে রাজাকে খাজনা দিতে শুরু করে। বছরে একবার কাচারিতে গিয়ে এক টাকা পাঁচ সিকা খাজনা দিলেই চলত। তখন আদিবাসীরা এই বনে জুম চাষ করত। নতুন জুমের জন্য জমির অভাব ছিল না সেই সময়। ফলে একবার জুমচাষের পর এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত জুমজমিকে বিশ্রাম দেওয়া হতো। লম্বা ওয়াহ মানে বাঁশ দিয়ে এক নল, দুই নল, দশ নল এভাবে হতো জমির মাপ।পাখি, বিঘা, শতাংশ, কানি, হেক্টর ও একরের মতো মাপ ছিল না তখন।

মধুপুর অঞ্চলকে মান্দিরা আবিমা বলে ডাকে, আবিমা মানে মায়ের মাটি। মান্দি পুরাণ মতে, চিগেলবাড়িওয়ারীখুট্টি নামের এক জঙ্গল দ্বীপে মান্দিদের জন্ম। এখন নিজের জন্মভূমিতে মান্দিদের অবস্থা হয়েছে পরবাসীর মতো। মধুপুরের বন আর মান্দিদের নেই। সরকার এই বনের মালিক। ফলে বাসন্তী রেমার মতো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বনে বসবাসকারীদের হঠাৎ করে উচ্ছেদের চেষ্টা চালায় বনবিভাগ, কলাবাগান উজাড় করে দেয়। বেশির ভাগ সময় উচ্ছেদে সফল হয়। ছোট হয়ে আসছে বনভূমি। বনের মতো কমছে বনের আদিবাসীরাও। বন এবং বনের মানুষ উন্নয়নের নামে হচ্ছে উচ্ছেদের শিকার। বনের ভেতর মান্দি গ্রাম উচ্ছেদ করে তৈরি হয় ফায়ারিং ও বম্বিং রেঞ্জ। আরো কত কী তৈরি হচ্ছে? বনবিভাগও নিত্যনতুন কিছু তৈরি করায় কম যায় না। তাই একবার আগর চাষ প্রকল্প হাতে নেয়, পরে আবার কাজুবাদামের বাগান করতে যায়। আরবোরেটাম বা গাছপালার সংগ্রহশালাটা এই সব নয়-ছয়ের একটি, যার পেছনে অর্থ লোপাটের বিষয়টাই যে প্রধান তা অনুমান করবার জন্য ব্যাপক অনুসন্ধানে নামার দরকার হয় না, অনুমান শক্তিই যথেষ্ট।

আরবোরেটাম বাগানটা কেন শালবনের মতো একটা পাতাঝরা বনের ভেতরে বানাতে হবে, তা আমি বুঝতে পারছি না। এই বাগানের জায়গার মধ্যে পড়েছে মধুপুরের অরণখোলা ইউনিয়নের টেলকী গ্রামে মান্দিদের দেড়শ বছরের পুরোনো শ্মশান। মান্দিরা এই শ্মশানকে বলে ‘মাংরুদাম’। তাদের কাছে এটি খুবই পবিত্র স্থান। অথচ কয়েকজন মান্দি নেতার যোগসাজশে বাগানের সীমানাপ্রাচীর দ্রুত নির্মাণ করতে তৎপর বনবিভাগ। এই যখন পরিস্থিতি, তখন মাংরুদামকে ঘিরে বনবিভাগের কর্মকাণ্ডে মধুপুর অঞ্চলের মান্দিদের ১৩টি গ্রামের মানুষের মধ্যে তুমুল অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এই বনে কৃত্রিম বনায়নের নিদর্শন নতুন নয় এবং সেখানকার আদিবাসীরা বনবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে সব সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে। প্রাণ দিয়েছেন পীরেন স্নাল। কিন্তু এবার শ্মশান ধ্বংসের উদ্যোগ সেই ক্ষোভে ঘৃতাহুতি দেওয়ার মতো হয়েছে। মান্দিরা পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচিহ্ন মেশা এই মাটির একটি কণাও ছাড়তে নারাজ।

আমার বন্ধু, প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ ঠিক বলেছেন ‘এ ধরনের প্রকল্প আদিবাসীদের সঙ্গে বন বিভাগের দূরত্বই শুধু বাড়াবে। বনের কোথায় কী রয়েছে তা আদিবাসীরা যেমনটা জানে; বন বিভাগের তেমনটা জানার কথা নয়। প্রকৃতি পূজারি আদিবাসীরা গভীর জঙ্গলের ভেতর পূজা করত। সে স্থানগুলোকে বলা হতো পবিত্র অঞ্চল (মিদ্দি আসং)। বনের মানুষ জানে সেগুলো কীভাবে রক্ষা করতে হয়। প্রাকৃতিক বনের বাস্তুসংস্থান ঠিক রাখতে হবে।’

রাজীব নূর; সাংবাদিক ও গল্পকার
(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *