জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকল্প নয় দরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: পবা’র আলোচনায় আয়োজকরা

“জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় আমরা সহযাত্রী” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এবং বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান “বারসিক” যৌথভাবে আজ ২১ মে ২০২১ তারিখে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষ্যে একটি অনলাইন আলোচনা সভার আয়োজন করে। পবার চেয়ারম্যান জনাব আবু নাসের খানের সভাপতিত্বে এবং বারসিক পরিচালক জনাব পাভেল পার্থের সঞ্চালনায় এই আলোচনা অনুষ্ঠানে সাতক্ষীরা, শ্যামনগর, রাজশাহী, মানিকগঞ্জ এবং নেত্রকোনার কৃষক, মৎস্যজীবি, কবিরাজ, যুব উন্নয়ন কর্মীরা তাদের এলাকার প্রানবৈচিত্র্য রক্ষার অভিজ্ঞতা বর্ননা করেন।
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকল্প নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং এলাকা ভিত্তিক জীববৈচিত্র্য গবেষণাগার তৈরী করতে হবে এ কথাগুলো বলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. বিধান চদ্র দাস। তিনি আরো বলেন, জীববৈচিত্র্যের সার্বিক সংরক্ষণ অর্থাৎ দেশজ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রত্যেকটার সংরক্ষণ করতে হবে। উক্ত আলোচনা সভার সম্মানিত আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ জসীম উদ্দিন বলেন, মানুষ প্রকৃতিরই অংশ এবং মানুষের নানাবিধ রোগের সমাধান প্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে। গ্রাম ও নগরকে পাখিবান্ধব করতে দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করতে হবে।

পবার সাধারন সম্পাদক এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জনাব আব্দুস সোবহান বলেন, অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের জন্য আমরা মাটিকে বারংবার এত বেশী সার বা কীটনাশক দিচ্ছি যে মাটি এখন পিপাসার্ত এবং নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। এখন মাটিতে সার কীটনাশক না দিলে মাটি আর সাড়া দেয় না।

পবা চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য বৈভবে দুনিয়ায় অনন্য। দেশের নাগরিকদের পরিবেশ প্রকৃতি সুরক্ষার কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে। মানুষ উন্নত জীবন যাপনের নিজের অজান্তে জন্য জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে, এটা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। গবেষণামুলক কাজগুলোকে উন্নত করতে হবে। ‘কাগজে আছে, বাস্তবে নেই’ এই বিভ্রান্তি দূর করতে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। পবার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন বলেন, মানুষ তার চাহিদা, কৌতুহল মেটাতে পাহাড়, মাটি খুড়ে, বরফ গলিয়ে জীববৈচিত্র্যর ভারসাম্য নস্ট করছে। এসব কারণে বিচিত্র সব ভাইরাস, ব্যক্টেরিয়া তাদের আবাস হারাচ্ছে, ফলে তারা টিকে থাকার জন্য আশ্রয় খুঁজছে গবাদি পশু, মানুষ কিংবা লোকালয়ে। ফলে পরিবেশে বিপর্যয় নামছে। যার ফলে মহামারী দেখা দিচ্ছে। যার ফলে কোভিড-১৯ এর মতো ‘জুনটিক’ রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ক্ষতিকর প্রাণিকে বিনাশ নয়, তাকে দমন করতে হবে।
পবার সম্পাদক ও গ্রিণ ফোর্স সমন্বয়ক মেসবাহ সুমন বলেন, সচেতনতার দ্বারা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যকর করা যায়। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এ ব্যাপারে ভূমিকা পালন করতে পারে। বানিপার সাধারন সম্পাদক এস এম ওয়াহেদ বলেন, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে সব পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

বক্তারা আরো বলেন, প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ নানা আন্তর্জাতিক নীতি ও সনদ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হলেও অনেক ক্ষেত্রে এসবের কার্যকর প্রয়োগ নেই। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ৫ জুন সিবিডি সনদে স্বাক্ষর করে এবং ১৯৯৪ সালের ৩ মে অনুসমর্থন দান করে। উক্ত সনদের আলোকে বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে “Biodiversity and community knowledge protection act’’ নামে একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছিল। যদিও এই খসড়াকে বাদ দিয়ে পরবর্তীতে ‘জীববৈচিত্র্য আইন’ চূড়ান্ত হয়েছে।

প্রজাতি হিসেবে মানুষই প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় প্রধান সহযোগী। আবার মানুষই এই প্রাণ-প্রকৃতির নির্মম হন্তারক। একক প্রজাতি হিসেবে মানুষের লাগাতার ভোগবিলাসিতা, লুন্ঠন আর খবরদারির জন্যই আজ প্রাণ-প্রকৃতির মুমূর্ষু অবস্থা। আজ যুদ্ধবোমায় ঝলসে দেয়া হচ্ছে ফিলিস্তিন, অঙ্গার হয়েছে আমাজন অরণ্য, রেস্টুরেন্টের জন্য কেটে ফেলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ। দুনিয়া জুড়ে প্রাণ-প্রকৃতির এই নিদান একেবারেই মানুষের তৈরি। মানুষ কেবল একা নিজে জিততে চায়, নিজের বাহাদুরিকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একা নিজের খাবার ফলাতে গিয়ে মাটি পানি সব বিষাক্ত করে ফেলেছে, অণুজীব থেকে পতঙ্গ সব ধ্বংস করছে । গত বিশ বছরের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও নানা কৃষি বাস্তুসংস্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গ্রীষ্মকালেই দেশে প্রাণবৈচিত্র্যের বহুল মৃত্যু ঘটে। কারণ এ ঋতুতেই বোরো মওসুমের ধান কাটা হয় আর ধান বাঁচাতে মানুষ বাবুই, চড়ুই, শালিক পাখিদের বিষ দিয়ে মারা হয়। এছাড়া বোরো মওসুমে ব্যবহৃত বিষ ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার মাটি ও জলজ প্রাণবৈচিত্র্য নিশ্চিহ্ন করে অন্য মওসুমের চেয়ে বেশি। এছাড়া এই ‘মধুমাসে’ আম-লিচু ফল বাগানে নির্দয়ভাবে পাখিদের হত্যা করা হয়। এ সময়টাতে উপকূলে বিষ দিয়ে মাছেদেরও মৃত্যু ঘটে। অথচ এটাই আমাদের মানে মানুষের খাদ্য জোগানের এক প্রধান ঋতু। আমাদের এই জোগান, উৎপাদন আর উন্নয়নের পেছনে কত প্রাণ ঝরে যায়, হারিয়ে যায় তার খতিয়ানও আজ আমাদের নেয়া জরুরি। চলমান করোনা মহামারি প্রমাণ করে প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষা ছাড়া কোনোভাবেই এই সবুজগ্রহ আমাদের কারোর জন্যই নিরাপদ নয়। তাহলে আমরা করবোটা কি? সংকট যেহেতু আমাদের তৈরি করা, তাই সমাধানও আমাদেরই খুঁজতে হবে। জনে জনে, গ্রামে গ্রামে, পাহাড় থেকে সমতলে, হাওর থেকে অরণ্যে, বরেন্দ্র থেকে বিলে, গড় থেকে অববাহিকায়, শহর থেকে ময়দানে সর্বত্র। মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়নচিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। একটা পাখি, কী একটা বনরুই, মৌমাছি কী বৃক্ষ সবাই এই গ্রহে মানুষের মতোই প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতির কোনো বাসিন্দাকে হটিয়ে দিয়ে, নিখোঁজ করে কোনোভাবেই মানুষ আনন্দ নিয়ে বাঁচতে পারে না। আর তাই প্রাণবৈচিত্র্যের যে নিদারুণ সংকট আজ মানুষ তৈরি করেছে মানুষকেই এর সমাধানে জানবাজি রেখে দাঁড়াতে হবে। প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় সহযাত্রীদের অভিযাত্রা যত দীর্ঘ হবে ততই এই গ্রহ সকলের জন্য নিরাপদ হবে, টিকে থাকবার রসদ তৈরি হবে চারধারে।

আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ আন্দোলন ঐক্য পরিষদের (রাজশাহীর) সভাপতি মাহবুব টুংকু, সাতক্ষীরার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য রক্ষা টিমের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এস নাহিদ হাসান, শ্যামনগর সিডিও ইয়ুথ উদ্যোক্তা কেন্দ্রের সভাপতি শিরিন সীমা, সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিমের মো: আলী হোসেন, নেত্রকোনার মৎস্যজীবী যোগেশ চন্দ্র দাস ও কবিরাজ আব্দুল হামিদ, মানিকগঞ্জের ইমান আলী ও মীর নাদিম হোসেন, বারসিকের, সৈয়দ আলী বিশ্বাস, মো: জাহাঙ্গীর আলম ও গ্রিন ফোর্সের সদস্যবৃন্দ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *