বাংলাদেশ রাষ্ট্র পাহাড়কে উপনিবেশ মনে করে: পিসিপি’র আলোচনায় রোবায়েত ফেরদৌস

বাংলাদেশ রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপনিবেশ হিসেবে মনে করে। সেজন্য রংপুর বরিশাল থেকে গরীব বাঙালি মুসলমানকে বাসভর্তি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম পুষ করে দেয়া হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পের চতুর্দিকে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রোবায়েত ফেরদৌস।আজ ২০ মে ২০২১ ইং তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ৩২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, রেশন ভাতা জায়গা জমি দিয়ে তাদেরকে (সেটলার বাঙালি) লালন- পালন করে বিশেষ বাহিনী।
অনলাইনে আয়োজিত আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি জুয়েল চাকমার সভাপতিত্বে সহ-সাধারণ সম্পাদক সুমিত্র চাকমার সঞ্চলনায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পাটির সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, পিসিপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জাতিসংঘের এমরিপ কাউন্সিলের সদস্য বিনোতা ময় ধামাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরীন কণা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক বসু মিত্র চাকমা, সাংবাদিক নজরুল কবির, পিসিপির সহ-সভাপতি সুমন মারমা, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ ফয়েজ উল্লাহ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শান্তি দেবী তঞ্চঙ্গ্যা, বাংলাদেশ যুব ফোরামের সহ-সভাপতি চন্দ্রা ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলিক মৃ প্রমুখ।

আলোচনা সভায় পিসিপি’র সহ-সভাপতি সুমন মারমা বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতি গভীর ভাবে অনুভব হয়েছিল। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার দিয়ে রাজনীতির ডেমোগ্রাফি পরিবর্তন করতে শুরু হয় রাষ্ট্রযন্ত্রেও ষড়যন্ত্র। সংঘটিত করা হয় ডজন খানেক গণহত্যা। তার মধ্যে লংগদু গণহত্যা প্রতিবাদ করতে গিয়ে জন্ম লাভ করে আজকের পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ। ৩২ বছরের সংগ্রামের গৌরবের সাক্ষী এই পরিষদ।বাংলাদেশ সরকার পাহাড়ীদের সাথে পার্বত্য চুক্তি করার পর ও নানা তালবাহানা করে চলেছে।এগুলো মুলত জুম্ম জনগণকে উচ্ছেদ করার জন্য চরম চক্রান্ত। ২৪ বছর একটা জাতির জন্য কম সময় নয়। জুম্ম জনগণের সাথে রাষ্ট্রের যে প্রতারণা তা কোনদিন সুফল বয়ে আনবে না।

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শান্তি দেবী তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, একটি আন্দোলনের পেছনে একটি ইতিহাস রয়েছে। সেই ইতিহাস নিশ্চয় শোষণ বঞ্চনার ইতিহাস। শোষণের বিরুদ্ধে গিয়ে সৃষ্টি হয় একটি আন্দোলন। সেই ১৯৮৯ সালের লংগদু গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জন্ম। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রামে নারী সমাজের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারী সমাজের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সা¤প্রতিক ঘটনা প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় পাহাড়ী ছাত্র সমাজ উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে গিয়ে নিজের ইতিহাস ঐতিহ্য ভ‚লে যাবার প্রবণতা খুবই উদ্বেগের। নিজের শেকড়ের টান তারা অনুভব করেনা। জুম্ম জনগণের রাজনীতি ধারা প্রবাহের পর্যবেক্ষণ জরুরি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলীক মৃ বলেন, বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের উপর যে নিপীড়ন চলছে তার বিরুদ্ধে আদিবাসী ছাত্র সমাজকে রুখে দাঁড়াতে হবে।

বাংলাদশে আদিবাসী যুব ফোরামের সহ-সভাপতি চন্দ্রা ত্রিপুরা বলেন, পিসিপি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের একজন সন্তান হিসেবে যখন থেকে বুঝতে শিখেছি পাহাড় আমাকে গভীরভাবে টানে। কঠিনকে গ্রহণ করে জুম্ম জনগণের বাঁচার অধিকারের জন্য যৌবন অতিবাহিত করছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উত্থান, জাতিতে জাতিতে, ধর্মীয়ভাবে বিভেদের দেওয়াল তৈরি করছে। প্রগতিশীল অংশের জোরালো অংশগ্রহণে মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের সমস্যার বিষয়বস্তু জানতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ বলেন,বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুগে যুগে ছাত্র রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আছে। ছাত্র রাজনীতি বাংলাদেশের গতি প্রকৃতি নির্ধারণে সাহায্য করছে।বর্তমানে সময়েও এর গুরুত্ব বজায় রেখেছে।অতীতের সংগ্রামে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদকে প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে সবসময় পাশে পেয়েছি। পাহাড়ের কিছু ঘটনাবলি বাঙালি সমাজ কিছুটা ধোঁয়াশার মধ্যে রয়ে যায়, তা নিয়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স বলেন, রাষ্ট্র যেভাবে করে বর্তমানে নিপীড়কের ভূমিকায় অবর্তীণ হয়েছে তা পাহাড় ও সমতলে প্রায় সমান। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর হলেও সেটিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না । সরকার রাষ্ট্র খেয়াল খুশি মতন রাষ্ট্র চালাচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না। তাই সবাইকে সমানভাবে সংগ্রামে অবর্তীণ হতে হবে।

লেখক ও সাংবাদিক নজরুল কবীর বলেন, বাংলাদেশের বড় বড় জাতীয় আন্দোলনে পাহাড়ী ছাত্র সমাজকে আমরা সামনে সারিতে পেয়েছি। অনেক পাহাড়ী নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করে পার্বত্য চুক্তি করা জেএসএসের ভুল ছিল,কিন্তু আমি বলব চুক্তি করা কোনকালে ভুল ছিল না। পার্বত্য চুক্তির আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটা অন্ধকার অঞ্চল ছিল। কেউ জানত না বা জানতে দেয়া হত না পার্বত্য চট্টগ্রামে কি হচ্ছে, কি হতে যাচ্ছে। চুক্তি করার ফলে জাতীয় নেতৃত্ব জানতে পারছে পাহাড়ের সত্যিকারের বাস্তবতা। তাই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের উচিত চুক্তির ফলে পাহাড়ীরা কি পেল, কি পেল না ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোও তুলে আনা। পাহাড়ের ডজনখানেক গণহত্যার প্রকৃত চিত্র অনেক প্রকৃতভাবে জানে না। সেজন্য গণহত্যা শিকার হওয়া এখনো অনেকে বেঁচে আছে,তাদের থেকে সাক্ষাৎকার নিয়ে বিভিন্ন ডকুমেন্টারি তৈরি করা যায়। মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা সংসদের বক্তৃতা এখন একটু খুঁজলে হাতে পাওয়া যায়।এটা অনেক ভালো দিক। আমি মনে করি সব পাহাড়ী এমএন লারমার সংসদের বক্তৃতা পড়া উচিত। বর্তমানে পাহাড়ের রাজনীতির নেতৃত্বে সন্তু লারমার অনেক চুম্বকীয় বক্তব্য আছে, এগুলো লিফলেট আকারে প্রকাশ করে মানুষের কাছে পৌঁছানো যেত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক বসুমিত্র চাকমা বলেন,আজকের দিনে সবচেয়ে মিস করছি ২০ মে আসলে যে স্লোগান আর রাজপথে মুখর থাকত, করোনার কারনে আজকে অনলাইনে আলোচনা করতে হচ্ছে। শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানির উপেক্ষা করে একমাত্ একমাত্র কাজ করতে পারে ছাত্র সমাজ। কারণ তারা তরুণ-অরুণ। পাহাড়ের রাস্ট্রের বিশেষ বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণের পরও ছাত্র পরিষদ তার সংগ্রামে অটুট। অটল মনোবলে জুম্ম জনগণের আত্বনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য নিঃসংকোচ ভাবে কাজ করে যাচ্ছে যা খুবই আশাব্যঞ্জক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস আরো বলেন, পাহাড়িদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন কখনো বিচ্ছিন্নবাদী আন্দোলন হতে পারেনা। আর যারা সংবিধানে জায়গা দেয়না তারা বিচ্ছিন্নবাদী,নাকি যারা সংবিধানে আসতে চাই তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী? পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের উচিত চলমান ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানো। জাতীয় ইস্যতে ভূমিকা রাখা।নাহলে মানুষ বিভক্ত রাজনীতি মনে করবে।আঞ্চলিক,জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী হতে হবে।

পিসিপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিনোতা ময় ধামাই বলেন, পাহাড় নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের শেষ নাই। তবুও লড়ে যেতে হবে আমাদের। সাবেক কর্মী হিসেবে আমারা সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন,’এখনো মনে আছে ১৯৯২ সালে ১০ এপ্রিল এক লোহমর্ষক লোগাংয়ে গণহত্যা সংগঠিত হয়। আমি তখন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নে সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। ছাত্র ঐক্য জোটে কয়েকজন লোগাং-এর উদ্দ্যেশে রওয়ানা হয়। খাগড়াছড়ি যাবার পথে আমাদেরকে পথরুদ্ধ করা হয়।আমাদের তীব্র প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যারিকেড কিছুটা পিছিয়ে যায়। রাতে জনৈক এক মেজর দেখা করতে আদেশ আছে।আমরা বলেছি ঢাকায় দেখা করব এখানে নয়। লোগাংয়ের নারী শিশুসহ বহু জুম্মদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তা আমরা স্বচক্ষে গিয়ে অনুভব করলাম। পরদিন সকালে রাঙামাটির বনরুপা পেট্রোল পাম্পে বক্তৃতা দেবার আগে তিনবার সেনাবহর আমাদেরকে অনুসরণ করে চলে যায়। বুঝতে পারছেন সেসময় কালের ইনসার্জেন্সী পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা।এরপর সেনা সদস্যরা জিজ্ঞেস করে এখানে রুহিন আহমেদ প্রিন্স কে। আমি হাত তুলে পরিচয় দিলাম। আমার বক্তব্য আমাকে রেকর্ড করে শুনানো হয়।

সমাপনির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি জুয়েল চাকমা বলেন, জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ স্বপ্ন দেখেছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাহাড়ী আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। কিন্ত শাসকগোষ্ঠী সহ পাহাড়ের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে সমর্থন না করে চুক্তিবিরোধী কাজ করে যাচ্ছে। যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তার ফল কখনোই সরকার তখা রাষ্ট্রের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবেনা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *