চা শ্রমিকদের জাতি সত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি দিতে হবেঃ সিপিবি

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম আজ ১৯ মে, ২০২১ এক বিবৃতিতে চা শ্রমিকদের গৌরবময় লড়াই ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলনের ১০০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের চা জনগোষ্ঠীর সকলকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানান। এক বিবৃতিতে
চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫০০ টাকা দেওয়ার দাবীও করেন সিপিবি’র নেতৃবৃন্দ।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের চা চাষ ১৬৭ বছর পার করতে যাচ্ছে কিন্তু এই ১৬৭ বছরে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকাও পার হয়নি। নেতৃবৃন্দ বলেন, স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে ১ লাখ ৩৭ হাজার শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ১৬ হাজার শ্রমিক পাকাঘর ও ৪৫ হাজার শ্রমিকের কাঁচাঘর পেয়েছে। বাকী ৭৫ হাজার শ্রমিকের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। আইনে থাকলেও প্রতিটি বাগানে প্রাথমিক বিদ্যালয় নাই। ফলে চা বাগানের অনেক শিশুই অক্ষরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চা-বাগানগুলোতে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা খুবই নাজুক। অভিজ্ঞ বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী না থাকায় চা-বাগানগুলোতে মাতৃমৃত্যুর হার খুব বেশি। কর্মক্ষেত্রে শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় নারী চা শ্রমিকরা নানা ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। চা জনগোষ্ঠীর শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব দুর্বিষহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ, প্রচলিত সকল সুযোগ সুবিধা বহাল রেখে (রেশন, বাসা, চিকিৎসা ইত্যাদি সহ) শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ করার দাবি জানান। তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা চা শ্রমিকদের জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানান। নেতৃবৃন্দ চা শ্রমিকদের ১০-দফা দাবি মেনে নেয়ার দাবি জানান।
নেতৃবৃন্দ চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে পূর্বপুরুষের সংগ্রামী ঐতিহ্য ধারণ করে জীবন-জীবিকার লড়াই গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

‘‘মুল্লুকে চলো” আন্দোলনের শতবর্ষে সিপিবি’র কর্মসূচি

২০ মে, সকাল ১১.৩০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ। এছাড়া মৌলভীবাজারে কুলাউড়ায়, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও চাঁদপুরে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে।
২১ মে, সন্ধ্যা ৭ টায় জুমে ভার্চুয়াল আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে। একতা টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

‘‘মুল্লুকে চলো” আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ব্রিটিশরা ১৮৩৮ সালে সিলেট ও কাছাড়ে পরীক্ষামূলকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভাবে চা চাষ শুরু হয়। পাহাড়ি জঙ্গল কেটে বাগান তৈরি, রাস্তাঘাট-গৃহ নির্মাণ, বাগান পরিচর্যা, পাতা তোলার জন্য ব্রিটিশ চা বাগান মালিকরা মিথ্যা প্রলোভন, উন্নত জীবন ও আজীবন কাজের আশ্বাস দিয়ে মধ্য ভারতের দারিদ্র ও দুর্ভিক্ষপীড়িত সাঁওতাল, লোহার, কুর্মী, মুন্ডা, কুলবিল কানু, তেলেগু, রবিদাস, গোয়ালাসহ প্রায় ১১৬টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এবং উড়িষ্যা, বিহার, মাদ্রাজ, মধ্য প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ, বাকুড়া ইত্যাদি অঞ্চলের চাষীদের চা শ্রমিক হিসেবে নিয়ে আসে। কিন্তু এখানে এসে তাদের জোটে নামমাত্র মজুরি, অনাহার, অর্ধাহার, রোগব্যাধি, কোম্পানির লোকের চাবুক ও বুটের লাথি। প্রতারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত চা শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে নিজ ভূমি অর্থাৎ মুল্লুকে চলে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯২১ সালের ৩ মার্চ ত্রিশ হাজার শ্রমিক দলে দলে চা বাগান থেকে বেরিয়ে রেল লাইন ধরে পায়ে হেঁটে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। উদ্দেশ্য সেখান থেকে ষ্টিমারে গোয়ালন্দ হয়ে নিজ দেশ-মুল্লুকে ফিরে যাবে।

পথক্লান্ত হাজার হাজার শ্রমিক চাঁদপুর স্টিমার ঘাটে গোয়ালন্দগামী স্টিমার উঠতে চাইলে সশস্ত্র পুলিশ স্টিমারের সিঁড়ির দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। এতে অসংখ্য শ্রমিক নিহত হয়। নদীতে ভেসে যায় অসংখ্য শ্রমিকের লাশ। ছত্রভঙ্গ হয়ে হাজার হাজার চা শ্রমিক চাঁদপুর রেলস্টেশনে জড়ো হয়ে প্লাটফর্ম ও আশাপাশের খোলা জায়গায় অবস্থান নেয়। ১৯২১ সালের ২০ মে কমিশনার কিরণ চন্দ্র দে, ম্যাজেস্টেট সুশীল সিংহ, চা-কর সাহেব ফার্গুসনের উপস্থিতে রাঁতের আধারে ঘুমন্ত শ্রমিকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র গুর্খা সৈনিকরা। শত শত শ্রমিক হতাহত হয়। চাঁদপুরের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হরদয়াল নাগের নেতৃত্বে গঠিত ত্রাণ কমিটির মাধ্যমে চাঁদপুরবাসী চা শ্রমিকদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র খুলে ও খাবারের ব্যবস্থা করে। চা শ্রমিকদের সমর্থনে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তারা এক মাসের ধর্মঘট করে। তাদের সাথে যোগ দেয় স্টিমার কোম্পানীর শ্রমিক-কর্মচারীরা।

চা শ্রমিকদের অনড় অবস্থান, রেল ও স্টিমার শ্রমিকদের দীর্ঘ ধর্মঘট, দেশব্যাপী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফলে ব্রিটিশ চা বাগান মালিকরা চা শ্রমিকদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়। মালিক ও প্রশাসনের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে যারা বাগানে ফিরে যেতে চাইলেন তারা বাগানে ফিরে গেলেন। আর যারা নিজ দেশে ফিরতে চাইলেন তাদেরকে প্রশাসনের সহযোগিতায় সেখান থেকেই নিজ মুল্লুকে ফেরৎ পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ ভাবেই পরিণতি পায় হাজার হাজার শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত একটি লড়াই।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *