করোনা কেড়ে নিল পাহাড়ের সংক্রান্তির উৎসব

পাহাড়ে চলছে বিষুবীয় সংক্রান্তির হাওয়া। কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, কৃষিনির্ভর বিষুবীয় অঞ্চলের প্রায় সমস্ত প্রান্তেই আবহমানকাল ধরেই বর্ষবরণের ব্যাপক প্রস্তুতির রেওয়াজ আমরা প্রত্যক্ষ করে আসছি। তারই ধারাবাহিকতায় পাহাড়ে বঙ্গাব্দ ও মগাব্দ’কে ঘিরে এই প্রস্তুতি আর পুরাতন বর্ষকে বিদায় ও নতুন বছরকে সাদরে গ্রহনের বর্ণাঢ্য আয়োজন। বাংলা বছরের শেষ মাস চৈত্র্যের সমাপনি দিন থেকেই মূলত এই উৎসব শুরু। তবে মগাব্দের সংক্রান্তি শুরু হয় দিন কয়েক পরে। মূলত এই সংক্রান্তি উৎসবের মূল খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় ‘বিষুব’ শব্দ থেকেই সংক্রান্তিকে ঘিরে আয়োজিত এই উৎসবগুলোর নানা নাম এসছে। চাকমা’রা বলে বিজু, ত্রিপুরা’রা বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যারা বিসু, আসামের অহমিয়া’রা বলে বিহু। আর সংক্রান্তির এই উৎসব মারমা’রা চিনে সাংগ্রাইং বা সাংগ্রাই নামে আর ম্রো’রা চিনে চাংক্রান নামে।

এই উৎসবে প্রতিবছর মাতোয়ারা হয় পাহাড়। পাহাড়ের আদিবাসী গ্রামগুলোতে চলে নানা আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী নানা খেলার আয়োজন শুরু হয় এপ্রিলের শুরু থেকে। চাকমা জুমিয়ারা ফুল বিজুর ‘ফুল’ পানিতে ভাসিয়ে পরিশুদ্ধ জীবনের শপথ নেয়। ঘরে ঘরে চলে আসবাব সহ দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী পরিষ্কারের কাজ। সাংগ্রাইয়ের পবিত্র জলে পরিশুদ্ধির মনোবাসনায় মারমা’রা খেলে জলখেলি উৎসব। ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গড়িয়া’র তালে তালে নৃত্য চলে ত্রিপুরাদের। এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। কিন্তু সাম্প্রতিক মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের থাবায় এবের সমস্ত কিছু ‘জলে’ গেল বলে মনে করেন পাহাড়ের জুম্ম আদিবাসীরা।

গতবছর সংক্রান্তির এই উৎসব শুরুর পূর্বে করোনার ঢেউ আছড়ে পড়ে দেশে। দেশ ব্যাপী লকডাউনে ২০২০ সালের সংক্রান্তির এই উৎসব চলে যায় শুনসান নীরবতায়। ঘটা করে নদীতে কিংবা ছড়াই ফুল ভাসানো, খেলা-ধূলার আয়োজন কিছুই হয়নি। আর এবছর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ পাহাড়ের এই উৎসবের আমেজকে হরণ করল বলেও মনে করছেন আদিবাসীদের অনেকেই।

এবিষয়ে রাঙ্গামাটির ভাগ্যমনি চাকমা নামের এক দিনমজুর জানান, করোনা’র কারণে বিগত একটি বছর ধরে আয় কমে গেছে। সংসারের অভাব অনটন ও দুর্দশাও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় অভাবী পেটে ‘বিজু’র আমার কাছে কোনো অর্থ নেই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারন সম্পাদক ইন্টুমনি তালুকাদের সাথে কথা হয় আইপিনিউজ এর। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পর পর দু’বছর করোনার কারণে আমাদের আয়োজন পন্ড হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর আমাদের তিন পার্বত্য জেলায় জাতীয় কমিটির আয়োজন শুরু হয় ৯ এপ্রিল থেকে। এবারেও পোস্টার, কার্ড, ফুল ভাসানো উৎসব, সাংস্কৃতিক আয়োজন সবকিছুর একটা প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে চলমান ‘নিষেধাজ্ঞা’ ও আগামী ১৪ তারিখ থেকে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা’য় আমরা আমরা আমাদের সমস্ত আয়োজন স্থগিত করেছি। তবে ঘটা করে পালন না করলেও গ্রামে গ্রামে অবস্থাভেদে নানা খেলাধুলা ও অন্যান্য আয়োজন হবে বলে আশা করেন এই আদিবাসী নেতা।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে খাগড়াছড়ির জাবারাং কল্যান সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা আইপিনিউজকে বলেন, করোনার উর্দ্ধগতির কারণে বৈসু’র কোনো আয়োজন হচ্ছে না। কোনো ধরণের গড়ায়া নৃত্য ও অন্যান্য আয়োজনও তেমন ঘটা করে হবে না বলেও জানান তিনি। তবে প্রত্যন্ত গ্রামে যেখানে করোনার বিস্তার ও ভয় তেমন নেই সেখানে বৈসু’র আয়োজন চলবে বলে জানান তিনি।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট সহ বিভিন্ন শহরগুলোতে চাকুরীরত ও কর্মজীবি পাহাড়ী আদিবাসীরাও বেশিরভাগ সংক্রান্তির এই উৎসব পালনে পাহাড়ে ফিরতে পারছে না বলে জানান। করোনা সংক্রমণ বাড়ায় অনেকেই সংক্রান্তির উৎসবে সামিল হওয়ার মনোবাসনায় পাহাড়ে গমনের প্রস্তুতি নিলেও বাতিল করতে হয়েছে তাঁদের এই প্রস্তুতি।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *