লোগাং গণহত্যাঃ বিশিষ্টজনদের বিবৃতিতে ফিরে দেখা ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে আনাসে কানাচে পড়ে থাকা রক্তের দাগ এখন শুকোয় নি। পরতে পরতে পড়ে আছে গুমোট কান্না আর অব্যক্ত কত ইতিহাস। সেই ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় ১০ এপ্রিল ১৯৯২। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ির লোগাং গ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী ও সেটলার বাঙালিদের যুথবদ্ধভাবে খেলা রক্তের হলি আর নারকীয় তান্ডব আজও পাহাড়ী মানুষের মনে ক্ষোভ আর ভীতির সঞ্চার করে। সেদিন নিরাপত্তা বাহিনীর এলোপাতাড়ি ব্রাশ ফারারিং ও সেটলার বাঙালিদের নারকীয় তান্ডবে প্রায় ১২০০ জুম্ম আদিবাসীকে হত্যা করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে জানা যায়। লোগাং গুচ্ছগ্রামের জুম্মদের প্রায় ৮০০ ঘরবাড়ীতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাত ও তান্ডব চালানো হয়। ফলে চলমান সহিংসতায় আরেকটি জুম্ম শরনার্থী স্রোত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। এই গণহত্যার প্রতিবাদে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তৎকালীন স্পোক পার্সন রামেন্দু শেখর দেওয়ান ১৯৯২ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা অফিসে অবস্থিত জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের মানবাধিকার কমিশনে পাহাড়ের জুম্ম আদিবাসীদের পক্ষে প্রতিবাদ লিপি তুলে ধরেন। কিন্তু এই নারকীয় তান্ডব ও গণহত্যার বিচার এখনো হয়নি। এ ঘটনায় তৎকালীন বিশিষ্টজনদের বিবৃতি আইপিনিউজ এর পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলোঃ-

১৮ এপ্রিল, ১৯৯২

পার্বত্য চট্টগ্রামের লোগাং গ্রামে সংঘটিত গণহত্যা প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রত্যাগত ২৩ জন রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, লেখক, আইনজীবি, সাংবাদিক, ছাত্রনেতা ও মানবাধিকার কর্মীর যুক্ত বিবৃতি:

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বা অর্থাৎ পার্বত্য জনগণের ঐতিহ্যবাহী উৎসব বৈ-সা-বি অনুষ্ঠানের কথা ছিল ৩০,৩১ চৈত্র ও পহেলা বৈশাখ (১২,১৩,১৪ এপ্রিল)। বৈ-সা-বি উদযাপন কমিটি এতে যোগদানের জন্য আমাদের আমন্ত্রন জানায় এবং সেইমত আমরা গত ১১ এপ্রিল খাগড়াছড়ি যাই। ঐদিন দেশের সকল জাতীয় দৈনিকে একটি খবর প্রকাশিত হয় এই মর্মে যে, ”শান্তিবাহিনীর হামলায় খাগড়াছড়ির লোগাং গ্রামের ১ জন বাঙালী ও ১০ জন উপজাতীয় নিহত হয়েছেন।” খাগড়াছড়ি গিয়ে আমরা স্বভাবতঃই ঐ অঞ্চলে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করি ঘটনার সত্যাসত্য জানবার দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু পরের দিন ১২ই এপ্রিল লোগাং যাবার পথে পানছড়িতে আমরা বাধাপ্রাপ্ত হই এবং আমাদের নিরাপত্তার কথা বলে নিরাপত্তাবাহিনী আমাদের ঘটনাস্থলে যেতে বাধা প্রদান করে। ফিরবার পথে এবং খাগড়াছড়িতে বহুসংখ্যক প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘটনার শিকার ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। কর্তৃপক্ষীয় বিভিন্ন ব্যক্তির সাথেও আমাদের কথা হয়। এসব কিছু থেকে আমরা স্পষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, লোগাং গ্রামে একটি গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে। একজন বাঙালী কিশোর নিহত হওয়ার সূত্র ধরে সেখানে চাকমা ও ত্রিপুরা গুচ্ছগ্রামে গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (ভিডিপি) ও আনসার বাহিনীর কিছু বাঙালী দুষ্কৃতকারীর সহযোগীতায় হামলা চালায়। চারশরও বেশি ঘর সেখানে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয় এবং শিশু-নারী-বৃদ্ধসহ ২ শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। এ বর্বর গণহত্যার বর্ণনা শুনে আমরা স্তম্ভিত হই, এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। এ বর্বর গণহত্যার কারণে পুরো অঞ্চলে পাহাড়ী জনগণের বার্ষিক উৎসবের সকল কর্মসূচী পরিত্যক্ত হয়। আনন্দমুখর জনপদ শোক ও অশ্রুর জনপদে পরিণত হয়। ঘরছাড়া, মা হারানো, বাবা হারানো, সন্তান হারানো নিরীহ দুর্বল দরিদ্র জনগণের সঙ্গে আমরাও ক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে আমরা ক্ষুব্ধ প্রকৃত ঘটনা চেপে রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের ন্যাক্কারজনক চেষ্টায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পার্বত্য জনগণের উৎসবের অংশীদার হতে গিয়ে আমরা তাঁদের শোকের ও ক্ষোভের অংশীদার হয়েছি। অঞ্চলের জনগণ ও কর্তৃপক্ষের বিভিন্নস্তরে কথা বলে এবং বাস্তব অবস্থা দেখে বুঝেছি সমগ্র এলাকায় কার্যতঃ সামরিক শাসন চলছে। সমগ্র বেসামরিক প্রশাসন আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের অধীনস্ত, এলাকায় সংবাদপত্র বা সাংবাদিকদের স্বাধীন কোন কার্যক্রম নেই। চলাফেরার সীমাবদ্ধতা সাংঘাতিকভাবে সীমাবদ্ধ।

পাহাড়ী জনগণের সঙ্গে বাঙালী জনগণের একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং তা অব্যাহত রেখে লাভবান হচ্ছে একটি কায়েমী স্বার্থবাদী মহল। জাতীয় ঐক্য, অখন্ডতা ও বাঙালী জনগণের স্বার্থের কথা বললেও এই প্রক্রিয়ায় জাতীয় ঐক্য, অখন্ডতা ও বাঙালী সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাতিগত নিপীড়নের বিরূদ্ধে দীর্ঘদিন যারা লড়াই করছেন, সেই বাঙালী জনগণ অন্য জাতির নিপীড়ন অনুমোদন করতে পারেন না। এই অবস্থার দায়-দায়িত্ব রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের, বাঙালী শাসক শ্রেণীর।

পার্বত্য অঞ্চলের অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতি জিইয়ে রেখে চলাফেরার, মত প্রকাশ, তথ্য প্রকাশ ইত্যাদির উপর নানা প্রকার বিধি নিষেধ আরোপ করে বিপুল লুণ্ঠন পরিচালিত হচ্ছে বলে আমাদের ধারণা। ঐ অঞ্চলে যে বিপুল রাজস্ব ব্যয় হচ্ছে তার বাস্তব পরিণতি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ আছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মানুষদের বাঙালীদের চাইতে ভিন্নভাবে সন্দেহ ও অসম্মানের চোখে কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে কারণে জটিলতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিপুল সম্পদ ও সম্ভাবনার এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামের এই পরিস্থিতি সমগ্র জাতীয় উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। আমরা তাই পরিস্থিতি পরিবর্তনের আশু পদক্ষেপ হিসেবে কয়েকটি সুপারিশ করছে। আশা করছি নির্বাচিত সরকার এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে পার্বত্য অঞ্চলে স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টিতে উদ্যোগী হবেন।

(১) অবিলম্বে লোগাং হত্যাকান্ডের স্বাধীন, নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। পুরো ঘটনা বিস্তারিতভাবে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। পর্যায়ক্রমে এতদিন যত হত্যাকান্ড, ধর্ষণ, নিপীড়ন হয়েছে সেই ঘটনাবলীর বিচার বিভাগীয় তদন্তকার্য পরিচালনা করে সকল তথ্য প্রকাশ করতে হবে ও দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে হবে।

(২) পার্বত্য চট্টগ্রামে গত ২০ বছরে সৃষ্ট পরিস্থিতি, রাজস্ব ব্যয় ও তার ফলাফল সম্পর্কে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে।

(৩) পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সমাধানের জন্য বলপ্রয়োগের নীতি বর্জন করে বিষয়টিকে সংসদের অধীনস্থ করতে হবে এবং ঐ সংসদে খোলাখুলি আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে।

(৪) সংসদ সদস্য ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় কমিটি গঠন করে তার মাধ্যমে ঐ অঞ্চলের বিভিন্ন ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দল ও সামাজিক শাস্তিসমূহের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে এবং ঐ অঞ্চলে সন্ত্রাসমুক্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু করবার প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

(৫) প্রশাসনকে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে বেসামরিক নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসন কার্যকর করতে হবে।

(৬) অঞ্চলের সমগ্র জনগণকে হাতগোণা কিছু লোকের শান্তিবাহীনির সঙ্গে এক করে দেখার বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি বর্জন করতে হবে। ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাসমূহ যাতে নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে এ দেশের সব মৌলিক অধিকার ধারণ করে পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের নাম:
১. পঙ্কজ ভট্টাচার্য, সাধারণ সম্পাদক, ন্যাপ ;
২.দিলীপ বড়ুয়া সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল;
৩. নিজামুল হক নাসিম, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট;
৪. শাহজাহান মিয়া, সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন;
৫. আনু মুহাম্মদ, শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ;
৬. সৈয়দ হাশমী,শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ;
৭. মোস্তফা ফারুক, কেন্দ্রীয় নেতা, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল;
৮. আদিলুর রহমান খান শুভ্র, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট;
৯. সারা হোসেন, ব্যারিস্টার;
১০. নাসির-উদ-দৌজা, সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন;
১১. আহাদ আহমেদ, সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন;
১২. বিপ্লব রহমান, প্রকাশন সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন;
১৩. প্রিসিলা রাজ, সংবাদদাতা, প্রিয় প্রজন্ম;
১৪. আব্দুল জলিল ভুইঞা, ডেইলী স্টার;
১৫. আখতার আহমেদ খান, বাংলার বাণী;
১৬. সলিমউল্লাহ সেলিম, আলোকচিত্র সাংবাদিক;
১৭. সৈয়দ সারোয়ার আলম চৌধুরী, বাংলাদেশ অবজারভার,
১৮. সুবীর দাস, ভোরের কাগজ;
১৯. আহমেদ যোবায়ের, দৈনিক জনতা;
২০. রোজালীন কান্তা, হটলাইন, বাংলাদেশ;
২১. শিশির মোড়ল, বাংলাদেশ মানবাধিকার সমন্বয় পরিষদ;
২২. মাসুদ আলম, জাতীয় যুব জোট;
২৩. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কথাশিল্পী, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ লেখক শিবির

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *