বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের উদ্যোগে ঢাকায় আদিবাসী যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের উদ্যোগের আজ ১৯ মার্চ ২০২১ ঢাকার আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে প্রথমবারের মত আদিবাসী যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সদস্য সচিব আন্তনি রেমা সঞ্চালনার উক্ত সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরীন কনা, আদিবাসী নারী নেটওর্য়াকের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা প্রমুখসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা আদিবাসী ছাত্র-যুব নেতৃবৃন্দ। সম্মেলনের শুরুতে পায়রা উড়িয়ে শুভ উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস। উক্ত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির আহ্বায়ক অনন্ত বিকাশ ধামাই।

সম্মেলনের শুরুতে আদিবাসী অধিকার আন্দোলনে এই যাবৎ যারা অগ্রনী ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের অবদান স্মরণ এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাষ্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আদিবাসীদের অধিকার আন্দোলনের অকৃত্রিম বন্ধু জিয়াউদ্দীন তারেক আলীর মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করা হয়।

সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির সদস্য চন্দ্রা ত্রিপুরা। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন, এ আদিবাসী যুব সম্মেলন আদিবাসীদের জীবনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক দিন। এ দিবসটি সকল আদিবাসী যুবদের একটি মেলবন্ধন তৈরি করবে। আগামী দিনের আদিবাসী অধিকার আন্দোলনে দেশের সমগ্র আদিবাসী যুবদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্রীয় সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। সে লড়াইয়ে সকল আদিবাসী যুবদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান এই যুব নেত্রী।

উদ্বোধনীর ভাষণে সম্মেলনের উদ্ধোধক ও ঢাবির গণযোগাযোগ ও সংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, আদিবাসী তরুণদেরকে নিজেদের অধিকারের জন্য সংগঠিত হতে হবে। তাঁদেরকে অনেক বেশি বই পড়তে হবে। তরুণ সমাজকে মানব মুক্তি সম্পর্কে জানতে হবে। সময়কে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষায় জাতির মুক্তি। তিনি আরো বলেন, পরিবর্তনের জন্য ইতিবাচক চিন্তা ভাবনা করতে হবে আদিবাসী তারুণ্যকে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, আদিবাসী মানুষকে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখতে হবে। রাষ্ট্র যুবদের জন্য এখনো আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। কিন্তু স্বপ্ন নিয়ে আগামীর দিনে এগিয়ে যেতে হবে। আদিবাসী বাঙ্গালী সবাইকে নিয়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবতীণ হতে হবে বলেও মনে করেন এই আদিবাসী নেতা।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নাগরিক উদ্যোগের নিবাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, বাংলাদেশে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রকট হওয়ার কারনে নারীর প্রতি বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটেই চলেছে। বৈষম্য নিরোধ আইন এখনও পর্যন্ত খসড়া করা হয়নি বিধায় এদেশের আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে । তিনি আরো বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার মধ্য দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং অধিকার আদায় সংগ্রামে লিপ্ত হতে হবে। এ কাজে আদিবাসী যুব ফোরামকেই দায়িত্ব নিতে হবে বলেও মনে করেন এই মানবাধিকার কর্মী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরিন কণা বলেন, সবাই বলে ছাত্র ও যুবরা আমাদের ভবিষ্যৎ কিন্তু আমি বলি ছাত্র ও যুবরা আমাদের বর্তমান। তাই তিনি আদিবাসী যুব সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র-যুবদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি আরো বলেন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও বাংলাদেশের আদিবাসীরা এখনো ভয়ের মধ্যে দিন অতিবাহিত করছেন।

বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর সহ-সভাপতি আব্দুল আহার মিনার বলেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি হওয়ার পিছনে আদিবাসীদের বিশেষ অবদান রয়েছে। কিন্তু এ পঞ্চাশ বছরেও আদিবাসীরা এখনও সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়নি। আদিবাসীদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন বন্ধ হয়নি। এ যুব সম্মেলন ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। তিনি আদিবাসীদের আন্দোলন সংগ্রামে সবসময় পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা বলেন, আদিবাসীদের আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্র যুবদের এগিয়ে আসতে হবে।পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এই আন্দোলন সংগ্রামে যুবদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে বলেও মনে করেন এই নারী নেত্রী। আদিবাসী যুব সমাজকে গুণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুবদের মতামত নিতে হবে। আদিবাসী নারীদের আন্দোলন সংগ্রামে আরো বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নান্টু ত্রিপুরা বলেন, পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো এখানো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। তাই আদিবাসীদের টিকে থাকার লড়াইয়ে ছাত্র-যুবদের আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমান কঠিন প্রেক্ষাপটে এই যুব সম্মেলন অনুষ্ঠান যুবদের আরো সংগঠিত করবে এবং পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী যুবদের সেতুবন্ধন সৃষ্টি করবে বলেও তিনি মতামত ব্যক্ত করেন।

সংহতি বক্তব্যে বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলিক মৃ বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের উপর নানা অত্যাচার , নির্যাতন, নিপীড়ন চলমান রয়েছে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও আদিবাসীদের এখনও কোন ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি। করোনা মহামারীর মধ্যেও প্রতিনিয়ত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় ঘটে চলেছে।

সভাপতির বক্তব্যের অনন্ত বিকাশ ধামাই বলেন, স্বাধীনতায় পঞ্চাশ বছর পরেও আদিবাসীরা এখনো নিপীড়িত নির্যাতিত। তিনি পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী যুব সমাজকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রথম অধিবেশনের সভা সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

উক্ত সম্মেলন থেকে নয় দফা দাবী উত্থাপন করা হয়। দাবীসমূহ উত্থাপন হল:

১.আদিবাসী যুবদের জীবনমান টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আদিবাসী যুব সংগঠনসমূহের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে রাষ্ট্র কর্তৃক আদিবাসী যুব উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে;

২. আদিবাসী তরুণ ও যুব ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উচ্চশিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোটা নিশ্চিত করতে হবে;

৩. আদিবাসী যুবদের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে, কর্মক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা ও তাদের প্রতি বৈষম্য দূর করতে হবে;
৪. আদিবাসী যুবদের নেতৃত্ব বিকাশ, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে;

৫. আদিবাসী কন্যা শিশু ও যুব নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা বন্ধ করতে হবে ও সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ঘটে যাওয়া সহিংসতাগুলোর ন্যায় বিচার করতে হবে;

৬. আদিবাসী যুবদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার মিথ্যা মামলা-হয়রানি বন্ধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে;

৭ . আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে;

৮. অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে;

৯ . সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন করতে হবে;

“অধিকার আদায়ে নিবেদিত প্রাণে, মিলি সবে আদিবাসী যুব সম্মেলনে” এই স্লোগানকে নিয়ে অনুষ্ঠিত দু’দিন ব্যাপী উক্ত সম্মেলনে আগামীকাল সারাদেশের আদিবাসী অঞ্চল থেকে আসা যুব প্রতিনিধিদের নিয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *