রেমা চা শ্রমিকদের নারী দিবস পালনঃ তুলে ধরলেন ১৩ দাবি

গতকাল ৮ মার্চ, সোমবার, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে হবিগঞ্জের রেমা চা বাগানে বাংলাদেশ চা কন্যা নারী সংগঠনের উদ্যোগে ১৩ দফা দাবিতে নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়৷

দুপুর ১২টায় রেমা চা বাগানের মাঠে সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপি এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

রেমা চা বাগানের পঞ্চায়েত সদস্য বিজলা গোয়ালার সভাপতিত্বে উক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌস আরা বেগম।

এছাড়াও প্রধানবক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার।

সমাবেশে বক্তারা নারী দিবসের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও তাৎপর্য তুলে ধরে নারীদের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণে সর্বস্তরের নারীদের জেগে ওঠার আহ্বান করেন।

নারীদের পুরুষতন্ত্রের শেকল থেকে বের হয়ে স্বাধীন নারী হিসেবে নিজের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের কোন বিকল্প নেই বলেও বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।

বক্তারা আরও বলেন, নারীরা সমাজে এমনিতে শোষিত, চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে আরও শোষিত। এই শোষনের বিরুদ্ধে এখনই সময় রুখে দাড়ানোর।

এ সময় নারী সমাবেশ থেকে ১৩ দফা দাবি উত্থাপণ করা হয়। দাবিসমূহ হল-

১.প্রতিটি চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করতে হবে। পাশাপাশি লিপ পাই (অতিরিক্ত পাতা তোলার জন্য কেজি প্রতি) নারী চা শ্রমিককে ০৮ টাকা করে দিতে হবে।

২. নারী চা শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস উন্নীত করতে হবে।

৩. প্রতিটি চা বাগানের কমিউনিটি ক্লিনিকে নারীদের জন্য বিনামূল্যে স্যানেটারি প্যাড প্রদান করতে হবে।

৪. মাসিকের সময়কালীন পাহাড় বেয়ে পাতা তোলা নারীর শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। তাই প্রতি মাসে মাসিকের সময়কালীন নারী চা শ্রমিককে ২ (দুই) দিনের ছুটি দিতে হবে।

প্রতিটি চা বাগানে প্রসূতি নারীর জন্য উন্নতমানের নিরাপদ ডেলিভারির ব্যবস্থা, পুষ্টিকর খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে।

৬. গর্ভবতী মা সহ যে কোনো রোগীকে হাসপাতালে আনা নেওয়ার জন্য প্রতিটি চা বাগানে ন্যুনতম একটি এম্বুলেন্স থাকতে হবে।

৭. বর্ষাকালে চা বাগানে নারী শ্রমিকদের বৃষ্টির পানি মাথায় দিয়ে চা পাতা সংগ্রহ করতে হয়। সেজন্য প্রতিটি নারী চা শ্রমিকের জন্য একটি করে রেইনকোট বরাদ্দ দিতে হবে।

৮. চা বাগানে নারী শ্রমিকদের মধ্যে জরায়ুমুখ নেমে যাওয়া রোগটি ব্যাপক আকারে রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখার ফলে নারীর জরায়ুমুখ নেমে আসে। তাই প্রতিটি সেকশনে নারী চা শ্রমিকদের জন্য একটি করে শৌচাগার এর ব্যবস্থা করতে হবে।

৯. প্রতিটি চা বাগানে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এমনকি ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন নারী চা শ্রমিককে মা হতে বাধ্য করা যাবে না।

১০. সকল বাগানে নারীসহ চা শ্রমিকের ভুমি’র অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

১১. প্রতিটি বাগানে নূন্যতম একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে বাগান কর্তৃপক্ষের।

১২. ঘরে বাইরে যে কোন প্রকার নারী নির্যাতন বন্ধে কার্যকর প্রদক্ষেপ নিতে হবে। সেই সাথে নারী/শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

১৩.চা বাগানের শিক্ষিত নারীকে স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।

উক্ত নারী সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন নাট্যকার ও সাহিত্যিক রুমা মোদক, বাংলাদেশ কৃষক সমিতির নির্বাহি সদস্য লাকি আক্তার, চা জনগোষ্ঠী ভূমি অধিকার ছাত্র যুব আন্দোলনের সভাপতি বীরেন কালেন্দী, নারী সেল সদস্য অনিন্দা সাহা তুলতুল, বাংলাদেশ চা কন্যা নারী সংগঠনের উপদেষ্টা ও নারী অধিকার কর্মী মাহমুদা খাঁ।

এছাড়াও আরও উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন ব্যতিক্রম চা বাগানের সভাপতি রনি, চা শ্রমিক সন্তান ও চা শ্রমিক সংগঠক মোহন রবি দাশ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, হবিগঞ্জ জেলা সংসদের সভাপতি প্রণব কুমার দেব, তেলিয়াপাড়া চা বাগানের সাধারণ সম্পাদক লালন পাহাল, রেমা চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি ডিগেড বেনাজী, লালচান্দ চা বাগানের সাগর বাউড়ী। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন চা কন্যা নারী সংগঠক খাইরন আক্তার ও সন্ধ্যা রাণি ভৌমিক প্রমুখ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *