পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় জুম্ম নারীদের উপর নিপীড়ন বাড়ছে: নারী দিবসের আলোচনায় সন্তু লারমা

কত আশা আকাঙ্খা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে হাহাকার বিরাজ করছে। যার কারণে জুম্ম নারীদের উপর সীমাহীন নির্যাতন ও নিপীড়ন বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদেও চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)।

৮ মার্চ হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির উদ্যোগে রাঙামাটির জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করছেনা, কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যে লড়াই তার জন্য ব্যক্তি কতটুকু প্রস্তুত তার প্রশ্ন আমাদেরকে করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোরনে নারীদেও অংশগ্রহন জোরদার করারও আহ্বান জানান পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান।

উক্ত আলোচনা সভাটি উদ্ধোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী আন্দোলনের যোদ্ধা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সদস্য শ্রীমতি জ্যোতিপ্রভা লারমা মিনু । হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শান্তি দেবী তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি রাঙামাটি জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক রিতা চাকমার সভাপতিত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ছাড়াও আলোচক হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন , টি আই বির ট্রাষ্টি এডভোকেট সুষ্মিতা চাকমা, অবসরপ্রাপ্ত উপ-সচিব ও আদিবাসী ফোরামের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, এম এন লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমা , পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির রাঙামাতি জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নান্টু ত্রিপুরা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশিকা চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক নিপন ত্রিপুরা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি রিনা চাকমা ।এছাড়াও রাঙামাটির শহরের সমাজের প্রগতিশীল আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তি, সংগঠন ও ছাত্র সংগঠনের নেতৃৃবৃন্দরা মিলে প্রায় পাঁচ’শ জনের অধিক নারী উপস্থিত ছিলেন।

উক্ত আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি ম্রানু মারমা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা আরো বলেন, ৩৩ বছর ধরে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের জুম্ম নারী মুক্তি আন্দোলনের যোদ্ধাদের অবদান ও লড়াই এখনো অব্যাহত রয়েছে। তার জন্য হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কর্মীদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতাও জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ ব্রিটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, পকিস্তান সরকারের মরণফাঁদ কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধেও লড়াই করেছিল সে লড়াই আজো অবধি বহাল আছে দাবী করে তিনি আরো বলেন, জুম্ম নারীকে শুধু রান্নাঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, তার প্রাপ্য অধিকারটুকু বুঝিয়ে নিতে পুরুষতান্ত্রিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে। নারীকে বাদ দিয়ে শুধু পুরুষকে দিয়ে আন্দোলন চলতে পারে না, তা সঠিক আর্দশও হতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ এখনো শ্রেণিবিভক্ত, যতদিন পর্যন্ত শ্রেণিবিভক্ত সমাজ থাকবে ততদিন পর্যন্ত নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা যাবে না। তাই হিল উইমেন্স ফেডারেশন কর্মীদের আর সক্রিয় হয়ে কাজ করার আহবান জানান।

এদিকে অন্যান্য বক্তারা বলেন, নারী মুক্তি আন্দোলন কেবল নারীদরে নয়। নারী পুরুষ উভয়ই সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রেণিহীন সমাজ বির্নিমাণের মধ্য দিয়ে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাই নারী মুক্তির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেয়। নারীকে বাদ দিয়ে কোন সমাজ তথা রাষ্ট্র এগিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী আজ দৈন্যদশায় দিনকাটাচ্ছে। তাদের উপর সংঘটিত করে চলেছে নির্যাতন-নিপীড়ন। তার একটির সুরহাও সঠিক আইনি প্রক্রিয়ায় হয়নি।শুধু তাই নয়, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য একের পর এক জুম্ম বিধবংসি কার্যক্রম, চুক্তি বিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে। কেউ তা নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে গুম, খুন করে ফেলা হচ্ছে। মিথ্যা মামলায জড়ানো হচ্ছে। পর্যটনের নামে জুম্মদের ভূমি বেদখল করে চলেছে। স্থানীয় ম্রোরা, দেশ ও বিদেশে প্রবল বিরোধিতা করা স্বত্তেও চিম্বুকের নাইতং পাহাড়ে ম্রোদের জুমভূমি দখল করে পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ করে চলেছে। এমন উন্নয়ন কেউ চায় না। জুম্ম উচ্ছেদের উন্নয়ন বন্ধ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিও জানানো হয় উক্ত আলোচনা সভায়।
আলোচনা সভার সভাপতি পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি রাঙামাটি জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক রিতা চাকমার সমাপনি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উক্ত আয়োজনটি সমাপ্ত হয়।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *