গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি

চিম্বুকের নাইতং পাহাড়ে হোটেল ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের নামে ম্রোদের আবাসভূমি বেদখলের প্রতিবাদে ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত সংহতি সমাবেশ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপিটি হুবুহু পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো।

বান্দরবান পার্বত্য জেলার চিম্বুক পাহাড়ে “ম্যারিয়ট হোটেলস এ্যান্ড রিসোর্টস” নামে পাঁচ তারকা হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণ প্রকল্প বাতিল ও ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সম্পাদিত ৬৯পদাতিক ব্রিগেড এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে

স্মারকলিপি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

বান্দরবান পার্বত্য জেলার চিম্বুক পাহাড়বাসীর পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।

সাম্প্রতিককালে বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ৪৭ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্বে চিম্বুক-থানচি সড়ক সংলগ্ন চিম্বুক পাহাড়ের কোলে ৩০২ নং লুলাইং মৌজার নাইতং পাহাড়ে ও ৩৫৫ নং সেপ্রু মৌজার কাপ্রুপাড়া, ডলাপাড়া ও এরাপাড়া ঘেঁষে আদিবাসী ম্রো অধ্যুষিত অঞ্চলে বিতর্কিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সিকদার গ্রুপের অঙ্গ সংগঠন আর এ্যান্ড আর হোল্ডিংস লিমিটেড এবং ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও ৬৯তম ব্রিগেড, বান্দরবান এর যৌথ উদ্যোগে “ম্যারিয়ট হোটেলস্ এ্যান্ড রিসোর্টস” নামে একটি পাঁচ তারকা হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য যে, উক্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালের ৬৯পদাতিক ব্রিগেড কমান্ডার এবং ক্য শৈ হ্লা, চেয়ারম্যান, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক ৪০বছর মেয়াদী ২০একর ভূমির ইজারা চুক্তি সম্পাদিত হয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কারণে চিম্বুক ও নাইতং পাহাড়ে শতাব্দীকাল ধরে জুম চাষ করে আসা ম্রো জনগোষ্ঠী তাদের বসতভিটা, শ্মশান, পবিত্র পাথর, পবিত্র বৃক্ষ, পানির উৎস ইত্যাদি থেকে উচ্ছেদের মুখে পড়বে। এখানে প্রায় ‘এক হাজার একরের অধিক’ ভূমি থেকে তাদের ৬টি গ্রাম সরাসরি উৎখাত হবে এবং ১১৬টি পাড়ার আনুমানিক ১০ হাজার বাসিন্দার ঐতিহ্যবাহী জীবিকা বিভিন্নভাবে স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অথচ এটা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে নয়, বর ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী জীবনাচার, তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অন্তরাল (Individual and Social Privacy), নারীর সম্ভ্রম, মূল্যবোধ এবং তাঁদের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে কলুষিত করার বিনিময়ে শুধুমাত্র বিনিয়োগকারীদের মুনাফা, বিত্তশালী পর্যটকের আয়েশী বিনোদন ও ভোগ-বিলাসের জন্য এই বেদখলের নীলনকশা আঁকা হয়েছে। ইতিপূর্বেও বিভিন্ন উন্নয়ন এবং পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের কারণে ম্রোরা তাদের পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে তাদের নিজ ভূমিতেই পরবাসী হয়েছে এবং তাদের অনেকেই নিরবে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে ।

উল্লেখ্য যে, ১৯৯১-৯২ সনে বাংলাদেশ সেনা ও বিমান বাহিনীর গোলন্দাজ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (ফায়ারিং রেঞ্জ) স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কারণে সুয়ালক ও টংকাবতী ইউনিয়নের তিনটি মৌজা (৩১৪ নং সুয়ালক, ৩১৫ নং রেনিক্ষ্যং ও ৩০৮ নং উত্তর হাঙ্গর) থেকে ৩৮১ ম্রো পরিবার উচ্ছেদ হয়। আবার ২০০৬-২০০৭ সনে ঐ অধিগ্রহণকৃত এলাকা থেকে আরও ৩০০ শতাধিক ম্রো পরিবার উচ্ছেদ হয়। পরবর্তীতে নীলগিরি হিল রিসোর্টস স্থাপনকালে আরো ২০০ ম্রো ও মারমা পরিবারকে উচ্ছেদ হতে হয়। এইসব ভূমিচ্যুত মানুষেরা নিরুপায় হয়ে অবশেষে চিম্বুক পাহাড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ২০২০ সালের শেষের দিকে এসে আবারও তাদের আবাসভূমিতে আন্তজার্তিক ম্যারিয়ট চেইন এর অন্যতম পাঁচতারা হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণের কারণে ম্রো জনগোষ্ঠী পুনরায় তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের মুখে পড়েছে। তাদেরকে আর কতবার উচ্ছেদ হতে হবে?

উল্লেখ্য যে, পাঁচতারকা হোটেল ও বিনোদন পার্কটির প্রয়োজনে ২০ একর জমি নেওয়ার কথা বলা হলেও কার্যত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে চতুর্পাশে সীমানা খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। একইসাথে ম্রোদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি তাদের সম্মতির তোয়াক্কা না করে ইতোমধ্যেই আর এ্যান্ড আর হোল্ডিংস লিমিটেড তাদের প্রস্তাবিত স্থাপনার প্রয়োজনে পাহাড় কাটা শুরু করেছে এবং ম্রো জাতির শ্মশান, পবিত্র পাথর, পবিত্র বৃক্ষ ও পানির উৎসে যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি করছে। শুধু তাই নয়, বিগত ৫ ও ৬ জানুয়ারি তাদের মৌসুমি জীবিকার অন্যতম উপকরণ “ফুল ঝাড়–” সংগ্রহ করতে গেলে তাদেরকে হয়রানি করা সহ বাধা দেওয়া হয় এবং সেই সাথে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
ইতিপূর্বে ম্রোদের ভূমি জবরদখলের বিরুদ্ধে গত ৭ নভেম্বর আপনার বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয় ও ৮ নভেম্বর রবিবার সকালে চিম্বুক পাহাড়ের ২৫টি পাড়ার প্রায় এক হাজার ম্রো বাসিন্দা একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে তাদের ঐতিহ্যবাহী প্লুং (বাঁশি) বাজিয়ে তাদের শত বছরের প্রাচীন আবাসভূমিতে হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণের কাজ বন্ধ করার দাবি তোলে এবং প্রচারপত্র বিলি করে। তাদের দাবির সমর্থনে বিভিন্ন এথনিক ছাত্র ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে ২৭ নভেম্বর বান্দরবানে, ৩০ নভেম্বর রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। শুধু তাই নয়, বিগত ৭ ফেব্রুয়ারি নাইতং পাহাড় ও তার আশেপাশের আনুমানিক ৪০ টি গ্রামের প্রায় ১৫০০ গ্রামবাসী দীর্ঘ ২২ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে চিম্বুক পাহাড় থেকে “লং মার্চ” করে বান্দরবান সদরে এসে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন।

এদিকে আর এ্যান্ড আর হোল্ডিংস লিমিটেড এর পক্ষে সিকদার গ্রুপের মুখপাত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হোটেল ও বিনোদন পার্কটি নির্মাণে জমির বৈধ মালিকানা রয়েছে মর্মে দাবি করলেও জেলা পরিষদ জানান, আর এ্যান্ড আর হোল্ডিংস এর কাছে তারা কোন ভূমি হস্তান্তর করেননি, তবে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে ২০ একর জমির ইজারা প্রদান করা হয়েছে মর্মে জানানো হয়। যেহেতু সংশ্লিষ্ট ভূমির (২০ একর) মালিকানা স্বত্ব বান্দরবান জেলা পরিষদের নেই, তাই জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত ভূমির ইজারা কোনভাবেই বৈধতা পেতে পারে না। উল্লেখ্য যে, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ আইনের ৬৪ নং ধারার এখতিয়ারের মধ্যে Trustee বা জিম্মাদার এর ভূমিকায় রয়েছেন। রক্ষক ভক্ষক হতে পারে না, হয়ে থাকলে তা আইন ও ন্যায় পরায়ণতা (Law & Equity) এর বরখেলাপ হবে। তাতে Principle of Natural justice লঙ্ঘিত হবে। কারণ, বৈধভাবে অর্জিত ভূমির মালিকানা বা ইজারা স্বত্ব হস্তান্তরের বেলায়, বিশেষ করে হস্তান্তর-গ্রহীতা অবাসিন্দা ও অপাহাড়ী হলে, সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দার সম্মতি, মৌজা হেডম্যানের সুপারিশ ও পার্বত্য জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদনের বিধান রয়েছে। কিন্তু পরিষদ কর্তৃক ভূমির বন্দোবস্তি কিংবা ইজারা স্বত্ব অর্জিত না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে ভূমিস্বত্ব হস্তান্তর করার প্রশ্নই অবান্তর।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি অবগত আছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ এবং উপরোক্ত আইনসমূহের মাধ্যমে স্বীকৃত প্রথা, রীতি, রেওয়াজ ও পদ্ধতিকে লঙ্ঘন করে ম্রো জাতির স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি (Free, Prior and Informed Consent-FPIC) ব্যতিরেকে, পাঁচতারকা হোটেলের জন্য জবরদস্তিমূলক ভূমি গ্রাস ও উন্নয়ন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ১০ হাজার ম্রো ভূমিপূত্র তাদের সরব ও ন্যায্য প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ম্রোদের জীবন ও জীবিকাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে তাদের আবাস ও আবাদভূমিতে বিলাসবহুল হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণের এই উদ্যোগ একই সাথে বাংলাদেশের সংবিধানেরও পরিপন্থী, কারণ সংবিধানে জনগণের জীবনের, সম্পত্তির এবং পেশার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যে ম্রোদের এই আইনগত দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে গত ১৭ নভেম্বর ৬২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করে আপনার এবং পার্বত্য চট্গ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বরাবর পত্র প্রেরণ করেছেন। পত্রে ম্রোদের তাদের আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদ, তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের প্রতি হুমকি ছাড়াও সিকদার গ্রুপের মতো একটি বিতর্কিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জনস্বার্থ বিরোধী এ প্রকল্প বাতিল এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭ ও প্রযোজ্য আইনের অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ চুক্তির সার্বিক বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

এছাড়াও, গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১ জেনেভায় জাতিসংঘ কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায় যে, জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক (Rapporteur) যথাক্রমে Francisco Cali Tzay, ওয়ার্কিং গ্রুপ অন দি ইস্যু অব হিউম্যান রাইটস্ এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল কর্পোরেশনস এ্যান্ড আদার বিজ্নেস এন্টারপ্রাইজেস্-এর চেয়ারম্যান Dante Pesce, ভাইস চেয়ারম্যান Surya Deva সহ Githu Muigai, E. Karska I Anita Ramasastry, মানবাধিকার এবং পরিবেশ বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক উধারফ জ. ইড়ুফ, হিউম্যান রাইটস্ ডিফেন্ডারের বিশেষ প্রতিবেদক David R. Boyd পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশালায়তনের পর্যটন রিসোর্টস স্থাপন করে ম্রো জনগোষ্ঠীকে তাদের চিরায়ত আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং পরিবেশের ক্ষতি সাধন না করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এমতাবস্থায়, আমরা চিম্বুক পাহাড়বাসীরা আপনার বরাবরে নিম্নোক্ত দাবিগুলো জানাচ্ছি :

ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, প্রাকৃতিক সম্পদে প্রথাগত অভিগম্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ম্রো অধ্যুষিত এলাকায় ম্যারিয়ট হোটেল ও বিনোদন পার্ক নামক প্রকল্পটি অবিলম্বে বাতিল করা;

২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালের সম্পাদিত ৬৯পদাতিক ব্রিগেডের সাথে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের ইজারা চুক্তি বাতিল করতে হবে।

পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী পর্যটনসহ উন্নয়নের নামে অবাধ ও পূর্বাবহিত সম্মতি ব্যতিরেকে অন্যান্য সকল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড অবিলম্বে বন্ধ করে অনুরূপ প্রক্রিয়ায় দখলকৃত সকল ভূমি থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করা

তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং বিনীত নিবেদক,
ঢাকা, বাংলাদেশ। চিম্বুক পাহাড়বাসী

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *