ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি ও মাহাতো জাতিগোষ্ঠীর কুড়মালি ভাষা সংরক্ষণ- উজ্জল মাহাতো

পৃথিবীর সব ফুল যদি লাল হতো তাহলে কেমন হতো? নিশ্চয় ভালো লাগতো না। পৃথিবীর সব রং যদি এক হতো তাহলে কেমন হতো? সেটাও হয়তো সুখকর হতো না। ঠিক তেমনি পৃথিবীর সকল মানুষের ভাষা যদি এক হতো সকলে এক ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতো তাহলে কেমন হতো? পৃথিবীতে বিভিন্নরকম ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে তাইতো পৃথিবীটা এতো বৈচিত্র্যময়, এতো সুন্দর।

নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা?
রামনিধি গুপ্তের এই কবিতাংশ কেবল আমাদের নয় বিশ্বের প্রত্যেকটি মানুষের কাছেই একথা চন্দ্র সূর্যের ন্যায় সত্য। পৃথিবীতে মাতৃভাষার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজারের মতো। অনেক ভাষা বিলুপ্ত প্রায়, অনেক ভাষায় অন্য শব্দের অনুপ্রবেশ হতে হতে ভিন্ন রকম হয়ে হয়ে গেছে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রæয়ারিতে সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, শফিউর, সহ নাম না জানা কতো ভাষা শহীদ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রাজপথে। বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম মাতৃভাষা বাংলা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ প্রানহানি ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত প্রকৃতির এক অপরুপ সৌন্দর্যের দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলা ভাষা বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি ভাষা ও জাতীয় ভাষা। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ও বিশ্বের অন্যতম ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র । বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র একভাষী রাষ্ট্র বলে বিবেচিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের বিভিন্ন জেলাগুলোতে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ তাত্তি¡ক জনগোষ্ঠীগন নিজ নিজ ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশের সমতলের সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, পাবনা, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, খুলনা, মৌলভীবাজার, সিলেট সহ মোট ১৮ টি জেলায় বসবাসকারী মাহাতো নৃতাত্তি¡ক জনগোষ্ঠীর ভাষার নাম কুড়মালি।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর আরণ্যক উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ন চরিত্রে গনু মাহাতো নামে ও সমরেশ মজুমদারের আম মাহাতো উপন্যাসে আম মাহাতো নামে বিশেষ চরিত্রে মাহাতো জাতির দেখা মেলে। এদের পেশা জন্মসূত্রে কৃষি। নারী পুরুষ উভয়ই কঠোর পরিশ্রমী হয় এবং মাঠে কাজ করে। এদের গায়ের রং কালো, নাক একটু চ্যাপ্টা, নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও গহনা আছে যা তারা পরিধান করতে খুবই সাচ্ছ¡ন্দ্য বোধ করে। এরা মুলত প্রকৃতির পুজারী, প্রকৃতির সাথে এদের আত্ত¡ার সম্পর্ক। এদের প্রধান গ্রন্থ আঁইন্যাশ। এদের সমাজ ব্যবস্থা পিতৃপ্রধান, গ্রাম প্রধানকে মাহাতোয়া বলে। মাহাতোদের প্রধান উৎসব সূর্যপুজা, সহরায় (গোয়াল ও গৃহপালিত পশু পূজা) কারাম ও জিতিয়া ( প্রকৃতি পুুজা ও বন্দনা) প্রভৃতি। এদের প্রকৃতির সাথে রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক ।
কুড়মালিতে কারাম উৎসবের পূর্বে ভাইয়ের কাছে বোনের আকুতি

বেহিন : ভাঁয়ারে, ভাসালে না গেঁরিয়াই
সভেরে সাতাভেল
ডালাওয়া সাঁঙ্গা পরিগেল,

ভ্যায়া : বেহিন গে, পরে দে ভাদারা মাস
আঁওয়ে দে কারামা
কিনি দেবাও ডালওয়া
তবে পুঁজবে কারামে গোসাই।
বঙ্গানুবাদঃ
বোন : ভাই, মেঘ বইয়ে যাচ্ছে,
আমার ডালা কোথায়?

ভাই : বোনরে আসতে দে ভাদ্র মাস
আসুক কারাম
কিনে দেব ডালা
তবে করবি কারাম পুজা।

শুরু হয়েছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। কুড়মালি ভাষায় রচিত প্রথম ও একমাত্র উপন্যাস ‘কারাম’ ও রয়েছে কআথুয়েঁনঃ মাহাতো ডিকশনারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট এর তথ্য মতে বাংলাদেশে বাংলার বাইরে মোট ৪০ টি মাতৃভাষা রয়েছে। যেখানে মাহাতো জাতিগোষ্ঠীর কুড়মালি ভাষার স্থান হয়নি। যা এই জনগোষ্ঠীর জন্য খুবই হতাশা জনক।

এই ভাষার সম্ভাবনা বিপুল, রয়েছে অনেক গীত, ঝুমুর, গল্প যা কালের পরিক্রমায় চাপা পড়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এই ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ খুবই জরুরী। এই ভাষা নিয়ে গবেষণা করে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে যে যে এলাকালায় কুড়মালি ভাষী জনগোষ্ঠী রয়েছে সেখানে পাঠদানের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। অন্যথায় এই ভাষাটি গবেষণা ও পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে যাবে কালের গহীনে।

উজ্জল মাহাতো
কুড়মালি ভাষার লেখক ও গবেষক।
[email protected]

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *