হোটেল নির্মাণ বন্ধে ম্রো’দের লংমার্চ: ১০ দিনের আল্টিমেটাম

বান্দরবানের নাইতং পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের প্রতিবাদে চিম্বুক পাহাড়ে বসবাসরত ম্রো আদিবাসীরা লংমার্চ করেছে। রোববার সকাল ৯টার দিকে চিম্বুকের রামরি পাড়া থেকে লং মার্চ শুরু হয়। প্রায় ৩০ কিলোমিটার হেঁটে আসার পর বান্দরবান শহরের বোমাং রাজার মাঠে সমাবেশ করে ম্রো আদিবাসীরা।

পূর্বঘোষণা ছাড়াই রোববার এই লংমার্চের আয়োজন করে ম্রো আদিবাসীরা। ম্রো জনগোষ্ঠীর কয়েক হাজার মানুষ চিম্বুক থেকে বান্দরবান শহরে যাওয়ার পথে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বৈথানি পাড়া ছয় মাইল এলাকায় পুলিশের বাধার মুখে পড়ে তারা। তবে বাধা অতিক্রম করেই প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে শহরের বোমাং রাজার মাঠে এসে লং মার্চ শেষ হয়। লংমার্চের সময় অংশগ্রহনকারীরা ভূমি রক্ষার দাবীতে এবং পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের দাবী সংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ফেস্তুন বহন করে নিয়ে আসে। লংমার্চটি বান্দরবান শহরের বোমাং রাজার মাঠে এক সমাবেশে মিলিত হয়।

এ সময় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তৌছিফ আহমেদ বলেন, তাদের দাবি-দাওয়া থাকলে লিখিত আকারে দিতে বলা হয়েছিল। অনুমতি নিয়ে বৈধভাবে লংমার্চ করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তারা আমাদের অনুরোধ না রেখে শহরের দিকে এগিয়ে যায়। আমরা তাদের নিরাপত্তা দিয়ে শহরে নিয়ে এসেছি।

বোমাং রাজার মাঠে রুইয়াং ম্রো’র সঞ্চালনায় সমাবেশে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিংপাথ ম্রো। তিনি বলেন, নাইতং পাহাড়ে সিকদার গ্রুপের ম্যারিয়ট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টসের নামে পাঁচ তারকা হোটেল এবং বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণ হলে আমাদের আনুমানিক এক হাজার একর ভোগদখলীয় ও চাষের ভূমি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের ছয়টি পাড়া বা গ্রাম সরাসরি উচ্ছেদের মুখে পড়বে। ম্রোদের চাষের ভূমি, ফলজ বাগান, পবিত্র জায়গা, শ্মশান ঘাট ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া আমাদের সংরক্ষিত পাড়াবন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে।

লিখিত বক্তব্যে পাঁচটি দাবি উত্থাপন করেন ম্রোরা। সেগুলো হলো- চিম্বুকের নাইতং পাহাড়ে পাঁচতারকা হোটেল ও বিনোদন কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প বাতিল করা; অবৈধভাবে ভূমি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী স্থানীয় পাড়াবাসী, জনপ্রতিনিধি, ছাত্রনেতাকে হয়রানি ও হুমকি-ধামকি প্রদান বন্ধ করা; চিম্বুকের ম্রোদের বংশপরম্পরায় ভোগদখলীয় ভূমিতে কোনো ধরনের পর্যটন বা বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা; স্থানীয়দের ভূমি দখল করে নীলগিরি পর্যটনকেন্দ্র সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ না করা; যে উদ্দেশ্যেই চিম্বুক পাহাড়ের ভূমি ব্যবহার করা হোক না কেন তা স্থানীয় কারবারি (পাড়া প্রধান, হেডম্যান বা মৌজা প্রধান), জনপ্রতিনিধি ছাড়াও চিম্বুক পাহাড়ের সকল পাড়াবাসীকে অন্তর্ভুক্ত করে আলোচন করা।

সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন চিম্বুক পাহাড়ের অধিবাসী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যারয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা রেংইয়ং ম্রো। রেং ইয়ং ম্রো তাঁর বক্তব্যে বলেন, পর্যটনের জন্য যদি ভূমি নিতেই হয় তাহলে প্রথাগত নিয়ম, রীতি নীতি ও আইন মেনেই নিতে হবে। কিন্তু কেবল মাত্র হেডম্যানের মৌখিক সম্মতির মাধ্যমে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অন্য কারো কাছে সে জমি লীজ দিতে পারেন না।এই মৌখিক সুপারিশ কীভাবে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মানের লীজ হয়ে যায় আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারছি না।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে হুশিয়ারী দিয়ে তিনি আরো বলেন, আমরা শেষ বারের মত বলছি, এই চিম্বুক পাহাড়বাসী ভূমির জন্য যে আন্দোলন করে যাচ্ছে সে আন্দোলন ন্যায়ের ও ন্যায্যতার। সে আন্দোলন যে ব্যাহত না হয়। যদি দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় তাহলে ম্রো আদিবাসীদের যে বেদনা এবং ক্ষোভের যে বিষ্ফোরণ সেটা থামানো যাবেনা বলেও হুশিয়ারী দেন তিনি। আগামী ১০ দিনের মধ্যে যদি পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ বন্ধে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহন করা না হয় তাহলে চিম্বুক পাহাড়ের মানুষ থেমে থাকবে না বলেও চিম্বুক পাহাড়বাসীর পক্ষ্যে আল্টিমেটাম দেন তিনি।
এছাড়া ম্রোদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দেলনের জেলা আহ্বায়ক জুমলিয়ান আমলাই।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *