লাকিংমে চাকমা হত্যার প্রতিবেশ-রাজনীতি:পাভেল পার্থ

কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ শিলখালী গ্রামের চাকমা পাড়ার মেয়ে লাকিংমে চাকমা। ২০২০ সনের ৫ জানুয়ারি আতাউল্লাহর নেতৃত্বে ইয়াছিন, মোহাম্মদ মুসা ও আব্বুইয়া লাকিংমেকে অপহরণ করে। পরে জোর করে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করে। ধর্মান্তরের পর তার নাম রাখা হয় হালিমাতুল সাদিয়া। অপহরণের এক বছর পর ২০২০ সনের ৯ ডিসেম্বর লাকিংমের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাওয়া যায়। আতাউল্লাহ ও লাকিংমের পরিবার উভয়ে লাশের সৎকার করতে চাইলে জটিলতা তৈরি হয়। লাকিংমে অপ্রাপ্তবয়ষ্ক বলে আদালতের নির্দেশে ২০২১ সনের ৪ জানুয়ারি তার বাবা লালাঅং চাকমা ও মা কাছে তার লাশ হস্তান্তর করা হয়। অপহরণকারীদের ভয়ে গ্রামে সৎকার না করে বহুদূরে রামুতে গিয়ে লাকিংমের শেষকৃত্য করেন পরিবার। মৃত্যুর ১৩ দিন আগে ২৬ নভেম্বর ২০২০ লাকিংমে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। আতাউল্লার পরিবার মেয়েটির নাম রেখেছে আতিফা খানম। শিশুটি আতাউল্লার মা রহিমা খাতুনের কাছে আছে। পিবিআই ২০২০ সনের ৯ আগষ্ট কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, লাকিংমেকে অপহরণের অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। লাকিংমের পরিবার, মানবাধিকারকর্মী, গণমাধ্যম প্রমাণ করে লাকিংমেকে অপহরণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, ধর্ষণ এবং হত্যা করা হয়েছে। যদিও গণমাধ্যমে আতাউল্লার পরিবারের দাবি লাকিংমে স্বেচ্ছায় বিয়ে করে এবং বিষপানে আত্মহত্যা করে। ক্রমান্বয়ে লাকিংমের মৃত্যু রাষ্ট্রব্যাপি একটি প্রশ্ন তৈরি করে। চলতি আলাপখানি লাকিংমে চাকমা হত্যাকান্ডের প্রতিবেশ-রাজনীতিটা বুঝতে চায়।

লাকিংমের মৃত্যু ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ নয়

ব্যক্তি লাকিংমে, তার পরিবার, তার গ্রাম এবং তার জাতিসত্তার সাথে অন্যায় হয়েছে। কেবল লাকিংমে নয়, এমন বিচারহীন জুলুম একের পর এক ঘটছে দেশজুড়ে। লাকিংমের ওপর নিপীড়ন কোনো ‘নতুন বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা নয়। মধুপুরের গীদিতা রেমা, খাগড়াছড়ির পণেমালা ত্রিপুরা কিংবা কক্সবাজারের লাকিংমে চাকমা। আদিবাসী নারীর ওপর চলমান এই নিপীড়ন কেবলমাত্র ‘লিঙ্গীয় নিপীড়ন’ হিসেবে পাঠ করা যায় না। এর সাথে জড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক শ্রেণিপ্রশ্ন, ভূমি জবরদখলের সহিংসতা আর জাতিগত রাজনীতি। আদিবাসীঘন অঞ্চলে নয়াবসতিস্থাপনকারী বাঙালি পুরুষদের মাধ্যমে এই অন্যায় ঘটেই চলছে। কেন লাকিংমেদের চাকমা গ্রামে বহিরাগত একজন বাঙালি আতাউল্লাহ হঠাৎ করে এমন সহিংস হয়ে ওঠে? আদিবাসীদের জমি, জলাভূমি, প্রাণসম্পদ আর নারী ও শিশুরাই এই জুলুমের নিশানা। দেশজুড়েই এই জবরদস্তি চলছে। আদিবাসী এলাকার নদী, পাহাড় কী মানুষের নাম বদলে ফেলা হচ্ছে। জবরদখল হচ্ছে ভূমি ও আত্মপরিচয়। জুম-জমিন থেকে বসতভিটা। খাদ্য কী জ¦ালানি থেকে পানির উৎস। হস্তশিল্প কী মাতৃভাষা থেকে জীবনের দম। সবমিলিয়ে আদিবাসী মানুষ আজ এক চুরমার খাদের প্রান্তে দাঁড়িয়েছে। আর তাই আতাউল্লাহরা লাকিংমেদের অপহরণ, ধর্মান্তর, নামবদল, ধর্ষণ ও খুন করতে পারে।

দশ বছর আগে লাকিংমের গ্রামে

২০১০ সনে যখন দক্ষিণ শিলখালী যাই লাকিংমে তখন আতিফার মতো। প্রথম জেনেছিলাম আমি এক ‘টংচইঙ্গ্যা চাকমা’ পাড়ায় যাচ্ছি। সমুদ্র আর পাহাড়ের মাঝে খাঁজে এক জটিল বাস্তুসংস্থানের এই গ্রামে গিয়ে জানতে পারি সেটি এক চাকমা গ্রাম। কথা বলেন তঞ্চংগ্যা ভাষায়। আর মানুষের নামগুলি মারমা ও রাখাইন ভাষার। গ্রামের সবাই শিলখালী বীটের ‘ফরেস্ট ভিলেজার’। এখানেই কক্সবাজারের উচ্চতম পাহাড়। চাকমারা এর নাম দিয়েছেন তৈংগ, মানে সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়া। এছাড়া মটকা মুড়া, পাবখাইয়া মুড়া, মগেরশিয়া, মাঝেরশিয়া, পরবাসী মুড়া, মাদারবুনিয়া, পুরাশিয়া, পাকখাইন্যা মইন পাহাড় টিলা গুলো চারধারে বিস্তৃত। গ্রামের চাকমারা একসময় এসব পাহাড়ে জুমআবাদ করতো। কট্টমণি, আসে, টুই, গ্যাল্লং, রাঙা খবরক, কালাবিনি, নাইজইল্যাবিনি, লালবিনি জুমধানের আবাদ হতো। ২০১০ সনে গিলাতইলা মইন, মগেরশিয়া ও কাঠ্ঠলখাইয়া মুরে তখন কিছু জুম আবাদের ক্ষয়িষ্ণু অবশেষ দেখেছিলাম। মাদারবইন্যা ও শিলখালী ছড়া প্রাকৃতিক জলের উৎস। গ্রামের চাকমারা সমুদ্রকে বলেন ‘দইয়া’। না হলং মাত (ইলিশ মাছ) ধরার ক্ষেত্রে স্থানীয় চাকমাদের এক বিশেষ দক্ষতা আছে। পাহাড়ে জুম আবাদ আর সমুদ্রে মাছ ধরা এই ছিল দক্ষিণ শিলখালী চাকমা পাড়ার জীবিকা। কিন্তু দুম করেই চাকমাদের এই জীবন বদলে যায়।

আশেপাশের পাহাড়টিলা কী সমতলে প্রবেশ করে বহিরাগত বাঙালি ও রোহিঙ্গারা। পাহাড়ে লাকড়ি আনা থেকে শুরু করে ছড়ার পানি সংগ্রহ সবকিছুতেই চাপ পড়ে। সীমিত সম্পদ ঘিরে তৈরি হয় বিবাদ। বহিরাগত বাঙালিরা চাকমাদের জমি ও বসত জবরদখল করতে শুরু করে। বনবিভাগও মিথ্যা মামলাসহ নানা হয়রানি শুরু করে। চোখের সামনে চাকমা গ্রামগুলোতে চাকমা ও বাঙালিদের জনসংখ্যার অনুপাত হয়ে দাঁড়ায় ৪০ ও ৬০ ভাগ। চাকমা নারীরা বাজারে শস্যফসলের ন্যায্যদাম পায়না। মাছ বিক্রি করতে গেলেও তারা ঠকে।

মিয়ানমারের অনেক জাতিসত্তার সাথে চেহারাগত মিল থাকার কারণে চাকমাদের হরহামেশা বিদ্রুপ করে। রাস্তাঘাটে মেয়েদের বাজে মন্তব্য শুনতে হয়। এভাবেই এক আদি চাকমা সভ্যতা দিনে দিনে নয়াবসতিস্থাপনকারী বাঙালিদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। দক্ষিণ শিলখালী গ্রামের প্রবীণ জুমিয়া অংথাই অং চাকমার পিতা উরাহ চাকমার জমি ছিল সমুদ্রের ধারে। পরে তারা শিলখালী পাহাড়ের দিকে আসেন। বনবিভাগ থেকে ৫ কানি কৃষিজমি পান। কিন্তু এই জমি বাঙালিরা জবরদখল করেছে। শিলখালী বনবীট ও এলজিইডি অফিসের রাস্তার পাশের লম্বা সুপারি বাগানের সারি চাকমাদের করা, এটি এখন বাঙালিদের দখলে। পাহাড়, জংগল, ছড়া, জুম কী সমুদ্রে দক্ষিণ শিলখালীর চাকমাদের অধিকার সুরক্ষিত না হলে কোনোভাবেই লাকিংমে চাকমা হত্যাকান্ড থামানো সম্ভব নয়। বহিরাগতদের কাছে একটি পাহাড় বা জলধারার কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতি নেই। কোনো প্রতিবেশগত সম্পর্ক নেই। একটি পাহাড় তাদের কাছে ¯্রফে একটি জায়গা বা মাটির স্তুপ কিংবা একটি জলধারা ¯্রফে পানির আধার। আর তাই এসব একতরফাভাবে দখল করে এলোপাথারি ব্যবহার করা যায়। একসময় শিলখালী ছড়া থেকে চাকমারা পানি সংগ্রহ করতেন বহিরাগত বাঙালিরা সেটি বিনাশ করে পাথর উত্তোলন শুরু করে। এভাবেই বহিরাগতদের ভেতর এক প্রবল সহিংস মনস্তত্ব তৈরি হয়। সবকিছু দখল ও উচ্ছেদ করার মানসিকতা। এভাবেই আদিবাসী অঞ্চলে কখনো জমি, কখনো ছড়া, কখনো বন, কখনো জ্ঞান বা কখনো লাকিংমে চাকমারা অপহৃত হয়।

গীদিতা রেমা কিংবা পণেমালা ত্রিপুরা

২০০১ সনের ২০ মার্চ টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের মাগন্তিনগর গ্রামের গীদিতা রেমা খুন হয়। কী ঘটেছিল তখন? মাগন্তিনগর প্রাচীন মান্দি গ্রাম হলেও কালে কালে বহিরাগত বাঙালিদের অভিবাসন ঘটে।

নয়াবসতিস্থাপনকারী বাঙালিরা ধীরে ধীরে মাগন্তিনগরের কৃষিজমি, চালা ও বাইদ জমি, আদিবাসী বসতভিটার দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। এদেরই একজন ওঠতি বয়সের মফিজ মিয়া। মান্দি উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী পারিবারিক সম্পত্তির এক প্রধান মালিকানা পায় পরিবারের ছোট মেয়ে (নকনা)। গীদিতা রেমার ছোট বোন ন¤্রতা রেমা ছিল তাদের পরিবারের নকনা। মফিজ মিয়া ও তার দল একদিন ন¤্রতা রেমাকে অপহরণ করে। তারপর জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করে। একমাস পর ন¤্রতা মফিজ চক্রের বন্দীশালা থেকে পালিয়ে বাড়ি চলে আসে। মফিজ ও তার দল গীদিতাদের বাড়িতে এসে হামলা করে। ন¤্রতাকে না পেয়ে তার ছোট বোন ইতালিন রেমাকে তারা জোর করে তুলে নেয়। বাঁধা দেয় গীদিতা। মফিজ ও তার দল গীতিদাকে খুন করে। খাগড়াছড়ির মহালছড়ির সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নও ছিল এক আদিবাসী জনপদ। ত্রিপুরা অধ্যুষিত এই অঞ্চলেও সেটেলার বাঙালিদের অভিবাসন ঘটে। প্রাচীন বসতিগুলো আদি নাম হারিয়ে ‘সেটেলারপাড়া’ কিংবা ‘ত্রিপুরা পাড়া’ হয়ে ওঠে। ২০০৯ সনের ৩ সেপ্টেম্বর সেটেলারপাড়ার আফসার আলী, খায়রুল ইসলাম, রুস্তম আলী ও নওয়াব আলী ত্রিপুরা পাড়ার পণেমালা ত্রিপুরাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। শেরপুরের ঝিনাইগাতীর সীমান্তবর্তী হাজং গ্রামেও একইভাবে বহিরাগত বাঙালিদের অভিবাসন ঘটে। কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের জন্য একের পর এক জবরদখল হতে থাকে হাজংদের সম্পদ ও সীমানা। ভূমি ও সম্পদ দখল ঘিরে তৈরি হতে থাকে দ্বন্দ্ব ও বিবাদ। ২০১৪ সনের ২৭ জুলাই আবু সাইদ নামের এক সেটেলার বাঙালি ডেফলাই গ্রামের এক হাজং নারীকে ধর্ষণ করে।

আতিফার শিলখালী
লাকিংমের কন্যা আতিফা কোন পরিচয়ে এই রাষ্ট্রে বড় হবে জানি না। তর্কটি জটিল এবং ঐতিহাসিক। আতিফার জন্য এমন এক শিলখালী জরুরি যেখানে কেউ তার সাথে তার মায়ের মতো জুলুম করবে না। আতিফা বড় হয়ে জানুক তার মায়ের হত্যার বিচার করেছে রাষ্ট্র।

পাভেল পার্থ; লেখক ও গবেষক। [email protected]

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *