লাকিংমে’র ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবিতে চট্টগ্রামে প্রদীপ প্রজ্জ্বালন

চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের যৌথ আয়োজনে ‘লাকিংমের স্মরণে ভালোবাসার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন’ কর্মসূচি পালন করা হয়। আজ ২১ জানুয়ারী ২০২১ এ অনুষ্ঠিত উক্ত সমাবেশ থেকে অবিলম্বে লাকিংমে চাকমার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানানো হয়।

উক্ত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাশেদ হাসান।

পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা শ্রাবণ চাকমার সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান, নাট্যজন সাংবাদিক প্রদীপ দেওয়ানজী, ওয়ার্কার্স পার্টির চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহান, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক শুকলাল দাশ, ন্যাপ সাংগঠনিক সম্পাদক মিটুল দাশগুপ্ত, সাংস্কৃতিক সংগঠক সুনীল ধর, সাংবাদিক প্রীতম দাশ, সংগঠক শৈবাল পারিয়াল, সংগঠক হাবিবুল হক বিপ্লব, কাবেরী আইচ, বাংলাদেশ মাইনরিটি ওয়াচ সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েল আইচ, পাহাড়ি শ্রমিক কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জগৎ চাকমা, সহ সভাপতি ডিয়াস তঞ্চঙ্গ্যা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুখী কুমার তঞ্চঙ্গ্যা।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে রাশেদ হাসান বলেন, “যদি দেশের সংবিধান সকল জাতিগোষ্ঠীর অধিকার স্বীকার করে তাহলে কেন কিছুদিন পরপর অধিকারের দাবিতে আদিবাসীদের পথে নামতে হয়? সবার রক্তে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী লাকিংমেকে অপহরণ করা হয়। কখনোই তা আইনসম্মত নয়। এটি দীর্ঘ চক্রান্ত, নারীর প্রতি অবিচার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারলে আরো অন্যায় হবে। লাকিংমে চাকমার ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবি করছি।

ডা মাহফুজুর রহমান বলেন, আমাদের প্রতি অবিচার হবে আর প্রশাসন এসে তার প্রতিকার করবে এ ব্যবস্থা পাল্টাতে হবে। নতুন প্রজন্মের উচিত এজন্য সংগ্রাম করা। যাতে প্রতিকারের জন্য কারো দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়।

শরীফ চৌহান বলেন, আমরা লাকিংমে হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। দোষীদের গ্রেপ্তার করা হোক। লাকিংমের জন্য আমাদের ভালোবাসা অব্যাহত থাকবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী লাকিংমেকে জোরপূর্বক ধর্মান্তর করা হয় যা ধর্ষণেরেই নামান্তর। তাই নিয়মিত মামলা করে অনতিবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা লাকিংমের পরিবারের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ বলেন, লাকিংমে চাকমাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছে। তার পরিবার এর ন্যায্য বিচার পায়নি। লাকিংমে কোনো একক ঘটনা নয়। পাহাড়ে ও সমতলে এরকম অনেক ঘটনা ঘটছে। জিয়াউর রহমান শান্ত পাহাড়ে অশান্তির আগুন জ্বেলে দিয়েছে। সেই দাবানল আজো জ্বলছে। সরকার মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে নানা চেষ্টা করলেও দুষ্টচক্র সক্রিয়। লাকিংমের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার চাই।

ন্যাপ নেতা মিটুল দাশগুপ্ত বলেন, নারীদের সর্বোচ্চ ত্যাগে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। সংবিধান প্রণয়ন হয়েছিল ১৯৭২ সালে তাতে সব ধর্ম ও জাতিসত্তার মানুষের অধিকারের কথা বলা হলেও আদিবাসীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। লাকিংমেকে হত্যার বিচার দাবি করছি।

সুনীল ধর বলেন, নারী নিপীড়ন বিরোধী লংমার্চ হয়েছিল। এরপরও নারী নির্যাতন থামেনি। যেসব ঘটনা সামনে আসছে সেগুলো নিয়ে মাঠে নামছি, প্রতিবাদ করছি। কিন্তু কত ঘটনা অন্তরালে থেকে যাচ্ছে। বৈষম্যহীন সাম্প্রদায়িকতামুক্ত দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। লাকিংমে হত্যার বিচার চাই।

সাংবাদিক প্রীতম দাশ বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণ হত্যার বিচার এখন হয় না। লাকিংমে মারা গেছে আজ কতদিন? কিন্তু কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। শুধু লাকিংমে নয় সকল ধর্ষণের, হত্যারর বিচার চাই। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ন্যায় কিচারের দাবিতে আন্দোলন করার মত লজ্জার কিছু নেই। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য সবাই জীবন দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু আজও তা হলো না।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালী গ্রামের চাকমা পাড়ার লালা অং চাকমার মেয়ে লাকিংমে চাকমা (১৫)।

গত বছরের ৫ জানুয়ারি লাকিংমেকে বাহারছড়া ইউনিয়নের মাথাভাঙ্গার আতাউল্লাহসহ চার-পাঁচ জন যুবক অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। এরপর তার বাবা টেকনাফ থানায় অপহরণের মামলা করার চেষ্টা করলেও থানা মামলা না নিয়ে তাদের আদালতে পাঠায়। ২৭শে জানুয়ারি লাকিংমের বাবা নিজে বাদী হয়ে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে আদেশ দিয়েছিল।

মামলায় লালা অং চাকমা অভিযোগ করেন তার মেয়ে বয়সে শিশু। ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া জন্মসনদ অনুযায়ী তার মেয়ের বয়স ১৪ বছর ১০ মাস। জন্ম সনদে লাকিংমের জন্ম ২০০৫ সালের ২রা মার্চ। আতাউল্লাহরা তাকে অপহরণ করেছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

এর প্রায় এক বছর পর গত ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় লাকিংমে চাকমাকে কয়েকজন যুবক কক্সবাজার সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। সেদিন হাসপাতালে নেয়ার আগেই লাকিংমের মৃত্যু হয়েছিল বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন। লাকিংমের মৃত্যুর বিষয়টি হাসপাতালে কর্মরত পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ লাকিংমের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ১০ ডিসেম্বর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়।

মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর পেয়ে লাকিংমের বাবা লালা অংও হাসপাতালে এসে সন্তানের মরদেহ পাওয়ার আবেদন করেন। এরপর আইনি জটিলতা শুরু হওয়ায় লাকিংমের মরদেহ কাউকে দেওয়া হয়নি। গত ১৫ ডিসেম্বর লালা অং চাকমা মরদেহ পেতে টেকনাফ বিচারিক হাকিম আদালতে আবেদন করেন। আদালত শুনানি করে আবেদনটি গ্রহণ করে লাকিংমের ধর্ম পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে র‌্যাবকে দায়িত্ব দেয়। এরপর র‌্যাব তদন্তের দায়িত্ব পায়। তদন্তে লাকিংমে চাকমার বয়স নাবালিকা অর্থাৎ প্রচলিত আইনে বিয়ের উপযুক্ত হয়নি বলে সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই তার যদি বিয়ে হয়েও থাকে তা আইনগতভাবে অবৈধ। তদন্তে এসব প্রমাণ হওয়ায় ৪ জানুয়ারি তার মরদেহ বাবা-মার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরমধ্যে পেরিয়ে গেছে ২৬ দিন। ততদিন মর্গেই ছিল লাকিংমের মরদেহ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *