বাজুনি ব্রিং : পাভেল পার্থ

২০০৪ সনের তেসরা জানুয়ারি। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনে ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনের এক মিছিলে গুলি করে বনবিভাগ ও পুলিশ। শহীদ হন পীরেন স্নাল। এক এক করে সতের বছর। উৎস নকরেক ও রাত্রি নকরেক পিতৃহত্যার বিচার পায়নি। আজ এই করোনা মহামারীকালে পীরেনের কত স্মৃতি বিস্মৃতি যেন এক একটা ঝরা শালপাতা হয়ে ওঠে। দু:সহ এই মহামারীতে মনে হয় হয়তো পীরেন হত্যার বিচার পাবো না। পীরেন যে মিছিলে শহীদ হয়, সেই মিছিলেই শিশু উৎপলের মেরুদন্ড ঝাঁঝরা হয়ে যায়। ভাবি উৎপল হয়তো কোনোদিন তার কৈশোর হারানোর বিচার পাবে না। জানি করোনাকাল কাটবে, আবার জাগবে দুনিয়া। কিন্তু বিচার না হোক, এমন নিদারুণ ঘটনার কী কোনো তদন্ত হবে না? মহামারীর আগে কী মহামারীর পরে। বিচার নয়, পীরেন হত্যার কেবল একটা পাবলিক তদন্ত প্রতিবেদনের দাবি জানিয়ে আজকের এই স্মৃতিকথা। লেখাটির শিরোনাম পীরেন স্নালের মাতৃভাষায়। বাজুনি ব্রিং মানে বন্ধুর বন।

২০০৩। আমি তখন মধুপুর গড়ের নানা গ্রামে ঘুরে বেড়াই। মধুপুরের একটা প্রতিবেশগত এথনোগ্রাফি তৈরি করছি। তখন সবেমাত্র মধুপুর ইকোপাকী বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধছে। ২০০৪ সনে বারসিক থেকে আমার ‘মধুপুরের প্রাণবৈচিত্র্য’ নামে বইটি প্রকাশিত হয়। মধুপুরে বনবিভাগের প্রায় সব বীট ও রেঞ্জ অফিসে বইটি দেয়া হয়েছিল। জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ বইটি গ্রামে গ্রামে বিক্রি করেছিলেন। বনবিভাগ বইটি ছুঁড়ে ফেলতে পারেনি। কারণ সেখানে মধুপুর শালবনের প্রাণবৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানের এক বৈজ্ঞানিক বিবরণ ছিল। আর এই বিজ্ঞান প্রমাণ করেছিলেন মধুপুরের মান্দি ও কোচ আদিবাসীরা। তো এই অরণ্যবিজ্ঞানের অনুসন্ধানসূত্রেই পীরেনের পরিবারের সাথে আমার সাক্ষাত। মান্যবর শিক্ষক জেরোম হাগিদকসহ একদিন কাঁকড়াগুনি ও ক্যাজাই গ্রাম হয়ে জয়নাগাছা ফিরেছি। একটা বাড়িতে দুপুরের খাবার আয়োজন হয়েছে। সেখানেই পরিচয় সাইলো স্নাল ও নেজেন নকরেকের সঙ্গে। তিনদিন পর সাইলো স্নালের সাথে জালাবাদার জংগলে বনআলু তুলতে যাই। ঐদিন বিকেলে বা তারপরদিন তাদের পুত্র পীরেনের সাথে পরিচয় হয়। পীরেন আমাকে লহরিয়া বনের সবটা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। খুব বেশি হলে দুই দিন তাদের বাড়িতে ভাত খেয়েছি। পীরেনের স্ত্রী সীতা নকরেক রান্না করেছিলেন। পীরেনের সাথে আমার আর তেমন সখ্যতা গড়ে ওঠেনি। পীরেনের মৃত্যু আমায় একটা দারুণ ঘোরের ভেতর আটকে দিয়েছিল। অরণ্য বাঁচাতে আমার সময়ে কেউ জান দিয়েছে আর তার কোনো বিচার নেই আমি একদম চুরমার হয়ে গেছিলাম। চিপকো আন্দোলনের অমৃতা দেবী কিংবা উলগুলানের বিরসা মুন্ডার কাহিনি জানি। নেত্রকোণার মেনকীফান্দার অজিত রিছিল বা মৌলভীবাজারের জুরীর অবিনাশ মুড়ার বন বাঁচানোর লড়াই কাছ থেকে দেখেছি। কিন্তু জংগল বাঁচাতে আমাদেরকালে কেউ জানবাজি রাখতে পারে, পীরেনের আগে এমন সামনাসামনি কাউকে দেখিনি।

বনবিভাগ ‘জাতীয় উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে এক একতরফা প্রকল্প ঘোষণা করেছে। বনের ৩০০০ একর কোর এলাকাকে ইটের দেয়াল দিয়ে আটকে ফেলে বনের ভেতর পর্যটকদের জন্য টাওয়ার, রিসোর্ট, রাস্তা বানানোর প্রকল্প। কীভাবে যেন এই প্রকল্প ‘ইকোপার্ক’ নাম পায়। আর মধুপুরের আদিবাসীরা অরণ্য ও অস্তিত্ব রক্ষার ‘ইকোপার্কবিরোধী আন্দোলন’ শুরু করে। তখনো পর্যন্ত আমিই ছিলাম একমাত্র বাঙালি। সময়টি আমার জন্য খুব সহজ ছিল না। যদিও ২০০৩ এর আগ থেকেই আমি মধুপুর নিয়ে লিখতে শুরু করি। জলছত্র-পঁচিশ মাইল নেমে অজয় এ মৃ, প্রবীণ স্টীফেন চিসিম, বেনেডিক্ট মাংসাংদের সাথে নানা আলাপ সেরে নিতাম। অজয় দা তখন একটা ছোট্ট ডাকঘরে চাকুরী করেতেন আর পঁচিশমাইল বাজারে ছিল তার একটা ছোট্ট বইয়ের দোকান। একটা বনেদী মেজাজ থাকলেও বেনেডিক্ট মাংসাং আমায় খুব স্নেহ করতেন, আমার সাথে কথা বলার জন্য অপক্ষো করতেন। দোখোলা বাজারে একটা সিঙারা-পুরীর দোকানে প্রথম পরিচয় হয় টেলকীর ইউজিন নকরেকের সাথে। কুয়াশা পিছল পথে সাধুপাড়া আলবার্ট মানখিনের বাড়িতে যেদিন প্রথম যাই আমার কেমন বিভ্রম হয়েছিল। ইকোপার্ক আন্দোলন নিয়ে আলবার্টদার দিকনির্দেশনা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। ফাদার ইউজিন হোমরিক, চুনিয়ার উইলিয়াম দাজেল, সুলেখা ম্রং, ইউপি চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী কতজনের সাথে কত আলাপ। দেখেছি ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনের ভেতরে নানা বিভাজন তৈরির সর্বোচ্চ অপচেষ্টা চালিয়েছিল তখন বনবিভাগ। পারেনি।

৪ জানুয়ারি ২০০৪। দিনভর এক উত্তাল, গুমোট মধুপুর। আমরা জলছত্রে জয়েনশাহীর অফিসে জড়ো হতাম। ইত্তেফাকের জয়নাল আবেদীন আর প্রথম আলোর কামনাশীষ শেখর মধুপুর নিয়ে লেখালেখি করতেন। পীরেনের মৃত্যুর পরদিন থেকে মধুপুর নিয়ে গণমাধ্যম কিছু সরব হয়। দৈনিক সংবাদের উপসম্পাদকীয় পাতায় তখন ছাপা হয় আমার ‘মধুপুর গড়ের মাটির রঙ কেন লাল?’ ঢাকার অনেক সাংবাদিক বিশেষ প্রতিবেদন করেন। জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্টজনেরা মধুপুর আসেন। পীরেনের প্রথম মৃত্যুবাষির্কীর আগের রাতটি আমার জন্য আরেক স্মরণীয় রাত। গারো স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (গাসু), বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস) এর তরুণ নেতাদের সাথে পঁচিশমাইলে পোস্টার লিখতে লিখতে রাত হয়ে যায়। মনে আছে গভীর রাতে জংগলের ভেতর দিয়ে হেঁটে বিদ্যুৎ মাংসাং, সঞ্জয় চাম্বুগংদের সাথে জনা দশেক আমরা পোস্টার, ব্যানার নিয়ে পৌঁছেছিলাম সাধুপাড়া গ্রামে। পীরেন যেখানে শহীদ হন জালাবাদা-রাজঘাট সেখানে তার স্মরণে মান্দি ঐতিহ্য অনুযায়ী একটি খিমা (মৃতের স্মরণে স্মারক) বানানো হয়। মনে আছে সেই খিমার মাথার পাগড়িতে পরানোর জন্য চুনিয়া থেকে জনিক আচ্চু (দাদু) পাঠিয়েছিলেন উজ্জ্বল কালো রঙের দুমি (পালক)।

পীরেন স্নালের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে সংহতি জানাতে আদিবাসীদের বাইরে প্রথম ঢাকা থেকে হিলাল ফয়েজী, খন্দকার মুনীরুজ্জামানসহ অনেকেই এসেছিলেন। ‘অঙ্গীকার বাংলাদেশের’ ব্যানারে তারা ‘বৃক্ষ কান্দে তোমার লাগি বীর পীরেন স্নাল’ নামে একটি মানববন্ধন করেন বনের ভেতর। শ্রীমঙ্গল থেকে আমার বাবা অধ্যাপক প্রীতি রঞ্জন দাশও সংহতি জানাতে এসেছিলেন। জয়নাগাছা স্কুলমাঠে বাবা সারাটাসময় পীরেনের বাবা নেজেন নকরকের সাথে গল্প করেছিলেন। উৎস বসে ছিল বাবার কোলে। সেদিন দুই বাবার ভেতর কী গল্প হয়েছিল এখনো জানা হয়নি আমার। মধুপুর ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনের এমন কত জানা-অজানা গল্প আছে। এই দীর্ঘ গল্পের খুব কমই জানা আছে আমার। কিন্তু এরপর থেকে আমি মধুপুর নিয়ে রাষ্ট্র বিশেষত বনবিভাগের যেকোনো তৎপরতা বা উন্নয়নপ্রকল্প নিয়ে মধুপুরবাসীর আয়নায় ধারাবাহিক লেখালেখি করবার চেষ্টা করেছি। মধুপুর নিয়ে রাষ্ট্রের কাছে বারবার বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসা রেখেছি। এক এক করে কত মানুষ যুক্ত হয়েছে মধুপুরে। পীরেনের আওয়াজে। নারায়নগঞ্জ থেকে আমাদের সমগীতের বন্ধুরা ‘বলসালব্রিং পালা’ নাটক নিয়ে মধুপুর বনে এসেছে। কেউ তুলেছে ছবি, কেউ প্রামাণ্যচিত্র আর একের পর এক গবেষণা। চলতি লেখাটি সবার নাম এখানে উল্লেখ করছে না, স্মরণ করছে বন্ধুদের অবিস্মরণীয় সংহতিযাত্রা। গণমাধ্যমে একটা দীর্ঘ সময় পীরেনের নাম ভুল ছাপা হতো। পত্রিকা লিখতো ‘পীরেন স্লান’। এখন গণমাধ্যম পীরেনের নামটি সঠিক ছাপতে পারছে, এই সংবেদনশীলতাও তৈরি করেছে ইকোপার্কবিরোধী আন্দোলন।

আজ পীরেন স্নালের মৃত্যুর সতের বছর পর, এই নির্দয় মহামারিকালে কত স্মৃতি মনে আসে। পীরেন হত্যার দুই বছর পর টাঙ্গাইল বনবিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বনকর্মকর্তা জনাব আবু হানিফ পাটোয়ারী দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় ২২/১০/২০০৬ তারিখে মধুপুর জাতীয় উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরের জন্য আরেকটি নতুন দরপত্র আহবান করেছিলেন। নতুন দরপত্রে প্রস্তাবিত ৬২,০০০ রানিং ফুট দেয়ালের ভেতর ১৪,০০০ রানিং ফুট দেয়াল নির্মাণের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বাইদ জমিতে মাটি ভরাটকরন, জংগলের ভেতর মোট ১০,২০০ রানিং ফুট আট ইঞ্চি প্রশস্ত পাকা হেরিং বোন বন্ড রাস্তা নির্মাণ, কালভার্ট নির্মাণের কথা ছিল। অথচ পীরেন হত্যার এক বছর আগে ২০০৩ সালের ৭ জুন দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় বনবিভাগ মধুপুর জাতীয় উদ্যান বিষয়ে তাদের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। সেখানে বনবিভাগ জানিয়েছিল স্থানীয় আদিবাসীদের মতামত ছাড়া কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হবে না। বনবিভাগ তার কথা রাখেনি। জোর করে মধুপুর শালবনকে তথাকথিত ‘ইকোপার্কের’ নামে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল। বনবিভাগের কাছে মধুপুর এখনো একটি ‘সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যান’। কিন্তু এই বনের মান্দিদের কাছে মধুপুর হলো ‘হা.বিমা’ মানে ‘মাতৃগর্ভভূমি’। বন আইন অনুযায়ী একটি ঘোষণা দিয়েই বনকে ‘সংরক্ষিত’ বা ‘অসংরক্ষিত’ করা যায়। কিন্তু ‘মাতৃগর্ভভূমি’ কোনো ঘোষণার বিষয় তো নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের বংশপরম্পরার ইতিহাস আর অস্তিত্বের আখ্যান। পীরেন স্নাল হয়তো বিরসা মুন্ডা, অমৃতা দেবী, রাশিমনি হাজং, অবিনাশ মুড়া বা অজিত রিছিলের মতো কোনো বিপ্লবী ছিল না। পীরেন ছিল একজন কলাবাগানের নিতান্ত দিনমজুর। কিন্তু তার কাছে মধুপুর স্রেফ কোনো এক টুকরো জংগল ছিল না। ছিল ‘মাতৃগর্ভভূমি’। আর এই অরণ্যভূমির সম্মান ও অস্তিত্বের সুরক্ষায় সবার সাথে সেও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। সেদিন পুলিশ ও বনবিভাগের গুলিতে হয়তো পীরেন বা উৎপল নয়, ঝাঁঝরা হতো পারতো যেকোনো জীবন। সকলেই যে জীবন বাজি রেখেছিল। পীরেনের মৃত্যু প্রমাণ করেছে অরণ্য সত্য, প্রকৃতি অসীম। কিন্তু টাঙ্গাইল বনবিভাগ এখনো এই বিজ্ঞানভাষ্য বুঝলো না, বোঝার জন্য তৎপরতাও দেখালো না। সতের বছর হয়ে গেল পীরেন হত্যার কোনো বিচার হলো না। তবে টাঙ্গাইল বনবিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বনকর্মকর্তা জনাব আবু হানিফ পাটোয়ারীর দুর্নীতির জন্য জেল-জরিমানা হয়। বিচার না হোক, পীরেন হত্যার একটা নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিদেন প্রকাশ করবার জন্য রাষ্ট্র কী আবার তৎপর হতে পারে?

গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ। ই-মেইল: [email protected]

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *