সরকারের কাছে পার্বত্য চুক্তি নিয়ে কোনো রূপরেখা নেই: আদিবাসী যুব ফোরামের আলোচনায় বক্তারা

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৩তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আয়োজনে একটি অনলাইন আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল (৯ ডিসেম্বর) রাত ৮.০০ ঘটিকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তারুণ্যের ভাবনা বিষয়ক উক্ত আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির আহ্বায়ক অনন্ত বিকাশ ধামাই। বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সদস্য সচিব আন্তনী রেমার সঞ্চালনায় উক্ত আলোচনায় সংযুক্ত ছিলেন চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের স্টাফ রিপোর্টার শামীমা সুলতানা, সমকালের রিপোর্টার জাহিদুর রহমান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ জাহিদ হাসান, সংবাদ কর্মী সিয়াম সারোয়ার জামিল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন প্রিন্স, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের দপ্তর সম্পাদক সুবাস চন্দ্র হেমব্রম, কেন্দ্রীয় ছাত্র মৈত্রী’র সহ-সভাপতি অতুলান দাস, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আহ্বায়ক সদস্য চন্দ্রা ত্রিপুরা।

অনলাইন আলোচনা সভাটি আইপিনিউজের ফেসবুক পেইজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে চন্দ্রা ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ের একজন সাধারণ যুব হিসাবেও যদি চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে মন্তব্য করতে চাই তাহলে আমি কেবল অন্ধকারই দেখি। চুক্তি যখন সম্পাদিত হয় তখন জন্ম নেয়া শিশুটি এখন ২৩ বছরের তরুণ যুবা। সেই যুবকও এখন বুঝে আসলে পাহাড়ে এই ২৩ টি বছরের কী পরিবর্তন হয়েছে। তারা (সরকার) যদিও এর নাম দিয়েছে উন্নয়ন, আসলে উন্নয়ন জিনিসটা তো কেবল বাহ্যিক আবরণ দেখলে হয় না। ভেতরের জিনিসটাই দেখা জরুরী বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, পাহাড়ের একজন সাধারণ জুম্মও বলবে যে পাহাড়ে পার্বত্য চুক্তির কী অবস্থা। সরকার যদিও বলছে ৪৮ টি ধারা পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে কিন্তু আমরা সাধারণ পাহাড়ীরা আসলে বুঝি চুক্তি বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে। চুক্তি মোতাবেক আঞ্চলিক পরিষদকে যে ক্ষমতা দেওয়ার কথা সেটা দেওয়া হয়নি বলেও দাবী করেন তিনি।

সাজেকে শত শত আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে দাবী করে তিনি আরো বলেন, কেবল পাহাড় নয়, সারা বিশ্বের আদিবাসীদের টিকে থাকার মূল বিষয়টাই হলো ভূমি। কাজেই পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক যদি ভূমি সমস্যাটার সমাধান করা না যায় তাহলে চিম্বুকে যে ভূমি লিজ নিয়ে ম্রো আদিবাসী উচ্ছেদের পরিকল্পনা তো হবেই। কাজেই পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরী বলেও দাবী করেন এই যুব নারী নেত্রী।

অতুলান দাস বলেন, চুক্তির এত বছর পরও আমাদেরকে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে এটাই দুর্ভাগ্যজনক। মহান মুক্তিযুদ্ধে কেবল বাঙালিরা নয়, অনেক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারাও জীবন দিয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় তারা অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও আদিবাসীদের যে ত্যাগ সেটার যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারার বিষয়টি জাতি হিসাবে লজ্জ্বার বিষয় বলেও দাবী করেন তিনি।

পাহাড়ে কেবল কিছৃ রাস্তাঘাট এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে এই চুক্তি বাস্তবায়নকে দেখা হলে ভুল হবে দাবী করে তিনি আরো বলেন, পাহাড়কে যতদিন নিরাপত্তা বাহিনী ও আমলা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করানো হবে ততদিন এই চুক্তি বাস্তবায়ন হবে না। আঞ্চলিক পরিষদকে কার্যকর করা না গেলে কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু ক্যাম্প সরিয়ে এবং কিছু রাস্তাঘাট বানিয়ে এই চুক্তি বাস্তবায়ন পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিলে চুক্তি বাস্তবায়ন পূর্ণাঙ্গ হবেনা বলেও দাবী করেনা তিনি।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের দপ্তর সম্পাদক সুভাস চন্দ্র হেমব্রম বলেন, বর্তমানে যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে সে সরকারই এই চুক্তি সম্পাদন করেছে। কিন্তু এই সরকার ক্ষতায় থাকা অবস্থায় সেটি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে চিম্বুকে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের জন্য জমি লিজ দেয়া হতো না। আদিবাসীদের উপর নির্যাতন ও নিপীড়ন ধীরে ধীরে বাড়ছে বলেও মনে করেন তিনি। চুক্তি অনুযায়ী যে শান্তি ফিরে আসার কথা ছিল সেটি এখন অধরায় থেকে গেছে বলেও মনে করেন এই আদিবাসী যুব নেতা। পার্বত্য ভূমি সমস্যার দ্রুত সমাধানও চান তিনি।

তরুণ সংবাদ কর্মী সিয়াম সারোয়ার জামিল নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, চুক্তির যে নামকরণ করা হয়েছে সেই শান্তির কোথাও পাওয়া যায় নি। যারা এই চুক্তির আগে ‘শান্তি’ শব্দটি যুক্ত করেছে তাদের কাছেও এর উত্তর নেই বলেও মনে করেন তিনি।

সংবাদ মাধ্যমগুলো থেকে পাহাড়ের ইস্যুগুলো নাই করে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা চলছে দাবী করে তিনি আরো বলেন, কিছু ‘সেনসিটিভ’ বিষয়ে আমরা লিখতে পারিনা এবং প্রকাশ করতে পারিনা। সংবাদগুলোও অনেক সময় হারিয়ে যায়। উর্দ্ধতন মহলও আমাদেরকে নানাভাবে নির্দেশনা দেয়। এই লিখতে না পারা বা নিউজ হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কোনো একটা জায়গায় অনিয়ম ।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন প্রিন্স বলেন, চুক্তি অনুযায়ী যে তিন জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে সেই তিন জেলা পরিষদে এখনো কোনো নির্বাচন হয় নি। এখনো আঞ্চলিক পরিষদ এবং ভূমি কমিশনের কোনো বিধিমালা নেই। পার্বত্য চুক্তির ৪৮ টি ধারা বাস্তবায়ন হওয়ার কথা বলা হলেও পাহাড়ের মানুষের যে মৌল কাঠামো ‘ভূমি’ সে বিষয়টি এখনো সমাধান হয়নি। আমরা কেবল মাত্র চিম্বুক ও সাজেক নিয়ে এখন কথা বলছি। কিন্তু এগুলো বাদেও বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা ভূমি দখল ও নিপীড়নের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে যেখানে রাষ্ট্রের নির্লজ্জ্ব পৃষ্ঠপোষকতা আছে বলে মনে করেন এই ছাত্রনেতা। পাহাড়কে কড়া নজরদারীর মধ্যে রেখে এক ধরণের ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ হিসেবেও পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও দাবী করেন তিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের স্টাফ রিপোর্টার শামীমা সুলতানা বলেন, আমাদের মধ্যে এক ধরণের বৈষম্য যে বিদ্যমান সেটা স্পষ্ট। বাংলাদেশ এখন মধ্যবয়সী হয়েও এখনো আদিবাসীদেরকে স্বীকৃতি দেয় নাই। এখনো এই মৌলিক জায়গায় আমরা সুরাহা করতে পারিনি। যার জন্য সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও কোনো পরিবর্তন নেই। যার জন্য এখনো দমন পীড়ন অব্যাহত রয়েছে এবং চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয় নাই।

তিনি আরো বলেন, পাহাড়ের ভূমি সমস্যাটি এখনো সমাধান হয় নাই। আমি যখন সরেজমিন রির্পোর্টের জন্য গিয়েছিলাম তখন দেখেছি দুর্গম অঞ্চলে কোনো স্কুল নেই। কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। কিন্তু এখন ইতিবাচক পরিবর্তন বলতে এই জায়গাগুলোতে কিছু পরিবর্তন হলেও আশানুরূপ পরিবর্তন হয় নি।

সমকালের সাংবাদিক জাহিদুর রহমান বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টিকে গাণিতিক অবস্থানে না দেখে গুনগত পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে সেটাই বিবেচ্য বিষয় । পাহাড়ের প্রাণ প্রকৃতি লোভের কারণে ধ্বংস করা হচ্ছে বলেও দাবী করেন তিনি। পাহাড়ের আনাছে কানাছে ইটভাটা তৈরী হয়েছে এবং পাহাড়ের কান্না আমি নিজ চোখে দেখে এসেছি। পাহাড়ের কান্না যারা বোঝে তাদের দখলে পাহাড় নেই বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি পাহাড়ীরা রান্নার কাজে যে কাঠ ব্যবহার করে সেটা কিন্তু শুকনা কাঠ এবং পাহাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শুকনা বাঁশ দিয়ে রান্না করে। গাছ কেটে, বন উজার করে তারা এটি করে না। পাহাড়ে যে উন্নয়ন চলছে সেটা অপরিকল্পিত বলেও মনে করেন তিনি।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ জাহিদ হাসান বলেন. বিগত ১০ টি বছর ধরে আমি এ চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে ফলো করছি। জনসংহতি সমিতি প্রতিবছর চমৎকার একটা রিপোর্ট বের করে যেটাতে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হয়। সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়। কিন্তু মূল বিষয়গুলো ‘এড্রেস’ করা হয় না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই চুক্তি বিষয়ে একটা প্রত্যাশা ছিল কিন্তু সেই প্রত্যাশার জায়গাটা অপূর্ণই রয়ে গেল।

তিনি আরো বলেন, চুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ে উন্নয়নের সমস্ত কিছুই আঞ্চলিক পরিষদের সমন্বয় করার কথা ছিল। কিন্তু আসলে তা হচ্ছে না। পাহাড়ে যে শিশুটি পঞ্চম শ্রেণী থেকে ঝরে পড়ছে তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী করা হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামকে এখনো শাস্তিমূলক জায়গা হিসেবে দেখা হয় যা পাহাড়ের আদিবাসীদেরকেই অবমূল্যায়ন করা হয় বলেও মনে করেন তিনি। পাহাড়ে এতই যদি উন্নয়ন হয় তাহলে বছরের একটা বিশেষ সময়ে কেন খাদ্য সংকট দেখা দেয় বলেও প্রশ্ন তুলেন এই উন্নয়ন কর্মী। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবী অব্যাহত রাখতে হবে বলেও দাবী করেন তিনি।

আলোচনায় সভাপতি ও আদিবাসী যুব ফোরামের আহ্বায়ক অনন্ত বিকাশ ধামাই সমাপনী বক্তব্যে বলেন, পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো অবাস্তবায়িত রেখে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। যে সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সেই সরকারই বিগত ১২ টি বছর ধরে এক নাগাড়ে ক্ষমতায়। কিন্তু সেই চুক্তি এখনো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে যেহেতু যথেষ্ট প্রশ্ন তুলবার জায়গা রয়েছে সেহেতু আমাদের মত যুবদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে এই চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানাতে পারি। অনতিবিলম্বে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নেরও জোর দাবী জানান এই আদিবাসী যুব নেতা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *