আমি আমার কষ্টের স্বীকৃতি পেয়েছি: বেগম রোকেয়া পদক পেয়ে বললেন মঞ্জুলিকা চাকমা

বিশেষ প্রতিবেদক: পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে প্রথম সফল নারী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা মঞ্জুলিকা চাকমা আজ ‘বেগম রোকেয়া পদক-২০২০’ এ ভুষিত হয়েছেন। আজ বুধবার ১০ টায় ঢাকার বাংলাদেশ শিশু একাডেমী মিলনায়তনে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় তাঁকে এই সম্মাননা পদক প্রদান করে।

উক্ত পদক প্রদানের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইন মাধ্যমে সংযুক্ত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।এসময় সম্মাননা পদক প্রাপ্তদের পদক, সনদ ও চেক প্রদান করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এমপি।

পদক প্রাপ্তির পর একান্ত মুঠোআলাপে মঞ্জুলিকা চাকমা আইপিনিউজকে তাঁর অনুভুতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি আমার জীবনে কৃতকর্ম এবং কষ্টের স্বীকৃতি পেয়েছি। জীবনে বহু পদক পেয়েছি। কিন্তু এই রাষ্ট্রীয় পদক পেয়ে আমি অভিভুত।’

তিনি আরো বলেন, অন্যান্য যে পদকগুলো আমি পেয়েছি সেগুলো না হয় পাহাড় কেন্দ্রিক আবার কিছু কিছু পাহাড়ের আদিবাসী সমাজ, সংস্কৃতি ও নারীদের নানাবিদ বিষয়ে অবদানের জন্য। কিন্তু আজকে যে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পদক পেলাম সে অনুষ্ঠানের মুল থিম ছিল ‘নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য সম্মাননা পদক’। কাজেই এই পদক কোনো পাহাড়ী নারী, বাঙালি নারী কিংবা নৃগোষ্ঠী নারীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদানের জন্য নয়, এটা গোটা নারীর আর্থ সামাজিক উন্নয়নে অবদানের জন্য। যেটার জন্য আমি আবেগে আপ্লুত হয়েছি এবং চোখ দিয়ে জলও গড়িয়ে পড়েছিল।

আইপিনিউজ এর সাথে একান্ত আলাপে তিনি তাঁর অতীত স্মৃতিকে স্মরণ করে আরো বলেন, আমাদের সময়কালীন পাহাড়ের নারীরা যে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করবে তা কল্পনাও করা যেত না।এমনকি সেসময় ছোটখাট কোনো ‘পানের দোকান’ দিয়ে উপার্জন করবে সে ভাবনা খোদ পুরুষদেরও ছিল না। আর চাকুরীর কর্মস্থল যদি নিজ জেলার বাইরে একটু দূরবর্তী অবস্থানে পড়ে যায় তাহলে সে চাকুরী তারা ছেড়েই দিত। সে অবস্থান থেকে আমি নিজে চাকুরী ছেড়ে এমন ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করাটা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জিং। কাজেই এই চ্যালেঞ্জিং পেশায় সফল হয়ে এমন রাষ্ট্রীয় পদক অর্জন করাটা একেবারেই কল্পনার বাইরে।

বর্তমানে পাহাড় তথা সমতলের তরুণ আদিবাসী উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম ও নিরন্তর উৎসাহ দেখে তার ভালো লাগার কথা ব্যক্ত করে তিনি আরো বলেন, আমার কাছে ‘নেতিবাচকতা’ ও ‘সমালোচনা’ এই দুটি জিনিস খুব অপছন্দের। কাজেই আমি চাই ইতিবাচকভাবে সকল তরুণ উদ্যোক্তারা নিজেদের কাজগুলো চালিয়ে যাক। সফলতা আপনি আপনিই ধরা দেবে।

তরুণ প্রজন্মের আদিবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার মেসেজ কী হবে ?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথমত হতাশ হওয়া যাবে না। আর রাতারাতিও সফলতা আশা করা যাবে না। অনেক চ্যালেঞ্জকে মাথায় নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হবে নিরন্তর।করোনাকালীন এই দু:সময়েও ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। তারপরও এমন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করেই সামনে এগোতে হবে বলে অভিমত জানান সফল এই আদিবাসী নারী।

শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে উদ্যোক্তা হয়ে সফল হওয়া এই নারী আরো বলেন, আমার জীবনে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল।আমি নাটক করতাম। নানা সাংস্কৃতিক দল ও ক্রিড়াঙ্গনে পদচারণা ছিল এবং ভালো ছাত্রীও ছিলাম। সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় দশম শ্রেণীতে থাকা কালীন আমার বিয়ে হয়। এর পর মেট্রিকুলেশন পাশ করা সাথে সন্তান জন্মদান, লালন-পালন,ইন্টারমেডিয়েট এবং বিএ পাশ করা সবক্ষেত্রে নানা বাধা ছিল। খোদ আমার স্বামীই আমাকে বিএ পরীক্ষায় অংশগ্রহন ও নাটক করা থেকে বিরত থাকার জন্য বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি থেমে থাকি নি।সব চ্যালেঞ্জকে মাথায় নিয়েই কাজ করেছি বলে আশার কথা বলেন সফল এই উদ্যোক্তা।

উল্লেখ্য মঞ্জুলিকা খীসা পাহাড়ের প্রসিদ্ধ বয়ন শিল্প প্রতিষ্ঠান বেইন টেক্সটাইল এর প্রতিষ্ঠাতা।১৯৬৫ সালে তিনি আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের উন্নয়নে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।এটি প্রতিষ্ঠার আগে ১৯৬১ সালে রাঙ্গামাটির শাহ বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।।সেসময় ১৯৬৭ সালে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে শ্রেষ্ট শিক্ষক হিসেবেও পুরস্কৃত হন তিনি।নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত থাকার কারণে ১৯৭৬ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে স্বাধীন উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।

মঞ্জুলিকা চাকমা’র জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৬ অক্টোবর রাঙ্গামাটি শহরে। পিতা কালী রতম খীসা ও মাতা পঞ্চলতা খীসার সাত সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। কারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৮ সালে বাংলা একাডেমী কর্তৃক সম্মানসূচক ফেলোশিপও লাভ করেন এই সফল উদ্যোক্তা। এছাড়া স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নানা সংগঠন থেকেও বিভিন্ন সম্মানসূচক পদকে ভ‚ষিত হয়েছেন তিনি।

পারিবারিক জীবনেও সফল এই নারী ১৯৬০ সালে পাহাড়ের মেধাবী সন্তান চিরঞ্জীব চাকমা’র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। একমাত্র পুত্র কৌশিক চাকমা (লিটন) একজন সফল ব্যবসায়ী এবং তার মায়ের প্রতিষ্ঠিত বেইন টেক্সটাইল এর বর্তমান পরিচালক ও স্বত্তাধিকারী। জৈষ্ঠ কন্যা শ্রাবনী চাকমা এখন ইয়েমেনের রাজধানী সানা’য় এর একটি ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করেন। কনিষ্ঠ কন্যা ডা: ইন্দ্রানী চাকমা জাতিসংঘের জরুরী শিশু তহবিল -ইউনিসেফ এর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসাবে বর্তমানে ভুটানে কর্মরত।

এবারে বেগম রোকেয়া পদক -২০২০ প্রাপ্ত সফল নারীরা হলেন, নারী শিক্ষায় অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার, পেশাগত উন্নয়নের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কর্ণেল (ডা:) নাজমা বেগম,এসপিপি,এমপিএইচ, নারীর আর্থ সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মঞ্জুলিকা চাকমা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে নারী জাগরণে অবদানের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বেগম মুশতারী শফি এবং নারী অধিকারে অবদানের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফরিদা আক্তার।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *