পার্বত্য চুক্তির ২৩তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে চট্টগ্রামে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত

“ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসুন” এই স্লোগানকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৩তম বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটি,চট্টগ্রাম অঞ্চল কর্তৃক চট্টগ্রাম জে.এম. সেন হল প্রাঙ্গনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৩তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক শ্রী তাপস হোড়ের সভাপতিত্বে এবং অনিল বিকাশ চাকমার সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. রানা দাশগুপ্ত।

এতে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক হোসাইন কবির,কবি ও সাংবাদিক হাফিজ রশিদ খান, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা উত্তম চৌধুরী, চট্টগ্রাম ঐক্য ন্যাপের নেতা পাহাড়ী ভট্টাচার্য, চট্টগ্রাম বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা কমরেড শরিফ সোহান, বিশিষ্ট সাংবাদিক সুমী খান, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার নেতা এ্যাড. প্রদীপ কুমার চৌধুরী, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কক্সবাজার জেলা শাখার নেতা প্রিয়তোষ শর্মা চন্দন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছাত্রনেতা নিপণ ত্রিপুরা প্রমূখ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণ শিল্পীদের অংশগ্রহণে গণসঙ্গীত পরিবেশন করা হয়।

উক্ত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটির সহ সভাপতি জুলিয়াস সিজার ত্রিপুরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ্যাড. রানা দাশগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশে কেউ রাজনীতিকে সঙ্গী করে নানান ছলনায় মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের দিকে ঠেলে নিচ্ছে।বর্তমানে বাংলাদেশে অদৃশ্য অশুভ সংকেত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বাধীনতা বিরোধী, চুক্তি বিরোধী প্রতিনিয়ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনে পাকিস্তান প্রেতাত্মা আছে,খন্দকার মোস্তাক আছে, নিপীড়ন আছে।
এদেরকে দ্রুত উৎখাত করতে না পারলে বাংলাদেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইনের বাস্তবায়ন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট নিরসনে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তিনি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আহ্বানও জানান।

আদিবাসী তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, হতাশার মধ্য দিয়ে মুক্তি মিলবেনা। লড়াকু হয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে আগামীর সংগ্রামে শরীক হয়ে জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ে আত্মবলিদানে প্রস্তুত থাকতে হবে।এছাড়া ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে পাহাড়ের লড়াই সংগ্রামকে জুম্ম তরুণদের এগিয়ে নিতে যেতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

অধ্যাপক হোসাইন কবির তাঁর বক্তব্যে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জননীতির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের অবদান বেশ নেতিবাচক।বর্তমানে জননীতির কারণে পাহাড়ী আদিবাসীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন,রাষ্ট্র আজ অপশক্তির কাছে আপোষ করছে বলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে দেরী হচ্ছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কবি হাফিজ রশিদ খান বলেন, পাহাড়ীদের জীবন আজ বিপন্ন।তাঁরা চিৎকার করতে পারছেনা, তারা আজ নিরুপায়।চুক্তির সুচিন্তিত বিষয়কে অবহেলা অবজ্ঞা করা হচ্ছে। যার ফলে সরকার তথা শাসকগোষ্ঠী তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে।এজন্য মুষ্টিমেয় আমলা তথা নেতার কাছে সরকার ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাচ্ছে বলেও মনে করেন বিশিষ্ট এই কবি।

উত্তম চৌধুরী তাঁর আলোচনায় বলেন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি তার প্রতিষ্ঠা কাল থেকে আদিবাসীদের পক্ষে কথা বলে আসছে।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা সুখে নেই।তারা প্রতিনিয়ত নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হচ্ছে। রাষ্টযন্ত্র একটি মহল কর্তৃক অধিকার হরণ করছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের একঘরে রাখার চেষ্টা করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, শাসকগোষ্ঠী যাদের সাথে চুক্তি করেছে তাদেরকে একটি গোষ্ঠীর মদদে চুক্তি বর্ষপূর্তি উদযাপন করতে দিচ্ছে না।সুতরাং তারা অসহায় হয়ে পড়েছে। তাই সকলকে এগিয়ে এসে লড়াই সংগ্রামে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

ঐক্য ন্যাপের নেতা পাহাড়ী ভট্টাচার্য বলেন, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার জুম্ম জনগনের সাথে ২৬বার ধারাবাহিক আলোচনা করে ৫ দফা দাবির ভিত্তিতে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।তার পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এবং তারা পর্যায়ক্রমে চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা অনেকদূর এগিয়েছে।কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের অধিকার খর্ব করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করণের জন্য চুক্তি বাস্তবায়ন জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত হত্যা,খুন, অপহরণ প্রতিনিয়ত হচ্ছে। অপারেশন উত্তরণের নামে জুম্মদের ভূমি দখল করে অপারেশন উত্তরণের নামে সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। সংঘাত জিইয়ে রেখে সেনা শাসন কায়েম করা হচ্ছে। যার ফলে চুক্তির ২৩ বছরের মাথায় সরকার নিজের সাথে প্রবঞ্চনা করছে।

অধ্যাপক প্রিয়তোষ শর্মা চন্দন বলেন , আজকের এই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হচ্ছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন তথা নিপীড়িত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে তিনি অনুরোধ জানান।

আলোচনায় অংশ নিয়ে শরিফ সোহান বলেন, বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসীরা অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
অনেক দেশের আদিবাসীরা তাদের ভূমির জন্য,অস্তিত্বের জন্য লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদেরকে অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন,বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক, অসাম্প্রদায়িক চেতনা শ্রেণির মানুষ জুম্ম জনগণের পাশে আগে থেকেই পাশে আছে।তাঁরা পাহাড়ীদের নিয়ে কথা বলেন।কিন্তু বিশেষ একটি মহল পাহাড়ীদের অধিকার নিশ্চিতে সদিচ্ছা প্রকাশ করছে না।

এম এন লারমা নিপীড়িত, নির্যাতিত অধিকার হারা মানুষের নেতা ছিলেন দাবী করে বিশিষ্ট সাংবাদিক সুমী খান বলেন, তিনি (এম এন লারমা) অধিকারের পক্ষে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি অধিকার বাস্তবায়ন,পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সংগ্রাম স্বাধীন দেশে বসবাস করতেও হচ্ছে, যা খুবই দু:খজনক বলে দাবী করেন তিনি।

নিজের দায়বদ্ধতা থেকে সরকারকে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার জন্য তিনি আহ্বান জানান। যথাযথ জায়গা থেকে সকলের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে সকল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধও জানান তিনি।

এ্যাড. প্রদীপ কুমার চৌধুরী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তিনি বলেন, চুক্তির ২৩ বছর পরেও চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য এখনো পর্যন্ত আন্দোলন করতে হচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কোন সদিচ্ছা না থাকার কারণে বাস্তবায়ন হচ্ছেনা।বরং সরকার চাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কিভাবে বাতিল করা যায় তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত চুক্তি লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। তিনি সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য অনুরোধ জানান।

ছাত্রনেতা নিপন ত্রিপুরা বলেন, নানান সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৩তম বর্ষপূর্তি পালিত হচ্ছে। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করেও ২৩ বছর পরেও তা বাস্তবায়ন না করে জুম্ম জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার একদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কথা বলছে অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্র সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পাহাড়ে সেনাশাসন, ভূমি দখল চলমান রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের নামে ভূমি দখল করে পর্যটন শিল্প প্রসারিত করার ফল জুম্ম জনগণ মেনে নেবেনা।এর ফল ভয়ানক হবে বলেও তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে করোনা কালীন সময়েও রাষ্ট্রযন্ত্র তথা সেটলার বাঙালিদের দ্বারা মানবাধিকার লংঘন থেমে নেই।
জুম্ম জনগণ দুর্বল নয় দাবী করে তিনি আরো বলেন, তাঁরা (জুম্ম জনগণ) জানে কীভাবে সংকটের মধ্য দিয়ে অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। চুক্তি বাস্তবায়ন তথা মানবাধিকার লংঘন প্রতিনিয়ত করতে থাকলে জুম্ম জনগণ বিকল্প পথ বেছে নেবে বলে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

এরপর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৩তম বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটি, চট্টগ্রাম অঞ্চলের আহ্বায়ক এবং সভার সভাপতি তাপস হোড়ের সমাপনীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *