পার্বত্য চুক্তির ২৩ বছর: প্রত্যাশা পরিণত হয়েছে হতাশা ও ক্ষোভে – বলছেন বিশিষ্টজনরা

আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ২৩ বছর পূর্তি। পাহাড়ে দীর্ঘ দুই যুগেরও অধিক সশস্ত্র যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয় এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে। ১৯৯৭ সালে এই চুক্তি স্বাক্ষরের আজকের এই দিনে যৌথভাবে পথ চলবার প্রত্যাশায় পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির স্টেডিয়ামে বর্তমান এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পাহাড়ের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতি সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) শ্বেত কপোত উড়িয়েছিল। পাহাড়ের আকাশে এই শ্বেত কপোতের উড্ডয়ন পাহাড়ের মানুষের মনে নিয়ে আসে শান্তির বাতাবরণ। ঝঞ্চা বিক্ষুব্ধ আর অনিশ্চিত অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রত্যাশায় মানুষ উন্মুখ হয়ে মুখিয়েছিল এ চুক্তির দিকে। অধিকারের প্রশ্নে অস্ত্র তুলে নেয়া তরুণ পাহাড়ী মানুষটি যখন তাঁর সমস্ত জীবন আর যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়ে অস্ত্র সমর্পন করতে যাচ্ছে তখন তাঁর মধ্যে জেগেছিলো শিহরণ আর বঞ্চনা থেকে মুক্তির আকাঙ্খার হাজারো স্বপ্ন। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ২৩ বছর পর পাহাড়ে কী আদৌ সেই কাঙ্খিত শান্তি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ?- এই প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন পক্ষ ও গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে দিয়ে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বলছে চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয় নাই। অন্যদিকে সরকার বলছে চুক্তির অধিকাংশ ধারাই বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকী বিষয়গুলোও বাস্তবায়নের পথে আছে বলে গত কয়েক বছর ধরে সরকারী নানা মন্ত্রণালয় ও শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিগণ বার বার বুলি আওড়িয়ে যাচ্ছে। তবে পাহাড়ের সাধারণ নাগরিক এবং দেশের বিশিষ্টজনরা বলছে ভিন্ন কথা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশিষ্টজন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান এক মুঠো আলাপে আইপিনিউজকে বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা হচ্ছে। এই দীর্ঘ সূত্রিতা পরিস্থিতিকে জটিল থেকে আরো জটিলতর করে তুলছে। চুক্তি বাস্তবায়নে কালক্ষেপনের ফলে পাহাড়ে বিভিন্ন পক্ষ তৈরী হয়েছে এবং সংঘাতকে আরো বাড়িয়ে তুলছে বলেও মত দেন এই শিক্ষাবিদ।
তিনি আরো বলেন, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে আস্থাহীনতা এবং নিরাপত্তাহীনতা দু’টোই বেড়েছে। সরকার ‘উন্নয়ন’ ‘উন্নয়ন’ বলে রাস্তা-ঘাট, বিল্ডিং সহ বিভিন্ন কিছু তৈরীর উদ্যোগ নিলেও এখনো পাহাড়ের প্রত্যন্তে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা ঠিক মতো পৌঁছায়নি যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক বলেও মন্তব্য করেন মানবাধিকার কমিশনের সাবেক এই সদস্য। তবে সে উন্নয়ন জনগণের ‘সঠিক প্রত্যাশা’ পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।

চুক্তি বাস্তবায়নে কী করা দরকার? এই প্রশ্ন করা হলে নিরূপা দেওয়ান বলেন, সরকারকে আরো আন্তরিক হতে হবে। অন্যদিকে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য স্বাক্ষরকারী দু’টি পক্ষ সরকার এবং জনসংহতি সমিতিকে পরষ্পর সহযোগী হয়ে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে এ দু’টি পক্ষের মধ্যে ‘দূরত্ব’ কমানোর বিষয়েও তাগিদ দেন বিশিষ্ট এই নাগরিক।

অন্যদিকে বান্দরবানের বন ও ভূমি রক্ষা কমিটির সভাপতি জুমলিয়ান আমলাই বম এক মুঠো আলাপে আইপিনিউজকে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তাঁর অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। ২০১০ সাল থেকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া থমকে আছে বলেও মনে করেন তিনি। এ চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে জনসংহতি সমিতি সহযোগীতা করবে কিন্তু মূল দায়িত্বটা সরকারের বলেও দাবী করেন তিনি।

সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কোনো কাজ করতে পারছে না। এই কমিশন পরিচালনায় কোনো বিধি এখনো করা হয় নাই। উপরন্তু বিভিন্ন জায়গায় হোটেল, পর্যটন স্থাপনের নামে ভূমি দখল করার জন্য সরকারের ‘বিশেষ বিশেষ উইং’ সমূহ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে বলেও অভিযোগ করেন এই বিশিষ্টজন।

এক প্রশ্নের জবাবে জুমলিয়ান আমলাই আইপিনিউজকে আরো বলেন, পাহাড়ের সামরিক ও বেসামরিক আমলারা চায় না পাহাড়ের মানুষ অধিকার পাক। পাহাড়ের আদিবাসীদেরকে ‘পশুতুল্য. অশিক্ষিত, মুর্খ’ বলেও ভাবা হচ্ছে বলে অভিমত তাঁর। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সকলের সম্মিলিত আন্দোলনের কথাও বলেন এই বিশিষ্ট নাগরিক।

এদিকে এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীণ আইপিনিউজকে বলেন, এই ২৩ টি বছরে পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো মিমাংসা করা হয় নাই। তার মধ্যে ভূমি সমস্যা, অভ্যন্তরীণ উদ্ভাস্তুদের পুনর্বাসন ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতির বিষয়টি এখনো মিমাংসিত হয়নি।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী আঞ্চলিক পরিষদ পাহাড়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা। কিন্তু বান্দরবানের চিম্বুকে সাম্প্রতিক পাচঁ তারকা হোটেল নির্মাণের ব্যাপারটিতে দেখা যায় যে, জেলা পরিষদ আঞ্চলিক পরিষদকে পাশ কাটিয়ে জমি লিজ দিচ্ছে।
অন্যদিকে পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর অভিমত জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাহাড়ে ভাগ কর, শাসন কর এই নীতি এখনো চলমান। এ বেপারে পাহাড়ের অধিকার কর্মীদের আরো সচেতন থাকার বিষয়েও তাগিদ দেন এই আদিবাসী গবেষক।

এদিকে এক মুঠো আলাপে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং আইনিনিউজকে বলেন, যারা অপেক্ষা করেন তাদেঁর জন্য ২৩ বছর দীর্ঘ সময়। সরকার যদিও বলছে খুব কম সময়, তবে পাহাড়ী মানুষের জন্য এটা দীর্ঘ অপেক্ষার। অনেক আশা নিয়ে যারা চুক্তি করলো তারা এখন হতাশ বলেও মনে করেন এই আদিবাসী নেতা।

তিনি আরো বলেন, যারা গত ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন তারাই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের এত বছর পর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেমে আছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুক্তিও লংঘিত হচ্ছে। চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট আঞ্চলিক পরিষদ এখন ক্ষমতাহীন, তিন জেলা পরিষদ অকার্যকর, ভূমি কমিশন কাজ শুরুও করেনি। এসব খুবই দু:খজনক ও হতাশার বলেও দাবী করেন তিনি।

পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সরকারের জন্য সম্মানের এবং মঙ্গলজনক। তাই সরকার যেন এ বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পুন:রুদ্দোমে কাজ শুরু করে। তার জন্য জনসংহতি সমিতির সাথে একটি উচ্চ পর্যায়ের সংলাপ আয়োজনের জন্য সরকারকে আহ্বান জানান এই আদিবাসী নেতা।

উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহের মধ্যে রয়েছে- পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘উপজাতি’ অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে আইনী ও প্রশাাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, পর্যটন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কার্যাবলী হস্তান্তর করা; নির্বাচন বিধিমালা ও ভোটার তালিকা বিধিমালা প্রণয়ন পূর্বক তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং তদনুসারে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা; নিরাপত্তা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা; ভূমি কমিশনের মাধ্যমে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করে বেহাত হওয়া জুম্মদের জায়গা-জমি ফেরত দেয়া; ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুদের তাদের স্ব স্ব জায়গা-জমি প্রত্যার্পণ পূর্বক পুনর্বাসন প্রদান করা; অস্থানীয়দের নিকট প্রদত্ত ভূমি ইজারা বাতিলকরণ; পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল চাকরিতে জুম্মদের অগ্রাাধিকারের ভিত্তিতে স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়োগ করা; চুক্তির সাথে সঙ্গতি বিধানকল্পে ১৮৬১ সালের পুলিশ এ্যাক্ট, পুলিশ রেগুলেশন ও ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য অন্যান্য আইন সংশোধন; পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সেটেলার বাঙালিদের সম্মানজনক পুনর্বাসন করা অন্যতম।

চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্যতম পক্ষ জনসংহতি সমিতি বলছে, চুক্তির উক্ত মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়িত না হলে চুক্তির অন্য ধারাগুলোর বাস্তব কোন তাৎপর্য থাকে না। এমনকি এই মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হলে, পার্বত্য মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডেরও কোন তাৎপর্য থাকে না। ফলে বিগত ২৩ বছরেও জুম্মসহ স্থায়ী অধিবাসীরা পার্বত্য চুক্তির প্রকৃত সুফল লাভ করতে পারেনি।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *