জুম্ম জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে – সুহৃদ চাকমা ও সঞ্চারণ চাকমা

“জুম্ম জাতীয়তাবাদ” নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের “জাতি”, জাতির আবির্ভাব বিশেষ করে আধুনিক জাতির আবির্ভাব এবং সেই সমস্ত জাতিগুলিকে ঘিরে গড়ে ওঠা ” জাতীয়তাবাদ” সম্পর্কে আলোচনা করতেই হয়। বর্তমান সময়ে আমরা যাদেরকে জাতি হিসেবে দেখছি বা বলছি তারা কি আগে নিজেদেরকে আদৌ জাতি হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল? না!

আধুনিক জাতির উদ্ভব বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লবের পর হতেই, ধনতন্ত্রের উত্থানের পরেই জাতির আবির্ভাব দেখা যায়। তার আগে সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় জাতিসমুহের অস্তিত্ব থাকলেও “জাতি” অর্থে তাদের পরিচিতি ছিল না। গোষ্ঠী,সম্প্রদায়,উপজাতি প্রভৃতি নামেই তাদের উপস্থিতি ছিল।

জাতি:
মানবসমাজের বিবর্তনের ইতিহাসে জনসমাজ, জাতীয় জনসমাজ এবং জাতি নির্দিষ্ট রূপকে সূচিত করে। একটি জনসমাজের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটলে তাকে জাতীয় জনসমাজ বলে। রাজনৈতিক চেতনা সম্বন্ধে জনসমাজ যখন নিজ স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তােলার জন্য সচেষ্ট হয় অথবা স্বাধীন রাষ্ট্রে বসবাস করে, তখন এই সংগঠিত জাতীয় জনসমাজকে জাতি বলে। অধ্যাপক গিলকাইস্টের মতে একটি রাষ্টের অধীনে সুগঠিত জনসমাজকে জাতি বলা হয়।উদাহরণস্বরুপ ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের আগে ভারত একটি জাতীয় জনসমাজ ছিল। পরবর্তীকালে ভারতীয়দের মধ্যে সক্রিয় রাজনৈতিক চেতনা আবির্ভাবের ফলে ভারতীয়গণ সংগঠিত জাতিতে রপান্তরিত হয়। সুতরাং জাতীয় জনসমাজের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠন যুক্ত হলেই জাতি সৃষ্টি হল।
এর বৈশিষ্ট্যগুলি হল—(১) একটি সরকার সম্পর্কে ধারণা। (২) সব জনগােষ্ঠীর মধ্যে গভীর সম্পর্ক। (৩) মােটামুটিভাবে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড। (৪) ভাষা, বর্ণ, ধর্ম ও জাতীয় চরিত্রগত ঐক্যবােধ। (৫) বিভিন্ন জনগােষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করা এবং জনগণের মধ্যে জাতীয় মনােভাবের উপস্থিতি।

মহামতি স্টালিনের ভাষায়,”A nation is primarily a community,a definite community of people”. অর্থাৎ একটি সঙ্ঘবদ্ধ জনসমষ্টির কথাই বুঝিয়েছেন তিনি। প্রসঙ্গত এই জনসমষ্টি কোন একক গোষ্ঠীজাত নয়,নয় কোন একক উপজাতিভুক্ত জনসমষ্টি। আধুনিক ইটালিয়ান জাতি রোমান,গ্রীক,টিউটন,ইট্রুরিয়াস এবং আরব জাতির সংমিশ্রণে গঠিত। অনুরুপভাবে ফরাসী জাতিও গল(প্রাচীন ফরাসী),ব্রিটনীয়,টিউটন,রোমান ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জাতি। ঠিক অনুরুপভাবে আধুনিক জার্মান,ব্রিটেন এবং অন্যান্য জাতির ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য, যারা ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী এবং উপজাতি থেকে জাতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এইভাবে একটি জাতি কেবল বিভিন্ন উপজাতি এবং গোষ্ঠীর সম্মিলনই কেবল নয় বরং জাতি হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে গঠিত একটি জনসমষ্টি।
পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই,যা একটিমাত্র বংশজাত, একটিমাত্র উপজাতি গোষ্ঠীভুক্ত কিংবা একটিমাত্র মূল মানবশাখাভুক্ত গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত। প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রয়েছে বহু বংশজাতি, বহু উপজাতিগোষ্ঠীভুক্ত এবং বহু মূল মানবশাখাভুক্ত মানুষ। তারা দীর্ঘকাল ধরে এক অর্থনৈতিক বন্ধনের জীবনধারায় আবদ্ধ হয়ে একটি স্থায়ী জনসমাজ সৃষ্টি করেছে। আমরা যদি বাঙালী জাতির কথাই ধরি, তাহলে দেখতে পাব বাঙালী জাতির উদ্ভবেও রয়েছে বহু গোষ্ঠী, উপজাতি এবং মানবশাখাভুক্ত মানুষের সংমিশ্রণ। অস্ট্রোলয়েড(কোল,সাঁওতাল,মুন্ডা,ওরাঁও),আদি মঙ্গোলীয়(কোচ) এবং আর্য(দ্রাবিড়) জাতির মিশ্রণেই বাঙালী জাতি গঠিত।

এছাড়াও কেবলমাত্র ঐতিহসিকভাবে সঙ্ঘবদ্ধ জনসমষ্টিকেই জাতি হিসবে অভিহিত করা যায় না। যেমন সাইরাস এবং আলেকজেন্দ্রীয় সম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত জনসমষ্টিকে জাতি হিসেবে অভিহিত করা যায় না,যদিও তারা ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী এবং উপজাতি থেকে ঐতিহাসিকভাবে সঙ্ঘবদ্ধ হলেও, তারা সুনির্দিষ্টভাবে কোন স্থানে বসবাস করে না। তাছাড়া কেবলমাত্র স্থায়ী জনসমষ্টি হলেই জাতি হিসেবে গণ্য করা যায় না,যেমন অস্ট্রিয়া এবং রাশিয়ারও স্তায়ী জনসমষ্টি রয়েছে তাবে তাদেরকে একই জাতি হিসেবে গণ্য করা যায় না। এর এখানেই রয়েছে জাতীয় কমিউনিটি এবং রাষ্ট্রীয় কমিউনিটির মধ্যে পার্থক্য। তাহলে সেটা কি?
অভিন্ন ভাষা ব্যাতীত জাতীয় কমিউনিটির ধারণা করা মূল্যহীন আর অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কমিউনিটিতে ভিন্ন ভাষাভাষি জনসমষ্টি থাকতে পারে।

আবার কোন জনসমষ্টি ঐতিহাসিকভাবে সঙ্ঘবদ্ধ এবং এক অভিন্ন ভাষায় নিজেদের ভাব প্রকাশ করলেও সুনির্দিষ্ট জায়গায় বসবাস না করলে তাদেরকে জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না। যেমনটি আমরা লক্ষ্য করি ইংল্যান্ড আর আমেরিকার অধিবাসীরা একই ভাষায়(ইংরেজী) কথা বললেও তারা এক জাতি নয়। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালী এবং বাংলাদেশের বাঙালীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ,ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যাবস্থার অধীনে বাস করার ফলে মানুষ ভিন্ন জাতিতে পরিণত হয়ে যায়। উল্লেখ্য যে, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ায় কিভাবে জাতিরাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল তাও একটু দেখি। এক একটি জাতি নিয়ে জাতিরাষ্ট্র গঠিত হবে। জাতি ও রাষ্ট্র এই দুটি শব্দ নিয়ে জাতিরাষ্ট্র। এখন প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া স্বাভাবিক হলো এই, এক একটি জাতি নিয়ে জাতিরাষ্ট্র গঠিত হবে, কিন্তু পৃথিবীতে অনেকগুলো ছোট ছোট জাতি থাকবে-তাদের কি হবে? অনেকেই বললেন, বড় বড় জাতিগুলির সাথে মিশে যাবে। ৭০ দশকে এসে উদ্ভূত হলো বহুজাতি রাষ্ট্র, বহুসংস্কৃতি, বহুভাষাভাষী ছোট ছোট জাতিগুলিকে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। Autonomy বা স্বায়ত্তশাসন মূলতঃ সেখান থেকে চলে এসেছিল। উদাহারণস্বরুপ একটা বড় বাড়িতে ছোট ছোট রুম বা কক্ষ থাকে, ঠিক সেভাবেই একটা দেশের মধ্যে ছোট ছোট জাতিগুলিকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিয়ে তাদের আত্মপরিচয়কে স্বীকৃতি দিয়েছিল অনেক দেশ।

আবার কেবলমাত্র স্থায়ী জনসমষ্টি,অভিন্ন ভাষা এবং একই স্থানের অধিবাসী হলেও জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না,যদি না তারা একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক বন্ধনে আবদ্ধ না থকে। একটি সাধারণ অর্থনৈতিক বন্ধনই মানুষকে এক জাতিতে পরিণত করে। উপরোক্ত ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার অধিবাসী,বাংলাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীরাও ভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যাবস্থার বন্ধনে আবদ্ধ।

অবশ্য এই সমস্ত দিকগুলো ছাড়াও জাতি শব্দের অন্যরুপ অর্থও দেখা যায়। ধর্মের ভিত্তিতেও অনেক সময় জাতির পরিচয় দিতে দেখা যায়। যেমন-ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা নিজেদেরকে মুসলিম জাতি,হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা নিজেদেরকে হিন্দু জাতি,খ্রীষ্টান ধর্মের অনুসারীরা নিজেদেরকে খ্রীষ্টান জাতি,বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা নিজেদেরকে বৌদ্ধ জাতি এবং একইভাবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও নিজেদেরকে ধর্মের ভিত্তিতে পৃথক জাতি হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। আবার পৃথিবীর কোথাও এক জাতি এক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নেই। প্রতিটি রাষ্ট্রই বহু জাতির,বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যপূর্ণ জনসমাজ নিয়ে গঠিত। মোটকথায় এখনকার সময়ে উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও জাতি গঠনে সবচেয়ে যেটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেটি হচ্ছে,একই অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ঐক্য। অর্থাৎ একই উৎপাদন ব্যাবস্থার দ্বারা গঠিত জনসমষ্টি এবং একই রাজনৈতিক শৃঙ্খলের দ্বারা আবদ্ধ জনসমষ্টি।

জুম্ম জাতি:
জুম্ম জাতি সম্পর্কে আলোচনা করার আগে কিছু সংক্ষিপ্ত আকারে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস টেনে নিয়ে আসা দরকার। চির অবহেলিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত শোষিত এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের হাতে পদানত হওয়ার আগে স্বাধীন রাজার শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল সামন্তবাদী শাসন ও শোষণ। বলতে গেলে সমাজের অভিজাত শ্রেণী ও প্রজা শ্রেণীই ছিল সমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো। অভিজাত শ্রেণীই হলো শাসনের নামে চালাতো অকথ্য নির্যাতন ও নিপীড়ন। অন্যদিকে প্রজা শ্রেণীই ছিল উৎপাদনে নিয়োজিত তাদের না ছিল রাজনৈতিক অধিকার, না ছিল অর্থনৈতিক অধিকার। সাম্রাজ্যেবাদী ব্রিটিশের হাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম পদানত হলে ব্রিটিশ সরকার তার সাম্রাজ্য রক্ষার্থে তার শাসন অব্যাহত রাখার জন্য পরাজিত অভিজাত শ্রেণীকে হাতে রাখার জন্য নানা ধরনের শাসন ক্ষমতা তাদের হাতে অর্পণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসননীতি নির্ধারণ করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে সামন্তবাদী শাসন ও শোষণ ব্যবস্থাকে উৎখাত না করে বরং সামন্তব্যবস্থাকে আইনগত করেছিল। তৎকালীন ১৯০০ সালের শাসনবিধিকে পাকাপোক্ত করেছিল। যে শাসনবিধিতে গুণেধরা ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদী শাসন ব্যবস্থাকে আইনগত করে স্থায়ী করা হয়েছিল। স্বাধীন রাজার শাসনামলে প্রজা শ্রেণীর উপর অভিজাত শ্রেণীর নির্দয় নিপীড়ন ও শোষণ যার কারণে জাতীয় অগ্রগতির পথ রুদ্ধ হয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে পরাধীনতার যুগে এই নির্যাতন, নিপীড়ন ও শোষণ বন্ধ তো হলো না বরং একদিকে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের আর অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিজাত শ্রেণীর নিপীড়ন ও শোষণ সমানতালে চলেছিল। যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জাতি হিসেবে টিকে থাকার যে মূল ভিত্তি রাজনৈতিক চেতনা-জাতীয় চেতনার উন্মেষ হতে পারেনি। তারপর একটানা ব্রিটিশের শাসন চললো ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন লক্ষনীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যায়নি, যেহেতু জাতির জাতীয় চেতনা উন্মেষ হয়নি। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনের মালিকানা স্বত্বের অধিকারী হয় এবং ১৯৭১ সাল থেকে পাকিস্তান শাসন ধ্বংস হওয়ার পর বাংলাদেশ এই মালিকানাস্বত্বের অধিকারী হয়ে যায়। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ-এই তিনটি শাসকের হাতে পর্যায়ক্রমে পরাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন শোষণ হয়ে আসছে। এই হলো একটি জাতির তার জন্মভূমির পরাধীনতার ইতিহাস।

আমরা জানি, কেহই কারোর হাতে পরাধীন হতে চায় না বা পরাধীন থাকতে চায় না। কিন্তু জাতীয় চেতনার উন্মেষ না হলে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙবার জন্য কোন জাতি এগিয়ে আসতে পারেনা। জাতীয় চেতনা উন্মেষ হয়নি বলেই জাতি এতোদিন প্রতিবাদ ও করেনি, প্রতিরোধ সংগ্রাম ও চালাতে পারেনি। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সংগ্রাম জাতি চালাতে না পারলেও কিন্তু পরাধীনতার জ্বালা জাতির বুকে ঠিকই জ্বেলেছিল। পরাধীনতার অভিশপ্ত কালিমাময় জীবন থেকে ধীরে ধীরে জাতির জাতীয় চেতনার উন্মেষ হয়। জাতি অনেক অনেক স্বকীয় বৈশিষ্ট্য হারানোর পর জেগে উঠেছিল। তাই এই জাগরণ বিশেষ করে ৭০ দশকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সংগ্রামরুপে জাতির ইতিহাসে অভ্যুদয় ঘটে। মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জুম্ম জাতীয়তাবাদের চেতনার ডাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিসমূহ ছাড়া দেয়। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন অভ্যুদয়ের সূচনা হয়েছিল।

“জুম্ম” বলতে কেবল যারা জুম চাষ করে,তাদের বুঝায় না। যারা জুমচাষ করে তাদের বলা হয় “জুমিয়া”। ” জুম্ম” শব্দের অর্থ হচ্ছে “পাহাড়ের অধিবাসী” বা “পাহাড়ী”। অর্থাৎ, যারা যুগ যুগ ধরে পাহাড়ে বসবাস করে আসছে,তাদের জুম্ম বলা হয়। এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে,পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষি জাতিগোষ্ঠীসমূহ ঐতিহাসিকভাবে একটি একই অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা এবং একই রাজনৈতিক ব্যাবস্থার দ্বারা গঠিত একই মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
যেমন- মিজোরামের ” মিজো” ও ফিলিপাইনের “ইগোরোত” শব্দের অর্থও পাহাড়ের অধিবাসী,যারা একইসাথে জুম্মদের মতন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত। জাতীয়তাবাদ হল এক ধরণের আদর্শগত বিষয় যা একটা জাতির জাতীয় বিশেষত্বের সম্পর্কিত ভাবধারা বা ধারনা বা চিন্তাধারা। তাহলে জাতীয়তাবাদ হল কোন জাতির ঐক্য চেতনা বা ঐক্য চেতনার অভিব্যক্তি। এই চেতনা একটা জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। তবে জাতীয়তাবাদের দুটি ধারা চলমান; তারমধ্যে একটি ধারা হল প্রভূত্ব বা একচেটিয়া আদিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে জাতীয়তাবাদ যা উগ্র জাতীয়তাবাদ। যেমন; জার্মানের হিটলার এর জাতীয়তাবাদ হল উগ্র জাতীয়তাবাদ। সংক্ষেপে যদি বলি উগ্র জাতীয়তাবাদ দৃষ্টিভঙ্গী মনে করে নিজের জাতিই সুন্দর, নিজের জাতিই শ্রেষ্ঠ। সে অপর কোন জাতিকে সহ্য করতে পারেনা। সকল জাতির উপর প্রভূত্ব সৃষ্টি করতে চায়। আর দ্বিতীয় ধারাটি হল অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে জাতীয়তাবাদ যা প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদ হিসেবে অধিক পরিচিত। যেমন; জুম্ম জাতীয়তাবাদ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতির আবাসভূমি। অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতির সম্মিলনেই জুম্ম জাতির রাজনৈতিক সত্বা গঠিত হয়েছে। প্রত্যক জাতির রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেক জাতিই আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে রয়েছে এবং আপন বৈশিষ্ট্যকে ভিত্তি করে আধুনিক জগতের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরুং, চাক, খিয়াং, খুমী, লুসাই, বম ও পাংখো ভাষাভাষি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি সমূহের মধ্যে অনেক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষায় তুলনামূলকভাবে কিছুটা এগিয়ে যেতে পেরেছে। আবার অনেকে এখনো সঠিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাভাষির জনসমষ্ঠি রাজনৈতিক চেতনার দিক দিয়ে, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ও শিক্ষার দিক দিয়ে খুবই পিছিয়ে পড়া। সহজ সরল জুম কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কারনই হচ্ছে এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাভাষির জনসমষ্টির অর্থনৈতিক ভিত্তি। যুগ যুগ ধরে এই সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতিক ভিত্তি তাদের জীবনে গভীরভাবে ও প্রোটিত হয়ে রয়েছে। তাদেরই চারপাশে কতো কিছুর উত্থান পতন হয়েছে এবং হতে চলেছে, কিন্তু তাদের এই সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা জগদ্দল পাথরের মতো অনঢ় অটল হয়ে থেকেছিল। প্রথম কিছু যুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেল, ঘটে গেল ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আন্দোলন ও ফলশ্রুতি স্বরূপ ভারতবর্ষ বিভক্তি। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগন যারা যুগ যুগ ধরে সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার জালে আবদ্ধ তারা এই সবেরই কোন ধাক্কা অনুভব করতে পারেনি। তারা তাদের চেয়ে অনেক অনেক উন্নত বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থা পরিচালিত বাঙালী মুসলমান জাতির নির্দয় ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হলো এবং অসহায়ভাবে বোবার মতো এই নির্দয় ষড়যন্ত্র প্রত্যক্ষ করতে লাগলো।

আরও যদি বলি জাতীয়তাবাদ হচ্ছে ঐক্য এবং চেতনা। কোন ব্যাক্তির নিজের জাতির প্রতি শ্রদ্ধা,ভালোবাসা,ভক্তি,আনুগত্যই হলো জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ হল স্বজাতির প্রতি ভালােবাসা। দেশের মানুষকে আপন করে নেবার মানসিকতা। এটি একটি মহৎ রাজনৈতিক আদর্শ। পরাধীন জাতিকে শৃঙ্খলিমােচনের সংগ্রামে এই আদর্শ প্রেরণা দিয়েছে। জাতীয় ঐক্যসাধনের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের কোনাে বিকল্প নেই।যখন কোনাে জনসমষ্টি বংশ, ভাষা, ধর্ম প্রভৃতি কারণে ঐক্যবদ্ধ হয় তখন তাদের বলা হয় জনসমাজ। যখন এই জনসমাজের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগে, তখন তাদের বলা হয় জাতীয় জনসমাজ। জাতীয় জনসমাজের মানুষেরা প্রত্যেকে অপরের সুখ-দুঃখে সমান অংশীদার বলে মনে করে। অন্য জনসমাজ থেকে নিজেদের পৃথক বলে ভাবতে শেখে। প্রত্যেকে নিজেদের ভাষা, ধর্ম,সাহিত্য ইত্যাদির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। এগুলিকে সংরক্ষণ করার জন্য তাদের মধ্যে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের ইচ্ছা জাগে। এই চেতনা তাদের ঐক্যবােধকে গভীরতর করে। জাতির প্রতি এই ভালােবাসা ও একাত্ববােধের নাম হল জাতীয়তাবাদ। তাই “জাতীয়তাবাদ হল ঐক্যের অনুভূতি।” জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্টগুলি হল-(১) নিজেদের মধ্যে গভীর ঐক্যবােধ গড়ে তােলে। (২) অন্যান্য জনসমাজ থেকে স্বাতন্ত্র্যবােধের জন্ম দেয়। (৩) আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার।

জাতীয়তাবাদ কখনও প্রগতিশীলতার পক্ষে এবং কখনও বা আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিশেষ করে ধনতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় এর উচ্চতম রুপটি আমরা দেখি,যখন এটি পুঁজিবাদের সর্বেচ্চ পর্যায় সম্রাজ্যবাদে উপনীত হয় তখন। সম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করে অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর উপর শোষণের কার্য চালাতে থাকে এবং অপর পক্ষে শোষিত রাষ্ট্রে বসবাসরত ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীসমুহ শোষণ থেকে মুক্তির জন্য এক আদর্শিক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই হয়েছে,সুবিশাল ভারতবর্ষে ভারতীয় বলে কোন জাতির অস্তিত্বই ছিল না,সমগ্র ভারতবর্ষে পাঞ্জাবী,শিখ,মারাঠী,বাঙালী,প্রভৃতি জাতির অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জাতি এক এবং অভিন্ন সংকল্পকে নিয়ে লড়াই করেছে,যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তাদের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পীড়ন,যা তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে ভারতীয় হিসেবে লড়াই করতে বাধ্য করেছে। দেশ বিভাগের পরে যখন ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে,ঠিক তৎপরবর্তী পাকিস্তান রাষ্ট্র একই ধর্মাবলম্বী হওয়া স্বত্তেও পূর্ব পাকিস্তানকে(বর্তমান বাংলাদেশ) উপনিবেশিক কায়দায় শাসন-শোষণ করতে শুরু করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে এই ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমরা হিটলারের সেই উগ্র জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশের কথা জানি,যার কারণে তিনি সমগ্র জার্মানবাসীকে শ্রেষ্ঠ বলে জাহির করে বিশ্বকে এক মহাযুদ্ধ উপহার দিয়েছিলেন। অনুরুপভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও উগ্র জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পায়,যার কারণেই বাঙালী ভিন্ন বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য আদিবাসী জাতিসমুহকে বাঙলী বলে পরিচিতি করাতে প্রচেষ্টা করা হয় এবং তাদের উপর শাসন-শোষণের স্টীম রোলার চালিয়ে দেওয়া হয়। সামন্ততন্ত্রের বিলোপ সাধনে পুঁজিতন্ত্রের উত্থানে আমরা জীতয়তাবাদের বিশেষ ভূমিকা যে ছিল,সেটা আগ্রাহ্য করতে পারি না। মূলতঃ পুঁজিতন্ত্রের বিকাশের ফলেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিকাশ লাভ করে অর্থাৎ সামন্ততন্ত্রের বিলোপের সাথে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠন এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটা সম্পর্ক রয়েছে। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে যখনই রাজনৈতিক আন্দোলনে রুপ দেওয়া হয় তখনই বিচ্ছিন্নটার প্রশ্ন আসে অর্থাৎ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রশ্নটা সামনে চলে আসে।

বর্তমানে ভাষা, ধর্ম, বংশ প্রভৃতি উপাদান জাতি গঠনে অপরিহার্য নয়। সুইজারল্যান্ডের মানুষ বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে। তবুও তারা এক জাতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বিভিন্ন বংশ থেকে এসেছে। তবুও তারা ঐক্যবদ্ধ একটি জাতি। প্রকৃতপক্ষে, জাতীয়তাবােধ একটা ভাবগত ধারণা। যদি কোনাে জনসমষ্টি মনে করে তাদের মধ্যে ভাষাগত, ধর্মগত ও বংশগত প্রভৃতি ক্ষেত্রে যতই পার্থক্য থাকুক না কেন, তারা ঐক্যবদ্ধ, তাহলে তারা এক জাতিতে পরিণত হতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে একথা প্রযােজ্য। এখানে ভাষাগত, ধর্মগত, বংশগত প্রভৃতি ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে সত্য। তা সত্ত্বেও ভারতবাসী ভাবগত কারণে ঐক্যবদ্ধ। তাই শক, হুন, পাঠান, মােগল ভারতের দেহে লীন হয়ে ভারতীয় হিসাবে পরিচিত হয়েছে। পাঞ্জাব, গুজরাট, মারাঠা, উল্কল ও বঙ্গের বাসিন্দারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে।

বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে এর সুত্রপাত,এর হাত ধরেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা ঘটে,যদিও প্রাথমিক অবস্থায় এটি সুপ্তাবস্থায় ছিল বলা হয়। এর থেকেই একের পর এক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ নামক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। সমগ্র বিশ্বব্যাপী সামন্তবাদের উপর পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিজয় এই জাতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িত। এসকল আন্দোলনের মূলে রয়েছে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের জন্য পুঁজির মালিক/বুর্জোয়াদের একটি দেশীয় বাজার দখল করা এবং কাঁচামাল বা সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র রুপে একটি ভূখণ্ড;যা রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ একটি ভূখণ্ড এবং এর সংস্কৃতি নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ঠে এক বা কাছাকাছি।

যেটা অনেক সময়ই আমাদের নজর এড়িয়ে যায় তা হল, সামাজিক বন্ধনের নীতিতে নির্মিত যে জাতীয়তাবাদ, এবং ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফ্যালিয়া চুক্তির পর থেকে অন্তত ইউরোপে প্রধানতম রাজনৈতিক সংস্থা হিসেবে যে নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠে, এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে। প্রথমটি ধর্ম, ভাষা, জাতিপরিচয় বা সংস্কৃতির মতো কিছু সমজাতীয় যোগসূত্রের মাধ্যমে নির্মিত সামাজিক গোষ্ঠী। পরেরটি হল একটি রাজনৈতিক কৌম, যেখানে রাষ্ট্রই কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু তার সামাজিক জাতিপরিচয় কোন একক সূত্রে বাঁধা। নেশন-স্টেটের এই ইউরোপীয় ধারণাটি, যেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী একত্রিত হয়, ইতিহাসে ক্রমশ সেটিই হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদের প্রধানতম ধারণার ভিত্তি।

জুম্ম জাতীয়তাবাদ:
জুম্মজাতীয়তাবাদ এখানে দুটি শব্দ, একটি জুম্ম দ্বিতীয়টি জাতীয়তাবাদ। এই দুটি শব্দ নিয়ে হল জুম্মজাতীয়তাবাদ। জুম থেকে জুম্ম শব্দের উৎপত্তি। যারা জুমচাষ করে তারা পাহাড়ি বা জুম্ম হিসেবে পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাংখো, খুমি, লুসাই, ম্রো, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খেয়াং, চাক, ত্রিপুরা, চাকমা এরা সবাই জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এখনও জুম্মরা এই জুমচাষ পেশার উপর নির্ভরশীল। সমাজের মূল কাঠামো হল অর্থনীতি। এই অর্থনীতির উপর ভিত্তি করেই সমাজে বসবাসরত মানুষের চিন্তাধারা গড়ে ওঠে,তাদের ঐক্যতা,বিভেদ্যতা ইত্যাদি প্রকাশ পায়। এর উপর ভিত্তি করেই তার সামাজিক,সাংস্কৃতিক এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক ভিত গড়ে ওঠে। বিভিন্ন যুগে মানুষ বিভিন্ন উৎপাদন ব্যাবস্থার সাথে জড়িত ছিল। সরল উৎপাদন ব্যাবস্থা থেকে শুরু করে বৃহৎ পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যাবস্থা,এই দীর্ঘবঐতিহাসিক পথপরিক্রমায় মানুষের চিন্তাধারা এবং তাদের সামাজিক,রাজনৈতিক চরিত্রও বিভিন্নভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠী যেহেতু জুমচাষের একই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সেহেতু এই উৎপাদনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের মধ্যেকার সবচেয়ে ঐক্যতা খুঁজে পায়। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল জুম্ম জনগোষ্ঠী বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠী দ্বারা শোষিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে। এখানেও আমরা জুম্ম জনগোষ্ঠী সকলেই এক ও অভিন্ন।

ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য রক্ষার নিমিত্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতিসমূহের যে ঐক্য চেতনা বা ভাবমানস মূলতঃ সেটিই জুম্ম জাতীয়তাবাদ। জুম্ম জাতীয়তাবাদ কোন উগ্র জাতীয়তাবাদ নয়। বরং উগ্র জাতীয়তাবাদ মোকাবেলা করার জন্য জুম্ম জাতীয়তাবাদ জুম্ম জনগণের এক ও ঐক্য চেতনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আবার মনে রাখতে হবে, জুম্ম জাতীয়তাবাদ কোন সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয় অর্থাৎ কোন বিচ্ছিন্ন বা অনৈক্য চিন্তা চেতনা নয়। বরং আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িরা সবাই জুম্ম এই চিন্তা ও চেতনার ভিত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ ভাবমানস তৈরি করার নামই হল জুম্ম জাতীয়তাবাদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ সাধন করাই জুম্ম জাতীয়তাবাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তাই আসুন, দ্বিধাদ্বন্দে না থেকে জুম্ম জাতীয়তাবাদের আদর্শিক চেতনায় সুসজ্জিত হয়ে আমরা সংগ্রামে সামিল হই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিসমূহের মধ্যেকার ভেদাভেদ, নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে জুম্ম জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল বলেই সকলেই সচেতনভাবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিসমূহের মধ্যেকার জাতিতে জাতিতে, ধর্মে-ধর্মে ভেদাভেদ দূরীকরণে এই প্রগতিশীল জুম্ম জাতীয়তাবাদ সব সময় সোচ্চার থেকেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা বিকাশের লক্ষ্যে এই জুম্ম জাতীয়তাবাদ ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এসেছিল। রাজনৈতিগতভাবে সচেতন ও সংগ্রামী করা, সমাজে প্রতিটি পরিবার অর্থনীতিতে আত্মনির্ভরশীল হলে জুম্ম জনগণের অর্থনৈতিক বিকাশ সাধনের ভিত্তিভূমি প্রতিষ্ঠা পাবে, এজন্যই প্রত্যেকের ভূমি অধিকার ও মালিকানা নিশ্চিত করতে জুম্ম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয়েছে। এছাড়াও সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা গঠন ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উন্নত মূল্যবোধ, উন্নত আচার-আচরণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জুম্ম জাতীয়তাবাদ এগিয়ে এসেছে। তারপর ধর্মীয় সম্প্রসারণবাদ, ভূ-খণ্ড সম্প্রসারণবাদ ও অন্যায়ভাবে সম্প্রসারণ ও অবৈধভাবে সম্প্রসারণ এবং অন্ধভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস ও অপর জাতির উপর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করার জন্য এই জুম্ম জাতীয়তাবাদ জন্মলাভ করেছে।

জুম্ম জাতীয় চেতনা থেকেই জুম্ম জাতীয়তাবাদ শব্দের উৎপত্তি। যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুম নির্ভর উৎপাদন ব্যাবস্থার দ্বারা অর্থনৈতিক জীবনধারা এবং ঐতিহাসিকভাবে পশ্চাৎপদ এক সামন্তয়ী শাসন-শোষণের অবসান তথা বিজাতীয় শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির জন্য একই রাজনৈতিক আকাঙ্খা। ধীরে ধীরে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসার লাভ করায় সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য সমাজে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। বুর্জোয়া অর্থনৈতিক প্রভাব ও সার্বিকভাবে জুম্ম সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এভাবে কালের আবর্তনের পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন হতে থাকে, কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোতে আবদ্ধ জুম্ম সমাজ বুর্জোয়া অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে পাল্লা দিতে অথবা খাপ খাইয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়ে উঠেনি। তাই আরও অধিকতরভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে জটিল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। যেহেতু জুম্ম সমাজ সবদিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া, শিক্ষা, সংস্কৃতি, আর্থিক দিক দিয়ে অনুন্নত, লোক সংখ্যা অত্যন্ত কম এবং জন্মভূমিও ক্ষুদ্র, সেহেতু জুম্ম সমাজ সবদিক দিয়ে পরনির্ভরশীল। এমন নির্ভরশীল জাতি পৃথিবীতে খুব কমই রয়েছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই জাতীয় চেতনার উন্মেষ ততটা উল্লেখযোগ্য নয়। জাতীয় চেতনার উন্মেষ উল্লেখযোগ্য ভাবে না ঘটলেও যেহেতু জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব আজ বিলুপ্তির পথে সেহেতু জুম্ম সমাজের বিরাট অংশ আজ জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। মিজোরামের মিজোদের ক্ষেত্রে যদি দেখি,তাহলে সেখানে দেখা যায় যে মিজোরামের প্রধান সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠী লুসাই এবং লুসাই ছাড়াও এখানে পাংখো,লাই,কুকি,মারা প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। মূলত মিজো ভাষা বলতে সংখ্যাগরিষ্ট লুসাইদের ভাষাকেই বুঝানো হয়,তবে কালক্রমে এ ভাষার সাথে মারা,লাই,প্রভৃতি ভাষারও মিশ্রণ ঘটেছে। কিন্তু জাতিগতভাবে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির অধিকারী হলেও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে তারা একই বন্ধনে আবদ্ধ আর এই বন্ধনই তাদেরকে মিজো হিসেবে একটি স্বতন্ত্র জাতীয়তাবোধর জন্ম দিয়েছে। তাই মিজো বললে কেবল লুসাইদেরকে বুঝানো হয় না,বরং মিজোরামে বসবাসরত লুসাই ভিন্ন পাংখো,বম,লাই,প্রভৃতি জনগোষ্ঠীকেও বুঝানো হয়ে থাকে।

পার্বত্য চটগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিবেশ দ্বারা গঠিত অঞ্চল। এতদঞ্চলের ভিন্ন ভাষাভাষি জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলের বৈচিত্র্যটাকে এক বিশেষ মর্যাদা দান করেছে। যাদের অর্থনৈতিক জীবনধারা একই ধারায় প্রবাহিত,এবং এই অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যাবস্থা থেকেই তাদের সাংস্কৃতিক এবং আত্মিক মিল লক্ষ্য করা যায়। যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চলের মানুষ শাসন-শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আসছে। নিজেদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যতা থাকলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যুগে তাদেরকে সমষ্টিগতভাবে ভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে। কখনও হিল পিপলস,কখনও ট্রাইব,কখনও পাহাড়ী ইত্যাদি। এবং পরিশেষে “জুম্ম” জাতি হিসেবে পরিচিতি দান,যার উদ্ভব এক সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বন্ধন থেকেই। বস্তুতঃ জুম্ম শব্দটি চাকমা হলেও এর ব্যাপ্তি কেবল চাকমা জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,এর দ্বারা পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভাষি প্রত্যেকটি জনগোষ্ঠীকেই বুঝানো হয়। নৃ-তাত্ত্বিক দিক থেকে এর বিচার ভিন্ন হতে পারে,তবে “জুম্ম” শব্দের উৎপত্তি কেবলমাত্র নৃ-তাত্ত্বিক নয়। এর পশ্চাতে রয়েছে সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের এক অনন্য ইতিহাস। প্রথমেই উল্লেখ করেছি,জুম্ম শব্দের অর্থ জুমচাষী নয়,এর বিশদ অর্থ হচ্ছে “পাহাড়ের অধিবাসী”। তাই এখানে কেবলমাত্র একটিমাত্র জনগোষ্ঠী(চাকমা) কে বুঝানোর কোন প্রশ্নই ওঠে না। বলা যায়,চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যাগরিষ্ট,সেইজন্যেই শব্দটি চাকমা ভাষা থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। কিন্তু একথাও স্বীকার্য যে,এই শব্দটি দ্বারা পার্বত্য চটগ্রামে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভাষি ১৪ টি জাতিগোষ্ঠীরই এক আত্মিক বন্ধনকেই প্রকাশ করা হয়েছে। নিজেদেরকে স্বতন্ত্র হিসেবে দাবী করার মধ্যদিয়ে,এক ঐক্যবদ্ধ জাতীয় চেতনা থেকেই জুম্ম জাতীয়তাবাদ শব্দের উৎপত্তি৷

আগেই বলেছিলাম,জাতীয়তাবাদের দুটি দিক থাকে। প্রথমটি,এর উগ্রতা অর্থাৎ উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং অপরটি হচ্ছে সংকীর্ণতা অর্থাৎ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ। উগ্র জাতীয়তাবাদের দ্বারা নিজ জাতি শ্রেষ্ঠ,নিজ জাতি মহান,অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী নিচ,হীন ইত্যাদি ধারণা পোষণ করা হয়। এর দ্বারাই এক জাতি অপর জাতির উপর আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়,অর্থনৈতিক এবং রাজনৈিকভাবে পচাৎপদ জাতিসমূহকে অধীনস্থ করে রাখার মানসিকতা তৈরি হয়,যার দরুণ শাসন-শোষণ করার এক উগ্র মানসিকতার উদ্ভব ঘটে। ঠিক যেমনটা আমরা লক্ষ্য করি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হিটলারের সেই জার্মান জাতীয়তাবাদকে। যা জার্মান জাতিকে এক মরনোত্তর যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে সমগ্র বিশ্বকে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ দান করে।

অপরদিকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ একটি জাতিকে সবসময় ক্ষুদ্র করে দেখার মানসিকতা তৈরি করে। নিজ জাতিকে সবসময় ছোট,হীন,বঞ্চিত,শাসিত ইত্যাদি ধারণা পোষণ করা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের লক্ষণ।

কিন্তু জুম্ম জাতীয়তাবাদের দ্বারা উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রকাশ পায় না,এটি নয় কোন একক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ। এ জাতীয়তাবাদ সংকীর্ণ এবং উগ্র এই দুইয়ের উর্ধ্বে এক আন্তর্জাতিকতাবাদ। যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত জুম্ম জনগোষ্ঠীদের এক আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করেছে,তাদেরকে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত রাখার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে। যাদের মনে এই প্রশ্ন উদয় হয়েছে যে “জুম্ম” শব্দটি চাকমা শব্দ,এবং জুম্ম জাতীয়তাবাদ কেবল চাকমা জাতীয়তাবাদ।তাদের উদ্দেশ্য বলতে চাই,শাসকগোষ্ঠীর ফাঁদে পা দিবেন না,সমগ্রকে অংশের অধীন করবেন না। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কখনও বলে নাই,জুম্ম জাতীয়তাবাদ কেবল চাকমাদের জাতীয়তাবাদ। পার্বত্য চটগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষি জাতিসমূহের মধ্যেকার ভেদাভেদ,নিপীড়ন,শোষণ ও বঞ্চণা দূরীকরণ,জনসংহতি সমিতির একটি অন্যতম লক্ষ্য। এখানে এককভাবে কোন জাতিগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয় নাই। জুম্ম জাতীয়তাবাদ নিয়ে যাদের মাথা চুলকায়,আপনারা নিজেদের সংকীর্ণতা ত্যাগ করুন। শাসকগোষ্ঠী বরাবরই তার “ডিভাইড এন্ড রুলস” পলিসি বাস্তবায়নে সদা-সর্বদা তৎপর,এই অবস্থায় কোন একক জাতি,একক সম্প্রদায় নিয়ে কথা বলার কোন যৌক্তিকতা থাকতে পারে না,যদি সেটা সামগ্রিকভাবে সমগ্র জুম্ম জনগোষ্ঠীর হুমকীর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জুম্ম জাতীয়তাবাদ হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্যাতিত ও নিপীড়ত মানুষের অধিকার আদায়ের এক চাবিকাটির নাম। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের বাঙালী জাতীয়তাবাদ উগ্র জাতীয়তাবাদে পরিণত হয়ে বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালী ভিন্ন অন্যান্য জাতিসমূহের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে,তাদেরকে বাঙালী হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রাখে। জুম্ম জাতীয়তাবাদ কেবলমাত্র এই উগ্র জাতীয়তাবাদের কাউন্টার ন্যারেটিভ নয়,এটি ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্খা,ভিন্ন ভাষাভাষী ১৪টি জনগোষ্ঠীর আত্মিক বন্ধন,সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শৃঙ্খল এটি।

সুহৃদ চাকমা ও সঞ্চারণ চাকমা; পাহাড়ের আদিবাসী অধিকার কর্মী।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *