জুম পাহাড়ের কান্না ও আগ্রাসনের রাজনীতিঃ সঞ্চারণ চাকমা

পাহাড়ের টানে যারা পাহাড়ে ঘুরতে আসে,তাদের চোখে পাহাড়ের সৌন্দর্য্যটুকুই কেবল চোখে পড়ে। কিন্তু এখানেই এর শেষ নয়। এর বাইরের যে দিকটি রয়েছে,সেটি কোন পর্যটকরেই নজর কাড়ে না। পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষগুলোর ভেতরের আর্তনাদের চিৎকারগুলো,তাদের হৃদয়ের অভিব্যক্তিগুলো গুমড়ে গুমড়ে পড়ে থাকে আপন আপন গৃহেই। একটা শ্রেণী এসে যখন পাহাড়ে আনন্দ-হিল্লোলে মেতে ওঠে,পাহাড়ের মানুষগুলো তখন মুখ ফিরিয়ে চোখের জল ফেলে। এই দৃশ্যটা কিন্তু কোন ক্যামেরাতেই ধরা পড়ে না। নীরবে-নিবৃতে এই ঘটনাগুলো চলমান রয়েছে সেই সময় থেকে,যবে থেকে রাষ্ট্র এখানকার পাহাড়ীদের উন্নয়নের জোয়ারে ভাসানোর প্রচেষ্টা শুরু করেছে,পাহাড়ের চেরাগের আলোকে যেদিন বিজলী বাতিতে পরিণত করার পায়তারা শুরু করা হয়েছে,সেইদিন থেকে। বস্তুতঃ দেশবিভাগের সময় অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভূক্ত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে,পাকিস্তান সরকার প্রথমদিকে পাহাড়ীদের আপন করে নেওয়ার প্রচেষ্টা করলেও কিছু সময় পরেই পাহাড়ীদের সন্দেহ করা শুরু করে। পাহাড়ীদেরকে পাকিস্তানের জন্য হুমকি হিসেবে মনে করতে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে এই অঞ্চলের মেরুদন্ডকে ভেঙে দেয়া হয়। এই বাঁধের ফলে পাহাড়ের আদিবাসীরা বিজলী বাতির আলো পাবে বলে মিথ্যার বুলি আওড়ানো হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর পিছনে অতি সুক্ষ এক মেকানিজম কাজ করেছিল,যার উদ্দেশ্য পাহাড়ীদের একটি অংশকে তৎক্ষণাৎ দেশত্যাগে বাধ্য করা এবং পর্যটনের অপার সম্ভাবনার দূয়ার খুলে দিয়ে অবশিষ্ট অংশটিকে স্লো পয়জনিং এর দ্বারা উদ্ভাস্তুতে পরিণত করে অবশেষে দেশান্তরকরণের হীন পায়তারা। শেষোক্তটি বর্তমান সময়ে খুবই জাঁকজমকভাবে চলমান রয়েছে। একইভাবে ১৯৫৪ সালের দিকে কর্ণফুলি পেপার মিলের কথাও আমরা জানি,যেখানে বলা হয়েছিল পাহাড়ীদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে,কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসীদের সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য জাতিসংঘ ১৯৫৭ সালে “ইন্ডিজেনাস এন্ড ট্রাইবাল পপুলেশন কনভেনশন(কনভেনশন নং ১০৭)” গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের ২২ জুন, বাংলাদেশ সেই “আইএলও” কনভেনশন নং ১০৭ এ অনুস্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে কনভেনশন নং ১০৭ এর সংশোধিত সংস্করণ কনভেনশন নং-১৬৯ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কনভেনশন নং-১৬৯ এ অনুস্বাক্ষর করা হয় নি। আন্তর্জাতিক এই আইনটিতে আদিবাসীদের প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও একই আইনে তাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নিরাপত্তার কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে ২০০৭ সালে ঘোষিত “আদিবাসী অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘেষণাপত্র”-তেও বাংলাদেশ সমর্থন দানে বিরত থাকে। তাদের জবাব ছিল এই যে,যেহেতু বাংলাদেশে এই মুহুর্তে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় নেই,তাই তারা বিষয়টিকে আপাতত স্থগিত রাখছে। জাতীয় আইনসমুহে যা কিছুই লেখা হোক না বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক)-তে “রাষ্ট্র বাংলাদেশে বসবাসরত উপজাতি,ক্ষুদ্র-জাতিসত্ত্বা,নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি সংরক্ষণ করিবে” মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও তাদের স্বীকৃতির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত অবস্থায় রেখে দিয়েছে রাষ্ট্র এবং ২০১১ সালে এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে “আদিবাসী” শব্দটি ব্যবহার করতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু ২০১১ সালের আগে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে আদিবাসী দিবসের শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বের আদিবাসীদের উদ্দেশ্য শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছেন। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতেও পাহাড়ীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি স্বরুপ ভূমি সমস্যা সনাধানকল্পে এতদঞ্চলের রীতি-নীতি ও পদ্ধতিকে আমলে নিয়ে ভূমি কমিশন আইন করা করা হয়েছে। এছাড়াও সংবিধানের ২৮(৪)-এ অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়নের ক্ষমতাও রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে।

উপরোক্ত সবকটি আইনে আদিবাসীদের প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকার,সাংস্কৃতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক অধিকারকে স্বীকার করা হয়েছে। এছাড়া ১৯০০ সালের শাসনবিধি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভূমি অধিকারকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী সময়ে যে “ইনার লাইন পারমিট” ব্যবস্থা হিল ট্র্যাক্টস-এ চালু ছিল,পার্বত্য চুক্তিতে অনেকটা পরোক্ষভাবে সেটিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পার্বত্য চুক্তির (খ) খন্ডের ২৬(ক) এবং (খ) তে উল্লেখ করা হয়েছে যে,”আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন,পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোন জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বোনুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্ররদানসহ বন্দোবস্ত,ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাইবে না। এবং
“আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন,পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি,পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সাথে আলোচনা ও ইহার সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাইবে না।”
তদুপুরি,পার্বত্য চট্টগ্রামে জায়গা-জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কিংবা বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে এতদঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দাদেরকে অধিকার দেয়া হয়েছে,যাতে বাইরের কেউ এসে এখানে জায়গা-জমি ক্রয় করতে না পারে। তার জন্য চুক্তির (খ) খন্ডের ৩ নং ধারায় বলা হয়েছে যে,অউপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা বলিতে যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্টভাবে বসবাস করেন,তাহাকে বুঝাইবে।
এবং এই সম্পর্কিত স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌরসভার চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট দাখিলের সাপেক্ষে কোন ব্যাক্তি অ-উপজাতীয় কিনা তা সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ স্থির করিবেন” মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু সম্প্রতি ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয় যে,বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে সিকদার গ্রুপ,নিরাপত্তা বাহিনীর কল্যাণ সংস্থা এবং আর এন্ড আর হোল্ডিংস লিমিটেড এর যৌথ অর্থায়নে একটি পাঁচ তারকা ম্যারিয়ট হোটেল নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। ৩৫ বছরের চুক্তির আওতায় তারা এই প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে বলেও জানা গেছে। শুধু হোটেলেরই মধ্যেই কেবল এটি সীমাবদ্ধ নয়,এর বাইরে রয়েছে আমোদ-প্রমোদ উদ্যান,যেটিকে তারা বলে “অ্যামিউজমেন্ট পার্ক”। তারা সেখানে এক পাহাড়ের চুড়া থেকে আরেক পাহাড়ের চুড়াকে কেবল কারের আওতায় নিবে বলে জানিয়েছে। এছাড়া ম্যারিয়ট হোটেল এবং এই কথিত অ্যামিউজমেন্ট পার্কে পানির সুব্যাবস্থা করার জন্য ঝিড়ি-ঝর্ণাতে বাধ দেওয়ার কথাও জানা গেছে। বান্দরবানের অপরুপ সৌন্দর্য্য দেখার জন্যই নাকি এই সুব্যবস্থা। এই পাঁচ তারকা হোটেলের বিরুদ্ধে গত ০৭ অক্টোবর ২০২০ তারিখে চিম্বুক পাহাড়ে বসবাসরত আদিবাসীদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। তৎপরবর্তী ০৮ নভেম্বর একই দাবিতে স্থানীয় ম্রো জনগোষ্টী ” কালচারাল শোডাউন” করে পাঁচ তারকা হোটেল স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু জানা গেছে,এইসব স্মারকলিপি এবং শোডাউনের পরপরই বরং হোটেল নির্মাণের কাজ আরও জোরে সোরে চালানো হচ্ছে।

উক্ত হোটেলের ফলে কাপ্রু পাড়া থেকে জীবননগর পর্যন্ত ৬টি গ্রাম প্রত্যক্ষভাবে উচ্ছেদের শিকার হবে এবং ৭০-১১৬টি গ্রাম পরোক্ষভাবে উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়বে। যদিও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কেবল ১০-২০ একর ভূমি অধিগ্রহণের কথা বলা হচ্ছে,কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১ হাজার একর ভূমি এই প্রকল্পের আওতায় পড়বে। কেননা এই পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের ফলে নিকটবর্তী পাহাড়ী গ্রামগুলোতে পানির সংকট,জুমভূমি ধ্বংস,পাহাড় কর্টন,জীবন ও জীবিকার উপর প্রভাব এবং সর্বোপরি এক অনিশ্চিত জীবন যাপনের ভয়ানক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে।

ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সিকদার গ্রুপ এবং জেলা পরিষদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কথা জানা গেলেও একথা অত্যান্ত স্পষ্ট যে,একটি অনির্বাচিত জেলা পরিষদ কখনোই জনকল্যাণমূলক কাজ করতেই পারে না। বস্তুতপক্ষে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে বর্তমানে এক একটি দলীয় পরিষদে পরিণত করা হয়েছে। ৫ সদস্যবিশিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদকে ১৫ সদস্যতে উন্নীত করে দূর্নীতির পথকে আরো প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং,ক্ষমতায় যখন একটি অনির্বাচিত এবং অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ রয়েছে,সেই পরিষদের কার্যাবলি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই যায়। অর্থাৎ, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলেই পাহাড়ের এই ভূমি দখলের ঘটনাগুলো ঘটছে। সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৪ সালে স্থানীয় পর্যটন বিষয়টি জেলা পরিষদে হস্তান্তর করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সম্পূর্ণ ছিল না। বলা যায় যথাযথভাবে সরকার সেটি হস্তান্তর করে নি এবং সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা সরকারের ছিল না এবং বর্তমানেও নেই বললে ভুল হবে না।

প্রসঙ্গত সরকারের পক্ষ থেকে এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয়েছে যে,তারা কারো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ভূমি অধিগ্রহণ করে নি। বরং খাস জমিই তারা দখল করে এই ম্যারিয়ট হোটেল নির্মাণ করছে। এখানে স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে,পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন খাস জমি নেই। যা আছে সেগুলো হচ্ছে,পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রথাগত জুমভূমি বা মৌজাভূমি। পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়েক ধরনের মালিকানা রয়েছে,
১. ব্যাক্তিগত রেকর্ডভূক্ত(অতি অল্প সংখ্যাক)
২. ব্যাক্তিগত দখলে আছে,কিন্তু রেকর্ডভূক্ত নয়
৩. সমষ্টিগত দখলে এবং
৪. মৌজাভূমি বা জুমভূমি ইত্যাদি।

অর্থাৎ এখানে প্রথাগত ভূমি অধিকারটাই বেশি প্রণিধানযোগ্য। এখানে কাগজপত্রের চেয়ে ঐতিহ্যগত ও প্রথাগত ভূমি অধিকারই বেশি গ্রহণযোগ্য। সুতরাং,যে জায়গাটিকে সরকার কিংবা সিকদার গ্রুপ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কল্যাণ সংস্থা “খাস” বলে অভিহিত করছে,সেটি প্রথাগতভবে সমষ্টিগত মালিকানার অধীন।

পার্বত্য ভূমি কামিশন আইনেও এই প্রথাগত ভূমি অধকারকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে আইএলও কনভেনশন নং-১০৭(যেটিতে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেছে) এর ১১ অনুচ্ছেদে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগতভাবে অধিকৃত ভূমির উপর যৌথ কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার স্বীকার করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া একই আইনের ১২নং অনুচ্ছেদে “আদিবাসীদের সম্মতি ব্যতিরেকে কোন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের জন্য জোরপূর্বক তাদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুরুপভাবে,২০০৭ সালে ঘোষিত “আদিবাসী অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের” অনুচ্ছেদ-৮,অনুচ্ছেদ-১০,১৯,২৫,২৬,২৭,২৮ এবং অনুচ্ছেদ-৩২ এ,ভূমি ও ভূখন্ডের উপর অধিকারকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। সেই সাথে তাদের ভোগদখলে থাকা ভূমিতে প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত জীবনচর্চা,পরিবেশ সংরক্ষণ,প্রকৃতিক সম্পদের উপর অধিকার এবং উন্নয়নের অধিকার,সামরিক কার্যক্রম বন্ধের অধিকার রয়েছে বলেও উক্ত ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে। এবং সেইসাথে রাষ্ট্র কিংবা কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জোরপূর্বক উচ্ছেদ হওয়া থেকে রেহাই পাওয়ারও অধিকার রয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য যে,রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকা সরকার বরাবরই আইন লঙ্ঘন করে পাহাড়ী উচ্ছেদের উন্মত্ততায় মেতে উঠছে। এখানে পর্যটন কিংবা আর্থসামাজিক উন্নয়ন এই কথাগুলো কেবল বাইরের এক খোলস মাত্র। এর ভেতরে রয়েছে রাজনৈতিকভাবে জুম্ম জনগণকে বশ করে রাখা,জুম্ম জনগণের যে রাজনৈতিক অধিকার,সেটিকে উপেক্ষিত অবস্থায় রেখে দিয়ে উন্নয়নের বন্যা বইয়ে দেয়া। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বরাবরই দাবী করা হয়,পাহাড়ে উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু সেটি কিসের উন্নয়ন? কার স্বার্থের উন্নয়ন? ভূমি দখল কিংবা জীবন-জীবিকার উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে কি প্রকারে উন্নয়ন হয়,সেটা আমার বোধগম্যতার বাইরে। প্রকৃতপক্ষে,যা হয় সেটি কেবল পাহাড়ী উচ্ছেদের উন্নয়ন,ভূমি দখলের উন্নয়ন। পাহাড়ীদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্র তারপরেও বারবার উন্নয়নের বুলি কপচায়।

পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে যখনই রাষ্ট্র কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেয়া হয়,তখন তারা কথায় কথায় ইকো-ট্যুরিজম এবং কমিউনিটি ট্যুরিজমের কথা বলে। ইকো-ট্যুরিজমের অর্থ হচ্ছে ইকোলজিক্যাল সিস্টেমকে অক্ষত অবস্থায় রেখে পর্যটন গড়ে তোলা। আর কমিউনিটি ট্যুরিজমের মূল কথা হচ্ছ,স্থানীয় ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে সংরক্ষণ করা। দেশীয় ও লোকজ সংস্কৃতির মাধ্যমে আমাদের দেশীয় নিজস্বতাকে তুলে ধরা। স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সম্পর্ক গড়ে তোলার পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে পর্যটন উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা। একটি এলাকায় পর্যটকদের বিভিন্ন সেবার প্রয়োজন হয়। এগুলো স্থানীয় উৎস থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা সংকুলান করবেন। এটা বিচ্ছিন্নভাবে না হয়ে সংগঠিত ও দায়িত্বপূর্ণভাবে করা হবে। এটাই হলো কমিউনিটি ট্যুরিজম বা সিবিটির মূল কথা। সিবিটির মাধ্যমে শুধু ট্যুরিস্ট কল্যাণ হবে না, এলাকার এবং এলাকার মানুষের আর্থিক কল্যাণও সাধিত হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে ইকো-ট্যুরিজম এবং কমিউনিটি ট্যুরিজম বিষয়ে গালভরা যতসব বুলি শুনতে পাওয়া যায় ঠিকই,তবে বাস্তব ক্ষেত্রে যা ঘটে তা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত। স্থানীয় অধিবাসীদের সংস্কৃতি ও অর্থনৈতি জীবনধারাকে অক্ষুন্ন রাখা এবং এর পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে অক্ষত রাখার পরিবর্তে স্থানীয়দের উচ্ছেদের শিকার হতে হয়। আর কর্মসংস্থানের কথাই যদি বলি,পর্যটনের কারণেই যখন স্থানীয়রা নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়,সেখানে কর্মসংস্থান তো বহুদূরের কথা। পার্বত্য চট্টগ্রামের যেসমস্ত জায়গায় পর্যটন গড়ে তোলা হয়েছে বা হচ্ছে সেখানে তারা স্থানীয় আদিবাসীদের রাখা নামগুলো পাল্টিয়ে নিজেদের ইচ্ছামাফিক বাঙালিসুলভ নাম রেখে দিচ্ছে। কোথাও বা স্থানীয়দের চলাফেরার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধও করা হচ্ছে। বনভূমি ধ্বংস করে এসব পর্যটন হওয়ার ফলে,পাহাড়ীদের সাংস্কৃিতক বৈচিত্র্য(তাদের পরিধেয় বস্ত্র) ধ্বংসের মুখে পড়ছে। কেননা পাহাড়ীরা তাদের পরিধেয় বস্ত্রগুলো তৈরি করতে বন আর পাহাড়ের উপর নির্ভরশীল। পাহাড় কেটে কিংবা দখল করে পর্যটন হচ্ছে,যার ফলে পাহাড়ীদের জুমভূমি দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে তাদের জীবিকা নির্বাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। ঝিরি-ঝর্ণাতে বাঁধ দেয়ার ফলে সুপেয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে এবং নিরাপদ পানির অভাবে বিভিন্ন রোগের প্রাদূর্ভাব দেখা দিচ্ছে,ফলশ্রুতিতে দেশান্তরের ঝোঁক দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চ শব্দে গান-বাজনা ও গাড়ির হর্ণ পাহাড়ীদের স্বাভাবিক জীবনধারায় ব্যঘাত ঘটাচ্ছে,ইত্যাদি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতলের আদিবাসীদের বেলায় আমরা এই চিত্রটিকেই দেখি। তাছাড়া,পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রের সাথে রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকা বিশেষ বাহিনী জড়িত। বস্তুতপক্ষে, তাদের কাজ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা হলেও বর্তমানে সেটি ব্যবসাকেন্দ্রিক বলেই মনে হয়। তথাপি,এই পর্যটনের সাথে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশের বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে বহিরগাতদের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং সেই সাথে ইসলামীকরণের কাজটিও অনেকটা সহজেই সম্পন্ন হয়। ফলশ্রুতিতে এই পর্যটন কেন্দ্রগুলোই পরবর্তীতে একেকটা রাজনৈতিক ক্ষেত্রতে পরিণত হবে না,এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। প্রতিনিয়ত এভাবে ভূমি দখল এবং পাহাড়ী উচ্ছেদের ফলে একটা সময়ে পাহাড়ে আর পাহাড়ীদেরকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না এবং যখনই এই বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়াবে তখনই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পলিসি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হবে। অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম মুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিণত হবে। পাহাড়ী বিহীন পাহাড়ে পাহাড়ীরা তখন জাদুঘরের কোণায় স্থান পাবে।

লেখক, পাহাড়ের আদিবাসী অধিকার কর্মী।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *