মানবতাহীন রাষ্ট্র ও চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো আদিবাসীদের কান্না! – সুহৃদ চাকমা

রাষ্ট্র আজও চিম্বুক পাহাড়ের কান্না শুনেনি এবং পিছিয়ে পড়া ম্রো জনগোষ্ঠীর সুখে-দুঃখে রাষ্ট্র আজও নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করছে। সিকদার গ্রুপ-আর এন্ড আর হোল্ডিংস কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় একটি বাহিনীর যোগসাজশে চিম্বুক পাহাড়কে দখলে নিচ্ছে অথচ রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের একটা টু শব্দও নেই। চিম্বুক পাহাড়ের কান্না আজ চিম্বুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই কান্না চিম্বুক পাহাড়ের সীমানা ছাড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমগ্র দেশবাসীর কানে গিয়ে পৌঁছেছে। অথচ তাদের এই কান্না থামানোর যথাযথ ব্যবস্থা রাষ্ট্র চাইলে করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র তা মোটেই করবে না। কারণ, এই রাষ্ট্র তো নিপীড়িত ও শোষিত জনগণের রাষ্ট্র নয়, এটা পুঁজিপতি ও ধনীদেরই রাষ্ট্র এবং দেশের মধ্যে একটা প্রচন্ড ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী কর্তৃক এই রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। দেশের মধ্যে মূল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যারা রয়েছে পাহাড়ের বুকে তাদেরই কেবল জয়জয়কার। তাদের বিরুদ্ধে এদেশে কথা বলা যাবে না, চিম্বুক পাহাড় দখলে যাদের নাম একেবারেই সামনে সারিতে থাকবার কথা দৈনিক সংবাদপত্রের কলাম খুললে তা নেই! দৈনিক সংবাদপত্রের শিরোনাম হওয়ার কথা তাদেরকে কেন্দ্র করে কিন্তু সেখানে শিরোনাম হয় কেবল সিকদার গ্রুপ। এটাই বাংলাদেশ! তাহলে নিপীড়িত, শোষিত ও বঞ্চিত ম্রো জনগোষ্ঠীর পাশে রাষ্ট্র দাঁড়ানোর প্রশ্নই আসছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের দশ ভাষাভাষী ১৪টি জুম্ম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া একটি জুম্ম জনগোষ্ঠীর নাম হলো ম্রো জনগোষ্ঠী, যারা বান্দরবান জেলাধীন চিম্বুক পাহাড়সহ বান্দরবানে বিভিন্ন উপজেলায় যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে। এই চিম্বুকের পাদদেশে ম্রো জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদেরই ভিটেমাটি। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর একশ্রেণির কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের লোলুপতার কারণে আজ ম্রো জনগোষ্ঠীরা নিজেদের ভিটেমাটি হারাতে বসেছে। যে চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশে ম্রো জনগোষ্ঠীরা নিজেদেরকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত মনে করতো সেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এমন লোলুপদৃষ্টি ম্রো জনগোষ্ঠী মানুষদের হতাশ করছে। তারা আজ স্বভূমি থেকে উচ্ছেদের ভয় ও আতংকের মধ্যে বসবাস করছে। মানবতাহীন রাষ্ট্রের চিম্বুক পাহাড়ের কান্না শুনার তেমন কোন মানসিকতা নেই।

চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশে ম্রো জনগোষ্ঠীদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং যাবতীয় জীবনধারা ও তাদের অনাগত দিনের স্বপ্ন আজ চিরতরে ধ্বংস করার চক্রান্ত চলছে। চিম্বুক পাহাড়ের কোলে কান পেতে শুনলে ম্রো জনগোষ্ঠীর ক্রন্দনধ্বনি ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট চিৎকার আজ প্রকটভাবে শুনা যায়। অসহায় ম্রো জনগোষ্ঠীর যে অঝোর ধারার কান্না আজ শুধুমাত্র চিম্বুক পাহাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এই কান্না ছড়িয়ে পড়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশের আনাচ-কানাচে। চিম্বুকে ম্রো জনগোষ্ঠীর অভিন্ন ধারায় প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে, তাদের অব্যক্ত বেদনা ও যন্ত্রণাকে সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীতে বাঁশির সুরে প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে এবং দেশের রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ হচ্ছে, লাইভ টকশোতে আলোচনা হচ্ছে ব্যাপকভাবে। সেই আলোচনা থেকে প্রতিরোধের কথা উঠে আসছে। কিন্তু রাষ্ট্র এখনও নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। এখন প্রশ্ন হলো এই রাষ্ট্র কাদের স্বার্থ রক্ষা করে? রাষ্ট্র কি আদৗও পিছিয়ে পড়া, নিপীড়িত ও শোষিত ম্রো জনগোষ্ঠীদের কান্না শুনতে পেয়েছে?

যদি এই ম্রো জনগোষ্ঠীর কান্না রাষ্ট্রের অবধি পৌঁছাতো তাহলে ২০০৬ সালে সুয়ালক ও টংকাবতী ইউনিয়নের ম্রো জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সাড়ে এগার হাজার একর জায়গা বেদখল হতো না, হতো না ১০টি গ্রামের অধিক ম্রো জনগোষ্ঠী স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ। ভাবলে অবাকই হবেন, চিম্বুক পাহাড়ে ভূমি আগ্রাসনের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের চিত্র একাকার হয়ে গেছে। এরই সুযোগে জুম পাহাড়ের বুকে ইসলামীকরণের সংস্কৃতি জোরদার হচ্ছে এবং তারই সুত্র ধরে শাসকগোষ্ঠী নিজের মতো করে সবকিছু বদলে দিচ্ছে। যেমন; ‘শোং নাম হুং’ কিভাবে চন্দ্রপাহাড় হয়ে যায় আর ‘তেংপ্লং চূট’ কিভাবে নীলগিরি হয়ে যায়? এধরণের হাজার হাজার আদিবাসী জুম্মদের পুরাতন জায়গার নাম পরিবর্তন করে শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছানুযায়ী ইসলামীকরণের নাম বসিয়ে দিয়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলেছে।

প্রথমে ২০০৬ সালে সুয়ালক এবং টংকাবতী ইউনিয়নে রাষ্ট্রীয় একটি বাহিনীর ট্রেনিং সেন্টারের নামে ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রায় ১১,৫০০ সাড়ে এগার হাজার পাঁচ শত একর জায়গা বেদখল করে ১০টি গ্রামের মানুষকে উচ্ছেদ করেছে। তারা চরম দুঃখ-কষ্টে অন্যত্র নতুন বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হয়। এভাবে জোরপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জায়গাজমি বেদখল করে পাহাড়ের বুকে চলছে বড় বড় কোম্পানি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, মসজিদের নামে কিংবা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্যাম্প সম্প্রসারণের নামে ভূমি আগ্রাসনের নির্মম ও নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতার মহোৎসব। ভূমি আগ্রাসনের ফলে শাসকগোষ্ঠীর লেলিয়ে দেয়া তাবেদার বাহিনী ও বহিরাগতদের একদিকে আনন্দ উল্লাস অপরদিকে ভূমিহারা ম্রো জনগোষ্ঠীর কান্নার অঝোর ধ্বনি বাজছে চিম্বুক পাহাড় জুড়ে। চিম্বুক পাহাড়ের অসহায় ম্রো জনগোষ্ঠীর যন্ত্রণাক্লিষ্ট চিৎকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে এবং তাদের এই কান্না পার্বত্য চট্টগ্রাম পেরিয়ে সারা বাংলাদেশে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ায় একাকার হয়ে গেছে। তবুও স্বার্থপর শাসকগোষ্ঠী তার দেশের অভ্যন্তরে অসহায় ও বিপন্ন ম্রো জনগোষ্ঠীর কান্না আজও শুনতে পায়নি।

এই চিম্বুক পাহাড়ের কান্না থামানোর দায়িত্ব কার? এই কান্না থামানোর দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রই কেবল চিম্বুক পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া ম্রো জনগোষ্ঠীর কান্না থামাতে পারবে। কিন্তু এবিষয়ে রাষ্ট্র তো আজও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে! ফলে রাষ্ট্রের এমন নীরবতায় ভূমিদস্যু, ডাকাত ও লুটেরা আর এন্ড আর হোল্ডিংস সিকদার গ্রুপ কোম্পানি ও নিরাপত্তা বাহিনীর কল্যান সংস্থা ভূমি বেদখলের জন্য আরও উৎসাহিত হচ্ছে বলে সহজে অনুমান করা যায়। বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি সড়কের ৪৮ কিলোমিটারে নাইতং পাহাড় সংলগ্ন কাপ্রুপাড়া, ইরাপাড়া, দোলাপাড়া ও কলাইপাড়াসহ পাশ্ববর্তী এলাকায় কয়েকশত ম্রো পরিবার শত শত বছর ধরে বসবাস ও জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এই ভূমি ম্রো জনগোষ্ঠীর চিরায়ত ভূমি। অথচ সম্প্রতি সেখানে সিকদার গ্রুপ প্রায় ১,০০০ একর ভূমি অবৈধভাবে দখল করে চন্দ্রনাথ পাহাড় নামকরণ করে আর অ্যান্ড আর হোল্ডিংস কোম্পানি বিলাসবহুল হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। ফলে সেখানকার বংশপরম্পরায় যে ম্রো’রা আছেন তারা ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। ইতিমধ্যে ম্রো জনগোষ্ঠীদের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এই নির্মাণ কাজ শুরু হলে চারটি পাড়াসহ আশেপাশের প্রায় দশ হাজার ম্রো জনগোষ্ঠী উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়বে।

‘আমরা আর এক ইঞ্চি ভূমিও দখল হতে দিবো না’ বলে হুশিয়ারী দিয়েছেন চিম্বুকের ম্রো জনগোষ্ঠীর নেতারা। গত ৮ নভেম্বর ২০২০ সকালে বান্দরবানের চিম্বুকে আয়োজিত সমাবেশ ও অন্যরকম প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীতে এই হুশিয়ারী দেন ম্রো জনগোষ্ঠীর নেতারা। চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ম্রো জুম্ম জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের ভূমি রক্ষার জন্য শাসকগোষ্ঠীর কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি ও হা-হুতাশ করছে। স্মারকলিপির মাধ্যমে আবেদন জানানো হয়েছে এবং কলম সৈনিক সাংবাদিক বন্ধুদের মাধ্যমে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে কান্নার রব পাহাড় কিংবা সমতলে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের এই কান্নার অঝোর বর্ষণে পরিণত হয়ে শঙ্খ ও মাতামুহুরি নদীর দু’কূল বেয়ে স্বাভাবিক স্রোতের দিকে বা উজানের উল্টো দিকে নেমে এসে বুড়িগঙ্গা হয়ে বঙ্গোপসাগরে পর্যন্ত মিলিত হচ্ছে। তারপরও চিম্বুক পাহাড়ের কান্না রাষ্ট্রের অবধি পৌঁছায় না এবং রাষ্ট্রের চরিত্রকে নাড়াতে পারে না। পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্র এতোটাই নির্দয় ও নির্মম আচরণ করছে, যার ফলে চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো জনগোষ্ঠীর কান্নার আর্তচিৎকারেও রাষ্ট্রের মন গলে না। এমন মানবতাহীন ও নিষ্ঠুরতম রাষ্ট্র কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই! যে বাঙালি জাতি রাষ্ট্র বা স্বাধীনতা লাভের পূর্ব মুহূর্তে মানবতা লঙ্ঘন, জাতিগত শোষণ, নিপীড়নের চরম বাস্তবতা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছে, ৩০ লক্ষ বাঙালির শহীদদের রক্ত দেখেছে, পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক নিপীড়ন, ভাষাগত, সংস্কৃতিগত ও অর্থনৈতিকগত শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্য দেখেছে, সেই রাষ্ট্র কি করে অন্য পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর প্রতি এতোটাই নির্দয়, নির্মম ও নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারে- ভাবলে অভিধানের শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। গ্রামারের থিওরিও উপেক্ষিত হয় এবং গণিতের সূত্রানুযায়ী অংকও মিলে না। তাই আজ রব উঠেছে ‘মানবতাহীন রাষ্ট্র ও চিম্বুক পাহাড়ের কান্না’র কথা।

গত ৮ নভেম্বর ২০২০ চিম্বুক পাহাড়ের কাপ্রু পাড়ায় ম্রো সম্প্রদায়ের ভূমিতে অবৈধভাবে পাঁচ তারকা ম্যারিয়ট হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনাকারী রাষ্ট্রীয় একটি বাহিনীর সংস্থা ও আর এন্ড আর হোল্ডিংস (সিকদার গ্রুপ) কোম্পানির বিরুদ্ধে কালচারাল শোডাউনের মাধ্যমে চিম্বুক ভ্যালীর সকল ম্রো অধিবাসী একত্রে প্রতিবাদে নেমেছিল। এই প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশে চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০০ জনেরও অধিক মানুষ অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। তারা দাবি করেছে অতি শীঘ্রই সরকার ও প্রশাসন যেন এই অবৈধ দখলদারিদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং তার পাশাপাশি তাদের ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও জীবিকা বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারকে অনুরোধ করে। ম্রো জনগোষ্ঠীর এই ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি সরকার কি আদৌও আন্তরিকতা প্রদর্শন করেছে? অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদেরকে বারেবারে স্মরণ করিয়ে দেয়, পাহাড়ের ক্ষেত্রে সরকার এবিষয়ে নির্বিকার, নিশ্চুপ ও বোবা-কানার ভূমিকা নিয়েছে এবং নজিরবিহীন যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আজও আমাদের চোখে পড়েনি।

অথচ স্বাধীনতার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে শাসকগোষ্ঠী ও বহিরাগত সেটেলার বাঙালিদের ভূমি বেদখলের বন্যা আর সেই বন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিপুত্ররা ভেসে গিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে, প্রতিনিয়ত ভিন্নদেশের মাটিতে দেশান্তরিত হতে হচ্ছে এবং হারিয়েছে নিজেদের ভিটেমাটি, সহায়-সম্পত্তি ও তাদের সবকিছু। শাসকগোষ্ঠীর পাইকারী হারে ভূমি বেদখল, নির্দয় সামরিক শাসন ও ইসলামীকরণের বন্যায় নাজেহাল অবস্থা সৃষ্টি করে অসহায় হয়েছে জুম্ম জনগোষ্ঠী মানুষেরা। অনেকেই হয়েছে ঘর ছাড়া, অনেকেই এলাকা ছাড়া, অনেকেই দেশছাড়া ও সর্বস্বহারা। এমতাবস্থায় পাহাড়ের জুম্ম জনগোষ্ঠীরা অসহায় ও নির্মম অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন দিনের পর দিন। চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো জুম্ম জনগোষ্ঠীও সেই শাসকগোষ্ঠীর নিষ্ঠুরতার অন্যতম শিকার। রাষ্ট্র তো চিম্বুক পাহাড়ের কান্না থামানোর দায়িত্ব নিচ্ছে না বরং উল্টো করে তার তাবেদার বাহিনী ডাকাত, লুটেরা ও ভূমিদস্যুদের লেলিয়ে দিচ্ছে। মানবতাহীন রাষ্ট্রের নির্বিকার ভূমিকা এমনটাই প্রমাণ করে।

ম্রো জনগোষ্ঠী তাদের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে। তারা কেবল খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য চিম্বুক পাহাড়কে লুটেরাদের হাত থেকে মুক্তি চেয়েছে। তারা নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সমুন্নত রেখে স্বমহিমায় চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশে নিরিবিলি জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছে। তাদের মনের আবেগ, অনুভূতি ও কান্নার চাপা গোঙানিগুলো প্রতিবাদী সমাবেশে অভিন্নভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র সেটাকে আমলে নিচ্ছে না। আজ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি অতীতের ইতিহাস ও বাংলার মানুষের ত্যাগ, রক্ত, ঘাম ও সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতাকে কালিমালিপ্ত করছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাওয়া-পরার নিশ্চয়তা বিধান করে শোষণহীন ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও রাষ্ট্র সেটা রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। যেখানে চিম্বুক পাহাড়ের একটা স্কুল নেই, সেখানে বর্তমান যুগের শিক্ষা থেকে ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বঞ্চিত এবং উন্নয়নের মহাসড়কের বাদ্যযন্ত্র বাজালেও উন্নয়নের কোন আলোই তারা পাচ্ছে না। মনে হয় যেন এই পিছিয়ে পড়া পাহাড়ী জনগোষ্ঠীদের ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলের চিড়িয়াখানা জীবের মতোই বন্দী করে রাখা হয়েছে।

১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধ আমাদের জাতীয় জীবনের মেরুদণ্ডকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীও একই কায়দায় পাহাড়ে একের পর এক ভূমি বেদখল ও উচ্ছেদের হোলিখেলায় মেঠে উঠেছে। এই ভূমি বেদখল ও উচ্ছেদ এর সমস্যা একটা জগদ্দল পাথরের মতোই আমাদের আদিবাসী জুম্মদের উপর চেপে বসে আছে। এমনিভাবেই আজও চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো আদিবাসীদের উচ্ছেদের শঙ্কায় দিন গুনতে হচ্ছে। তাদের পাশে আজ রাষ্ট্র নেই, আছে কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের অমানবিক শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের উত্তাপ। আদিবাসী ম্রো জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও মুক্তাঞ্চল এই চিম্বুক পাহাড় আর আগের মতো নেই! চিম্বুক পাহাড়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারানোর ভয় ও আতংকে ম্রো জনগোষ্ঠীরা আজ দুঃখ-কষ্ট ও কান্নাকে তাদের জীবনের সঙ্গীর নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে শাসকগোষ্ঠী বাধ্য করছে। প্রকৃতির নিয়মকে জেনে প্রকৃতির নিয়মের মধ্যেই নিজেকে গড়ে তুলবার পরিবেশকে ম্রো জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মরা আজ হারাতে বসেছে। প্রকৃতির নিয়মকে জেনে প্রকৃতির নিয়মকে বদলানো এবং প্রকৃতির নিয়মের সাথে নিজেকে খাপ-খাইয়ে চলার যোগ্যতা তাদের থেকে অন্য কেউই ভাল করে জানবে না। তাই চিম্বুক পাহাড়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে ধ্বংস করে সেখানে কৃত্রিম উপায়ে একটা ফরমালিনযুক্ত পরিবেশ তৈরি করার ষড়যন্ত্র চলছে। মানবতাহীন রাষ্ট্রের মধ্যে মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের বিকাশ ও বোধোদয় হোক এবং চিম্বুক পাহাড়ের কান্না থামানোর জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্র এগিয়ে আসুক।

সুহৃদ চাকমা- পাহাড়ের আদিবাসী অধিকার কর্মী।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *