ডলুবাড়ি ত্রিপুরা কামির শংকা- পাভেল পার্থ

প্রতিটি সন এক একটি বিশ্বচিহ্ন ধরে রাখে। ২০২০ যেমন করোনা মহামারিকাল। কিন্তু শতবছর আগে এ সময়টাতে কী ঘটেছিল? ছড়িয়ে পড়েছিল আরেক মহামারি, স্প্যানিশ ফ্লু। মহামারি তো এক স্মৃতি-বিস্মৃতির নির্দয় আখ্যান। করোনাকালে তুলাকইন্যা দেববর্মার কলিজাতেও জাগে এমন কত স্মৃতি-বিস্তৃতি। মৈলপতুইসার বনপাহাড়ে জুমআবাদের স্মৃতি। কলেরা আর বসন্ত সামালের স্মৃতি। ১৯২২ সনে গ্রামের ত্রিপুরারা মিলে মৈলপতুইসায় জারাম, তিংকাতু, গর্জন গাছের চারা বুনেছেন। ১৯২৭ সনে তৈরি হয় উপনিবেশিক বন আইন। সব ওলটপালট হয়ে যায়। মৈলপতুইসাকে ঘোষণা করা হয় ‘সংরক্ষিত বন’। বনের বুক চিরে বসে রেললাইন। উচ্ছেদ হয়ে যায় ফুলবাড়ি আর জাগছড়া ত্রিপুরা কামি। মৈলপতুইসার নাম বদলে হয়ে যায় ‘লাউয়াছড়া’। ত্রিপুরাদের ককবরক ভাষায় ‘কামি’ মানে গ্রাম। তুলাকইন্যার জন্ম মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের সদর ইউনিয়নের লাউয়াছড়া বন আর চাবাগান ঘেরা এক প্রাচীন ত্রিপুরা গ্রাম ডলুবাড়িতে। স্থাননামের আঞ্চলিক ত্রিপুরা রীতি অনুযায়ী এ অঞ্চলে ত্রিপুরা বসতিগুলোর নামে ‘বাড়ি’ শব্দখানা যুক্ত হয়। পুরানবাড়ি, দেবরাবাড়ি, ডলুবাড়ি, আশারামবাড়ি কী হালামবাড়ি। মৌলভীবাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে কুমিল্লার সীমান্ত অঞ্চল গুলো একসময় ত্রিপুরারাজ্যের অংশ ছিল। এখনো এই অঞ্চলের জনসংস্কৃতিতে এর ছাপ আছে। সীমান্তের পাহাড়টিলা অরণ্যভূমিতে ত্রিপুরারাই ছিলেন সংখ্যাধিক্য। গড়ে তুলেছিলেন এক সুপ্রাচীন জুমসভ্যতা। জুম আবাদের কারণেই ডলুবাড়িতে গড়ে ওঠেছে ত্রিপুরা গ্রাম। এখানে জুম পাহারার ঘর ‘গাইরিং’ তৈরি করতেন অনেকেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও তুলাকইন্যা মৈলপতুইসা, ডলুছড়া, জানকীছড়া, মাগুরছড়া, জাগছড়াতে জুম আবাদ করেছেন। আজ করোনাকলে সেইসব স্মৃতি কত ধারে কত চুরমার হয়ে ভাসে। তুলাকইন্যার গ্রাম ডলুবাড়ি করোনাকালে রোগ সংক্রমণ নয়, ভূমি হারানোর আরেক শংকায় অস্থির। জানা যায়, ১৫০ গৃহহীন-ভূমিহীন পরিবারের জন্য এই সুপ্রাচীন ত্রিপুরা গ্রামের প্রায় ৪ একর কৃষিজমি নেয়া হবে। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে গৃহহীন-ভূমিহীনদের জন্য রাষ্ট্রীয় এই আশ্রয়ণ প্রকল্পটি অসাধারণ। যেখানে প্রতি পরিবার নতুন ঘরসহ ৩ শতক জায়গা পাবে এবং গৃহনির্মাণবাবদ পরিবারপ্রতি ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়নে লাউয়াছড়ার মতো সংবেদনশীল বনের ধারে ত্রিপুরাদের আদিবসতির কৃষিজমি নির্বাচন সঠিক হবে না। এতে এক ভূমিহীনকে জায়গা দিতে গিয়ে আরেকজন ভূমিহীন হবে। এটি বাঙালি-আদিবাসী জটিল বিবাদের সূচনা করবে। লাউয়াছড়ার মতো সংবেদনশীল বাস্তুসংস্থানের জন্য এমন আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলি প্রতিবেশগত বিশৃখংলা তৈরি করতে পারে। ৩ নভেম্বর ২০২০ শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর ডলুবাড়ির ভূমি রক্ষার দাবিতে স্মারকলিপি পেশ করেছেন ত্রিপুরা জনগণ। ৮ নভেম্বর ‘লাউয়াছড়া বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা আন্দোলন’ এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে শ্রীমঙ্গলে মানবন্ধন করে। অবশ্যই দেশের কেউ ঘরহারা থাকবে না। সকল মানুষ পাবে এক টুকরো মাটি। একটি ঘর। কিন্তু কোনো প্রাচীন বসতি ব্যবহার করে এমন প্রকল্প কোনোভাবেই কারো জন্য স্বপ্ন-ইশারা জানাবে না। রাষ্ট্রকে ডলুছড়ার ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা জরুরি। বাংলাদেশ এক বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে ধারণ করে বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু কোনো কোনো অবিবেচক বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের চেহারাকে ¤øান করে দেয়। তুলাকইন্যার মতো কারো কারো কাছে রাষ্ট্র তখন ‘দখলদার’ আর ‘নিপীড়ক’ হয়ে ওঠে। তো ডলুবাড়ি, বিশামনি, মাগুরছড়া, বালিশিরাসহ লাউয়াছড়া অরণ্য ও আদিবাসী জীবনে এই উন্নয়নযন্ত্রণা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রশ্নহীনভাবে এ যেন ঘটেই চলছে। বিচারহীনতার দু:সহ ভার নিয়ে অস্থির এখানের অরণ্য কী আদিবাসী মানুষ। দীর্ঘসময়। চলতি আলাপখানি এই প্রশ্নহীনতাকে কিছুটা টানতে চায়, ত্রিপুরা জনইতিহাস থেকে ডলুবাড়ির সামগ্রিক সুরক্ষার জোর দাবি জানায়।

সাইমকল ও মৈলপতুইসা
নামদুটি ত্রিপুরাদের ‘ককবোরোক’ ভাষায়। ত্রিপুরাদের কাছে সাইমকল জুমআবাদের জন্য এক প্রসিদ্ধ অঞ্চল। জুম আবাদের আগে জমি নির্বাচন এক কঠিন কৃত্য। সাইমকলে আগে এক ত্রিপুরা নারী জুমআবাদ করেছিল, তিনি এই এলাকার খোঁজ অন্যদের জানান। সকল কঠিন পরীক্ষায় সাইমকল নির্বাচিত হয়। ফসল আবাদ বেশ ভাল হয়। তখন সেই নারী বলেন, দেখেছো আমার ‘সাই মকল’ মানে ‘স্বামীর চোখ’। কারণ তার স্বামী এই জায়গাটি নির্বাচন করেছিলেন। সেই থেকে ‘সাইমকল’ এলাকার বনটিলায় ত্রিপুরা গ্রাম গড়ে ওঠতে থাকে। ‘সাইমকল’ থেকেই হয়তো আজকের ‘শ্রীমঙ্গল’। যদিও ‘শ্রী’ ও ‘মঙ্গল’ নাম দুইভাইয়ের কাহিনির সাথেও জড়িয়ে আছে শ্রীমঙ্গলের স্থাননামের ইতিহাস। আর মৈলপতুইসা হলো লাউয়াছড়া বনের ত্রিপুরা নাম। তুইসা মানে পাহাড়ি ছড়া। যে বনের ছড়ার ধারের জুমে ‘মৈলপ (লাউ)’ ভাল জন্মে সেই এলাকাই ‘মৈলপতুইসা’। তো এই মৈলপতুইসার এক আদি ত্রিপুরা গ্রামই হলো বালিশিরা পাহাড়া মৌজার ডলুবাড়ি। কমলসিং ত্রিপুরা, লক্ষীরাম ত্রিপুরা, সুবলরাম ত্রিপুরা এরাই এখানকার আদিবসতি স্থাপনকারী। সুবলরামের পুত্র গৈচন্দ্র, গৈচন্দ্রের পুত্র আগন রায় দেববর্মা, আগনের পুত্র শুদ্ধুনারায়ণ দেববর্মা (সোনা রায়)। তুলাকইন্যার সাথে বিয়ে হয় সোনা রায়ের। ডলুবাড়িতে আগন রায়দের প্রায় ৪ একর জমি আছে। ত্রিপুরা রাজার অধীনে থাকা ডলুবাড়ির জমিগুলি বহুবছরের দখলিস্বত্বে একসময় ত্রিপুরাদের প্রথাগত ভূমি হয়ে যায়। এসব জমি অধিকাংশই তাদের নামে নামজারী হয়েছে, তারা নিয়মিত ভূমিকর দিয়ে আসছেন। ডলুছড়াতে সেটেলার বাঙালিদেরও দুটি গ্রাম গড়ে ওঠেছে। ১৯৬৮ সনে তৎকালিন বর্ণবাদী পাকিস্থান সরকার ডলুবাড়ির ত্রিপুরাদের ৩৮৩.১৪ একর জায়গা জেরীন চাবাগানের জন্য বন্দোবস্ত দেয়। ১৯৬৮ সনের সেই সরকারি নথিতে দেখা যায় ৪২ পরিবার ত্রিপুরা ও ৪ পরিবার খাসি মোট ৪৬ পরিবারের ভূমি সেখানে রয়েছে (সূত্র: মেমো নং-৮৮৯৮/১(১)/আর/তারিখ-৪/১১/১৯৬৮, এডিসি রেভিনিউ, সিলেট)। তৎকালিন রাষ্ট্রীয় নথিতে উল্লিখিত জায়গাটি ‘সরকারি খাস’ হিসেবে দেখানো হয়। শুরু হয় চাবাগান বনাম আদিবাসী বিবাদ। ডলুবাড়ির ত্রিপুরারা প্রায় ৪৭টি মামলা করেন। কালীমোহন দেববর্মা ও আগন রায় দেববর্মা নিজের জায়গা ফিরে পেতে সর্বসান্ত হন। দেশ স্বাধীনের পর ডলুবাড়ির ত্রিপুরারা ২৬৪ একর এলাকায় বসবাসের অনুমোদন পায়। কিন্তু এর ভেতর ৩৫ একর জায়গা আবারো চাবাগান দখল করে নেয়। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সনে ৩৮৩.১৪ একর জায়গা হাইকোর্ট ত্রিপুরাদের নিজস্ব ভূমি হিসেবে এক ঐতিহাসিক রায় দেয়।

খনন আর উন্নয়নের বদহজম
বহুজাতিক খনন আর করপোরেট উন্নয়নে দিন দিন চুরমার হয়েছে বালিশিরা উপত্যকা। প্রাণ, প্রকৃতি সুরক্ষায় বালিশিরা পাহাড়ের জন্য লড়েছে মানুষ। সালেক, গণি শহীদ হয়েছে। কিন্তু বালিশিরা পাহাড়ে বাঁচেনি ত্রিপুরাদের জুমের জমিন কী প্রাকৃতিক অরণের বাস্তুসংস্থান। ধুঁকে ধুঁকে কোনোমতে টিকে আছে একবিঘৎ লাউয়াছড়া বন। লাউয়াছড়া আর মধুপুরের শালবেনর ভেতর এক বিস্ময়কর মিল আছে। মধুপুর বন ছিল নাটোরের রাজার অধীন আর লাউছড়া ত্রিপুরা রাজার। মধুপুরে মান্দি-কোচ, লাউয়াছড়াতে ত্রিপুরা-খাসি। উভয় অরণ্য অঞ্চলই উন্নয়নের বদহজমে ছিন্নভিন্ন। প্রাকৃতিক বন ও সৃজিত বাগান মিলেমিশে এক জটিল মিশ্র চিরহরিৎ বর্ষারণ্যের বাস্তুসংস্থান গড়ে ওঠেছে লাউয়াছড়ায়। দেশের সাতটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ১০টি জাতীয় উদ্যানের ভেতর লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানই বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় উল্লুক গিবনের সবচে’ বড় বিচরণ এলাকা। মৌলভীবাজার রেঞ্জের ২,৭৪০ হেক্টর আয়তনের পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ১২৫০ হেক্টর এলাকাকে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ)(সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে ঘোষণা করা হয় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পরের বছর ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মার্কিন কোম্পানি অক্্িরডেন্টালের মাধ্যমে এক ভয়াবহ বিস্ফোরনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় লাউয়াছড়া বনের প্রতিবেশ ও জীবনব্যবস্থা। পরবর্তীতে আরেক মার্কিন কোম্পানি ইউনোকল লাউয়াছড়া বনের ভেতর দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন বসায়, যার ফলে এই সংবেদনশীল বনভূমির বাস্তুসংস্থান অনেকটাই উল্টেপাল্টে যায়। পরবর্তীতে ভুতাত্ত্বিক গ্যাস জরীপের নামে মার্কিন কোম্পানি শেভরন লাউয়াছড়া বনভূমিতে প্রশ্নহীন বোমা বিস্ফোরনে ঝাঁঝরা করে দেয় বনের মুমূর্ষু শরীর। পরবর্তীতে মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএইডের সহায়তায় চালু হয় নিসর্গ, আইপ্যাক, ক্রেল নানা নামের প্রকল্প। লাউয়াছড়ার ছোট্ট শরীর ঘিরে চারপাশে গড়ে ওঠে বাণিজ্যিক পর্যটনকেন্দ্র ও রিসোর্ট। মৈলপতুইসার আদিমানুষেরা এখানকার প্রাণ-প্রকৃতিসহ প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হতে থাকে।

কী হারাই, কী খুঁজি
লাউয়াছড়া খাসিপুঞ্জি আর ডলুবাড়ি ত্রিপুরী কামি আমার দুই প্রাণের জায়গা। আমার কাছে বিশাল বিদ্যালয়। এখানকার খাসি ও ত্রিপুরা প্রবীণজনেরা আমাকে কত রাত দুপুর জংগল-বিজ্ঞানের জটিল সূত্র গুলো শিখিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বোঝার চেষ্টা করছি নানামুখী উন্নয়নের ফলে এই অবিস্মরণীয় বাস্তুসংস্থান থেকে আমরা কী হারাচ্ছি? জংগলে জন্মায় কুথুই রগনি খøুম বা খøুম চুং খ্যাং নামের এক গাছ। থোকা ধরে ময়লা সাদা ফুল ফোটে। ত্রিপুরাদের বিশ্বাস মৃত্যুর পর এ গাছটি মৃতের আত্মার সহযাত্রী হয়। স্বর্গের পথ চিনিয়ে নিয়ে যায়। ত্রিপুরা সমাজে এ গাছটি পেয়েছে পবিত্র বৃক্ষের মর্যাদা। মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের পর কুথুই রগনি খøুমের মতোন অনেক লতা গুল্ম পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ছত্রভঙ্গ, খুমচাক, গনথু, খুমজা, গদকি, খুমগন্দাক, খুনজুপরা, খুম থাতু, খুমচা, দিংগ্রা, লাংগ্রা ও কাইসিলিংয়ের মতো বুনো ফুল গাছগুলিও খুব কমই দেখা যাচ্ছে বনটিলায়। এসব গাছের ফুল ত্রিপুরাদের নানা পূজা, কৃত্য ও পার্বণে ব্যবহৃত হয়। হয়তো বিশাল চাবাণিজ্য কী রিসোর্ট মালিক বা খনন কোম্পানিদের কাছে এসব প্রাণ-প্রকৃতির কোনো গুরুত্বই নাই। কিন্তু ত্রিপুরাদের বাঁচতে গেলে এসব দরকার। মানুষের জন্য এই বাস্তুসংস্থান জরুরি। এই খাদ্যশৃংখল চুরমার হলে দুনিয়া বিনাশ হয়ে যাবে। লাউয়াছড়া বনের ভেতর প্রবাহিত ছড়া ও পানির স্রোতগুলি দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। যেসব ছড়ায় পায়ের গোড়ালি পুরোটাই ডুবে যেত এবং কোথাও হাঁটু সমান জল ছিল এসব আজ মৃত্যুর সাথে লড়ছে। সিকামবুক নামের এক লম্বা শামুক কিংবা মুইখুমু রথয় নামের বুনো মাশরুম গুলো নিশ্চিহ্ন। তাহলে কী খেয়ে বাঁচবে বন্যপ্রাণ? ডলুবাড়িতে ১২০ পরিবার ত্রিপুরাদের জনসংখ্যা প্রায় এক হাজার। এর ভেতর এখানে আবারো দেড়শ পরিবারের গৃহায়ণ হলে লাউয়াছড়ার প্রাণ-প্রকৃতিতে এর প্রভাব পড়বে।

প্রতি ইঞ্চি জায়গার মর্ম
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতি ইঞ্চি জায়গার মর্ম বুঝতে সবাইকে আহবান জানিয়েছেন। প্রতি ইঞ্চি জায়গা পরিকল্পিত চাষাবাদের আওতায় আনার জন্য কৃষিবিভাগ নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। ডলুবাড়ির ত্রিপুরারা মৈলপতুইসাকে এক পবিত্র অঞ্চল হিসেবে মানেন। এখানকার মাটি, জল, অণুজীব সবই তাদের কাছে গুরুত্ববহ। তাই জুমআবাদ হারালেও ত্রিপুরারা পাহাড়ি টিলায় মিশ্রফসলের নানা ফলবাগান গড়ে তুলেছেন। মিশ্রকৃষিই এই অঞ্চলের প্রাণ। এমন কৃষিময় অঞ্চলের জায়গা অধিগ্রহণ করে ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ গড়ে তোলার মানে রাষ্ট্রীয় কৃষিখাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা। গৃহহীন-ভূমিহীনদের জন্য এই আশ্রয়ণ প্রকল্পটি অন্যত্র কোনো সরকারি খাসজমিতে বাস্তবায়িত হোক। সেখানেও যেন জনবসতি, বনভূমি, জলাভূমি ও কৃষিজমির কোনো ক্ষতি না হয়। পাশাপাশি আশ্রয় পাওয়া মানুষেরাও যেন আশেপাশে তাদের জীবনজীবিকা টিকিয়ে রাখার রসদ পান। কিন্তু কোনোভাবেই এক সংবেদনশীল বনভূমির পাশে এমন প্রকল্প নয়। প্রাকৃতিক বনভূমি এলাকায় বহিরাগতরা কোনোভাবেই বনের মর্ম বোঝে না। রুটিরুজির প্রশ্নে তারা বনকে ‘বাজারে বিক্রির পণ্য’ করে তোলে। তাই ঘটছে মধুপুর, সিংড়া, চকরিয়া, রেমা-কালেঙ্গা কী রাথুরায়। তুলাকইন্যার স্মরণে আছে এককালে ডলুবাড়ি এলাকায় তারা ধান, তুলা, তিল, লাউ, মরিচ, বেগুন, ভূট্টা, যব, কাউন, আলু আবাদ করতেন। থুথুরু কিসাক, থুথুরু গফু, মাইকিতিং, মাই গড়িয়া, মাই গারো চিকন, গারো কলম, মামি হাংগার এরকম কতনামের কত জুম ধান ছিল এককালে। আজ সব গেছে। করোনাকালে এইসব স্মৃতি আবছায়া বিস্মৃতি হয়ে আসে। বিশ্বাস করি রাষ্ট্র ডলুবাড়ির কৃষিজমিকে বাদ দিয়ে অন্যত্র সরকারি খাসজমিতে গৃহহীন-ভূমিহীনদের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। সাংবাদিক, স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দ, লাউয়াছড়া বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা আন্দোলনের উপস্থিতিতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন ডলুবাড়ির ত্রিপুরাদের কৃষিজমিতে এই আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করবেন না বলে জানিয়েছেন। আশা করি রাষ্ট্রের এই সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত অটুট থাকবে, নিশ্চিত করবে প্রান্তজনের অধিকার।

পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক। ই-মেইল:[email protected]

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *