এম এন লারমা সমগ্র দেশের নারী মুক্তির কথা ভেবেছেন: অনলাইন আলোচনায় বক্তারা

আজ ১১ ই ২০২০ বুধবার সকালে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের যৌথ আয়োজনে নারীমুক্তি প্রসঙ্গে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বিষয়ের উপর এক অনলাইন আলোচনার আয়োজন করে।

মেহনতি মানুষের পরম বন্ধু বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৩৭তম মৃত্যুদিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীরের সঞ্চালনায় এবং সভাপতিত্বে বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়াক সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা; ড.কাবেরী গায়েন, চেয়ারপারসন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বিশিষ্ট সাংবাদিক সোহরাব হোসেন; বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি রেখা চৌধুরী আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনার শুরুতে আলোচনাপত্র উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড.ঈশানী চক্রবর্তী। তিনি বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলেন, মানবেন্দ্র লারমা শুধু পাহাড়ের আদিবাসী নারী মুক্তি নিয়েই ভাবেননি। তিনি সমগ্র দেশের নারী মুক্তির কথা ভেবেছেন। তিনি এম এন লারমার রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়েও কথা বলেন। আজ যে পাহাড়ের আদিবাসী নারীরা ঘরের বাইরে বিভিন্ন কাজ করছেন, সংগঠন করছেন, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত আন্দোলন করছেন এর সবটুকু অবদান বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বলেও দাবী করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।
এছাড়া তিনি আরও বলেন, নারী শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে এবং মহিলা সমিতি গঠনে এমএন লারমার অবদান অগ্রগন্য।

উক্ত আলোচনায় চঞ্চনা চাকমা বলেন, যে সমাজে অর্ধেক অংশ নারীরা যদি অন্ধকারে থাকে তাহলে সে সমাজ কখনও সামনে এগিয়ে যেতে পারে না , পারবে না। আমরা অনেক সময় মনে করি অর্থনৈতিক মুক্তি মানেই নারীমুক্তি সেটা সত্য নয়। যখনই আদিবাসী অধিকারের কথা বলা হয় ঠিক তখনই নারী অধিকারের কথা চলে আসে।তিনি এমএন লারমার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলেন, উনি দূরদর্শী ছিলেন এবং খুবই তীক্ষè মেধার অধিকারী ছিলেন যার জন্য তিনি নারীদের জন্য ভেবেছেন এবং বলেছেন, নারী অধিকার মানেই মানবাধিকার বলেও দাবী করেন এই নারী নেত্রী।
এছাড়া তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির অন্যতম দুইজন পুরোধা মাধবীলতা চাকমা ও জ্যোতিপ্রভা লারমা মিনু প্রমুখদের নাম উল্লেখ করে বলেন, তারা এখনও নারী জাগরণের গান শুনিয়ে যাচ্ছেন। সংগ্রামী নারীদের জন্য তাঁরা জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড.কাবেরী গায়েন বলেন, ছোটকালে আমি রাঙ্গামাটিতে বেড়ে উঠি। তখনকার সময়েই আমি মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার সংগ্রামের কথা শুনেছি। তখন থেকেই মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা তথা পাহাড়ের আদিবাসীদের সংগ্রাম বুঝার সৌভাগ্য আমার হয়েছে বলে মত দেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, সকল সমাজেই নারী তার সর্বস্ব দিয়ে কাজ করেন, তবুও সকল ক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।এমএন লারমা এমন একজন ব্যক্তি যিনি নিজস্ব জাতিসত্তা থেকে শুরু করে কাপ্তাই বাধঁ, সমাজের পিতৃতান্ত্রিক মনমানসিকতা, নারীশিক্ষা, নারী মুক্তি তথা নারী অধিকার এমনকি খসড়া সংবিধান নিয়েও গর্জে উঠেছেন। মানুষের সংবিধান ও সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।
এছাড়া তিনি আরও বলেন, যে কোন আন্দোলনেই নারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হন। তিনি অন্য একটি প্রসঙ্গে বলেন, শান্তিচুক্তি হয়েছে ঠিকই এখনও আদিবাসীদের প্রতি জাতিগত নিপীড়ন থেমে থাকেনি, সকল জাতিসত্বার পূর্ণ মযার্দা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, আদিবাসী নারী নির্যাতন কমেনি বরং সহিংসতার মাত্রা দীর্ঘায়িত হয়েছে বলে দাবী করেন তিনি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি রেখা চৌধুরী বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে বলেন, তিনি শুধু পাহাড়ী আদিবাসী নারীদের কথাই বলেননি, সমগ্র দেশের নারীদের কথা বলেছেন। মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠায় এমএন লারমার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি অত্যন্ত দু:খের সাথে একের পর এক সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নারী ধর্ষণের কথা বলে দু:খ প্রকাশ করেন।
সাম্প্রতিক ধর্ষণ আইন সংশোধন নিয়ে তিনি আরও বলেন, শুধু আইন প্রনয়ন, আইন সংশোধন করলেই হবেনা আইন প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা থাকতে হবে। অন্যদিকে শুধু আন্দোলন করলেই হবেনা, দর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে বলেও মত দেন এই নারী নেত্রী।তবে একদিন আমরা সফল হব এবং নারী মুক্তি ঘটবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর সভাপতির বক্তব্যে বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যে আদর্শ ও স্বপ্নকে ধারণ করে জীবন দিয়েছেন সেই আদর্শ আজ বাস্তবায়িত হলে তার স্বপ্ন সার্থক হবে। অন্যায়-অবিচার দূর হবে। সমৃদ্ধির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে বলেও অভিমত এই নারী মুক্তিযোদ্ধার।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *