‘১০ নভেম্বর ৮৩-স্মরণে’ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এখনও প্রাসঙ্গিক: সুহৃদ চাকমা

আজ ১০ নভেম্বর জুম্ম জাতীয় শোক দিবস! এদিনে জুম্ম জাতির পথপ্রদর্শক, জুম্ম জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত ও মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও তাঁর ৮ জন সহযোদ্ধাসহ শাহাদাত বরণ করেন। মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাসহ এযাবতকালীন জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যারা নিঃস্বার্থচিত্তে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, জুম্ম জাতির সেই সব শ্রেষ্ঠ সন্তান-বীর শহীদদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সাথেই আজ স্মরণ করছি। শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যারা কারাগারে তিল তিল করে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এখনও তা করে চলেছেন, যারা জুম্ম জাতির বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের জন্য হাসিমুখে হাতকড়া পরেছিলেন, যারা নিজেদের জীবনকে তিল তিল করে চার দেওয়ালের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে উৎসর্গ করেছিলেন এখনও করে চলেছেন, যারা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে শুধুমাত্র স্বাধিকার আদায়ের পথে দৃঢ়ভাবে হেঁটেছিলেন আজও হাঁটছেন সেই সব বীরযোদ্ধাদের ১০ নভেম্বর আজকের এদিনে আবারও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে চাই এবং তাদের অসাধারণ অবদানকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের ঘটনার প্রেক্ষাপটে জড়িয়ে রয়েছে নির্মম গণহত্যাকান্ডের করুণ কাহিনী, রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্ধশতাব্দী ধরে চলা বিশেষ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্দয় শাসনের আগ্রাসি থাবা, রয়েছে অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর জেল-জুলুম, নির্যাতন নিপীড়নের কালাকানুন, রয়েছে শত-শত জুম্ম জনগণের অঝোর ধারার কান্নার কাহিনী, রয়েছে স্বজন হারানোর চাপা গোঙানি ও স্বভূমি থেকে উচ্ছেদের হৃদয়হীন, নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তব কাহিনী যা পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে রয়েছে। পাহাড়ের বুকে এই নির্মম কাহিনীগুলো স্মরণে আসলে আবেগে-আপ্লুত না হয়ে থাকতে পারি না। তবুও পাহাড়ের কোলে শত-শত বীর সেনানীদের মৃত্যুর যন্ত্রণাকে নিজের মধ্যে গেঁথে রেখে এবং অশ্রুসিক্ত নয়নে আমার চারপাশের বীর শহীদদের আত্মার অস্তিত্ব খুঁজে-খুঁজে একরাশ বেদনা ও যন্ত্রণার পাহাড়কে নিয়ে লিখতে বসি সারাক্ষণ। মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাসহ বীরযোদ্ধাদের মৃত আত্মাগুলো চুপিচুপি, কানেকানে বলে উঠে জাগো জুম্ম জাতি-জাগ্রত হও, তখনই মনে হয় জুম্ম জাতির বীর শহীদদের জীবিত আত্মার চেয়ে মৃত আত্মাগুলো আরও অধিকতর শক্তিশালী এবং বর্তমান সময়ে আর বেশি প্রাসঙ্গিক। তাইতো ১০ নভেম্বর এদিনে সকল বীর শহীদদের উদ্দেশ্যে বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

আমি মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধানে দেয়া প্রস্তাব ও তাঁর ভাষণগুলি পড়ছি আর বর্তমান বাংলাদেশকে দেখছি প্রায় হুবহু মিলে যাচ্ছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর যে বক্তব্য সেটা খুবই পরিষ্কার ছিল এবং তিনি সংবিধানের দেয়া ভাষণে এ বিষয়টি বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্ধমোহে সেদিন ভেসে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংসদ ও সংবিধান প্রণয়নকারীরা। ২০২০ সালে এসেও যদি আমরা বস্তুনিষ্ঠ বিচার-বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখবো যে, উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মৌলবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও উগ্র মুসলিম ধর্মান্ধতার ধারকবাহক আওয়ামী লীগ সরকার সেই দুর্নীতি, অনিয়মের খোলস থেকে আজও বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাই মহানেতার মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান বিলের উপর দেয়া ভাষণ আজ বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছে। সেদিন মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদগুলো রক্ষার্থে কতোই না হা-হুতাশ করেছিলেন। মূল্যবান খনিজ সম্পদ এর মধ্যে অন্যতম হলো তেল-গ্যাস। এই জাতীয় সম্পদগুলো রক্ষার্থে এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন করার জন্য তিনি মহান জাতীয় সংসদে জোরালো মতামত দিয়েছিলেন।

এই প্রসঙ্গে মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলেছিলেন, “পেট্রোলের জন্য আজকে সারা বিশ্বে হৈ-হুল্লোড় পড়ে গেছে। সেই পেট্রোল যদি আমাদের দেশে পাওয়া যায়, সেটাকে সম্পূর্ণরুপে রাষ্ট্রের হাতে না নিয়ে যদি আমরা ব্যক্তিগত মালিকানার অর্থনীতির পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তাহলে সেটা আমাদের সংবিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী হবে। এটা করা আমাদের পক্ষে উচিত হবে না”। এর থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাংলাদেশের তেল-গ্যাস ইত্যাদি মূল্যবান জ্বালানি সম্পদ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে কতটা জরুরি তা তিনি গভীরভাবে উপলদ্ধি করেছিলেন। সেজন্য দেশের তেল-গ্যাস হচ্ছে জাতীয় সম্পদ এবং জনগণের সম্পদ। এ সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন করতে হবে বলে তিনি জোরালো মতামত দিয়েছিলেন। কোনোভাবেই এই জাতীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত মালিকানায় নিয়ে লুন্ঠন করতে দেয়া যায় না বলে তিনি মনে করেন। সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হয়েছিল কিন্তু বাস্তবে তেল-গ্যাস রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আহরণ ও উত্তোলন না করে বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী দৈত্য দানবদেরকে আরও অধিকতর শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং এটা জাতীয় স্বার্থে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মনে করেন। সেই সময়ে তিনি যে আশঙ্কা করেছিলেন বর্তমানে তা বাস্তবে প্রতিফলন হচ্ছে।

বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদের তাঁর ভাষণগুলো আমি বারবার পড়ছি এবং সেই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ করে উপস্থাপন করা ভাষণগুলো থেকে আমাদের নতুন প্রজন্মকে আরও অনেক কিছু শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত মনে করি। জাতীয় সংসদে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের ডেপুটি স্পিকার যখন মহাননেতাকে বলেছিলেন, আপনি নিজেকে সংশোধন করে কথা বলুন, নতুন দেশের কথা বলুন এবং বর্তমান যুগের কথা বলুন। কিন্তু স্পিকারের কথার প্রেক্ষিতে মহাননেতা জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, “আমরা অতীতকে ভুলতে পারি না। অতীত যত তিক্তই হোক-তাকে টেনে আনতেই হবে। অতীতকে যদি আমরা টেনে না আনি, তার থেকে যদি আমরা শিক্ষা গ্রহণ না করি সেই অতীতের গ্লানিকে যদি আমরা মুছে ফেলার চেষ্টা না করি, তাহলে কেমন করে আমরা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব, কেমন করে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব, ভুলের মাশুল আমরা অনেক দিয়েছি আর দিতে চাই না। আবার কেন ভুল হবে? ভুলের মাশুল আবার কেন দিতে হবে? অতীতের নেতৃবৃন্দ যেমন ভুল করেছেন, সেই ভুল আমরা যেন পুনর্বার না করি। অতীতকে আমি ধরে থাকতে চাই, বরং ভবিষ্যতকে কলুষমুক্ত করার জন্যই আমি অতীতের কথা স্মরণ করছি”। এটাই বাস্তব সত্য! পাহাড় কিংবা সমতলের নতুন প্রজন্ম যেন মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার এই কথার প্রেক্ষিতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে জুম পাহাড়ের আগামী দিনের সম্ভাবনাময়ী নতুন প্রজন্মরা যেন সেভাবে নিজেকে তৈরি করেন-১০ নভেম্বর এদিনে এটাই আমার প্রত্যাশা।

আজকের এদিনে আমি আরও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৭২ সালে ১৯ অক্টোবর, বাংলাদেশ গণপরিষদের বির্তকে সংবিধান বিলের উপর আলোচনা করতে গিয়ে মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলেছিলেন, “আমি একটু বলতে চাই যে, এই মহান গণ-পরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি নর-নারীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। তাই যেসব নীতির উপর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে চলেছে সেসব নীতি যদি ঠিকভাবে সংযোজিত না হয়, তাহলে সাড়ে সাত কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাবে। তাই এটুকু বলে রাখছি যে, ৩০ লক্ষ লোকের রক্তের বিনিময়ে এবং মানুষের উপর অকথ্য নির্যাতন, নিপীড়নের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা লাভ করেছি, যদি আমরা সেই স্বাধীনতার সঠিক মূল্যায়ন না করতে পারি, তাহলে এই গণপরিষদের অধিবেশনে বসার কোন সার্থকতা হয় না। তাই আজ যদি তাড়াহুড়ো করে এই সংবিধান পাশ করতে যাই, তাহলে এর মধ্যে ভুল-ত্রুটি থেকে যেতে পারে এবং সেই ভুল-ত্রুটি আমরা পরে সহজে সংশোধন করতে পারব না। তার ফলে অনেক অসুবিধায় পড়তে হবে”। কত সুন্দরভাবে যুক্তি দিয়ে এবং বুদ্ধি দিয়ে বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিচার-বিশ্লেষণ করে কথাগুলো তুলে ধরেছিলেন। যার কারণে তাঁর কথাগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীতে এসেও সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “আমরা অতীত ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই যে, পাকিস্তান সরকার তথা তৎকালীন মুসলিম সরকার ১৯৫৬ সালের যে সংবিধান রচনা করেছিলেন, সেই সংবিধানকে ১৯৫৮ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব পদাঘাত করে বাতিল করে দিয়ে নিজের ইচ্ছা মতো একটা সংবিধান ১৯৬২ সালে দিয়েছিল। সেই সংবিধানের যে কি অবস্থা হয়েছিল, তাও আমাদের জানা আছে। তাই আমার বিনীত আবেদন যে, আমরা সেই অতীত ইতিহাসের ফল ভাগী যেন না হই”।

মহান সংসদে তিনি আরও উল্লেখ করেন, “এই মহান গণপরিষদের মাধ্যমে যদি আমরা দেশের ভাই-বোনদেরকে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছিয়ে দিতে পারি, তাহলে আমাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হবে। যেহেতু এই বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি নর-নারীর মধ্যে রয়েছে ধনী, রয়েছে গরিব, রয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, তাই তাদের মনের কথা, তাদের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার কথা যদি আমাদের এই সংবিধানে না থাকে, তাহলে কিভাবে আমরা আমাদের যারা ভবিষ্যৎ বংশধর আসবে, তাদের কাছে এই দাবী রাখতে পারবো যে, তোমাদের জন্য আমরা এই সর্বাঙ্গ সুন্দর সংবিধান রেখে যাচ্ছি। আমি একজন সংবিধানবিদ নই। আমি সংবিধানের চুলচেরা বিশ্লেষিত আইন সম্বন্ধে এত বেশি বুঝি না বা জানি না। তবে আমি এই সাড়ে সাত কোটি নর-নারীর একজন হয়ে আমার যে মত, আমার যে অভিব্যক্তি, সেটা সম্পূর্নরুপে প্রকাশ করতে পারবো। আমার আবেদন হলো, আমরা যারা এই পরিবেশের মধ্যে, এই মানসিকতার মধ্যে রয়েছি, যে মানসিকতা কলুষিত মানসিকতা-যে ঘৃণ্য মানসিকতার জন্য অফিসাররা ঘুষ নেয়, ওয়ার্কস প্রোগ্রামের হাতে ক্ষমতা রেখে যারা সেই উন্নয়নের টাকা মেরে দেয়, সেই সব দুর্নীতির যাতে মূলোৎচ্ছেদ করে দেয়া যায়, এমন একটা সংবিধান আমরা চাই”। তাই সেদিনের ভাষণে তিনি দুর্নীতির বিষয়ে স্পষ্ট সীমারেখা টেনেছিলেন এবং তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন।

এবিষয়ে তিনি জাতীয় সংসদের ভাষণে আরও বলেন, “আজ যে সংবিধান আমরা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য রেখে যাচ্ছি, সেই সংবিধানে যদি এমন একটা নীতি না থাকে, যে নীতির দ্বারা আমাদের দেশে যারা ঘুষখোর, দুর্নীতিপরায়ণ, তাদের যদি আমরা উচ্ছেদ করতে না পারি, তাহলে এই সংবিধানের কোন অর্থ হয় না। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে এ কথা ছিল না, ১৯৬২ সালের সংবিধানেও এ কথা ছিল না। তাই আজকে এই সংবিধানের মাধ্যমে আমরা যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি সেই সমাজতন্ত্রের নামে আমরা আবার যদি উচ্চ শ্রেণির দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও সেই ক্ষমতা অপব্যবহারকারীদেরই আবার দেখতে পাই তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিক, যারা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধর, তারা আমাদের বলবে যে, যারা এই সংবিধান প্রণয়ন করে গিয়েছেন, তারা ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং দুর্নীতির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন”।

১৯৭২ সালের সংবিধানের উপর সংশোধনী প্রস্তাব করতে গিয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে তৎকালীন সময়ের জাতীয় সাংসদ ও সংবিধান প্রণয়নকারীরা হাসি-ঠাট্টা-তামাশা করতেও কার্পুণ্য করেননি এবং তাদের কাছ থেকে নানাভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, বিকৃত মন্তব্য ও অশালীন কথাবার্তা শুনতে হয়েছে। তিনি সংসদ হাউসে সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করতে গেলে নানাভাবে হয়রানির স্বীকার হয়েছিলেন এবং তাঁর সংশোধনী প্রস্তাবগুলো গৃহীত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানবে বলে নাকচ করে দিয়েছিলেন সেদিন। তাঁর সংবিধানের সংশোধনীর উপর প্রস্তাবগুলি ক্ষমতার মোহে অন্ধত্ব ও উন্মাদ হওয়া জাতীয় সাংসদ ও সংবিধান প্রণয়নকারী সেদিন ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, বক্তব্য দিতে গিয়ে বাধা প্রদান করেছেন, তাঁর সংশোধনী প্রস্তাবটি বিধিবহির্ভূত বলে থামিয়ে দিতেন অথবা সংশোধনী প্রস্তাবটি হাউসে উপস্থাপনের পর সংখ্যাগরিষ্ট ভোটে প্রস্তাবটি নাকচ করে দিয়ে নিজেদেরকে উগ্র জাতীয়তাবাদের দাম্ভিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার প্রতি ডেপুটি স্পিকার আচরণ ছিল এরকমই আপনি বসুন, বসুন! এটাও বিধিবহির্ভূত! এবিষয়ে আলোচনা চলতে পারে না। মহাননেতা যখন সংবিধানের গনবিরোধী অনুচ্ছেদ এর উপর সংশোধনী প্রস্তাব করেছিলেন তখনই প্রস্তাবটি ধ্বনি ভোটে নাকচ হয়ে যায়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করার সময় বাংলাদেশের নীতি নির্ধারনী মহলেরা এতোটাই উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের দাম্ভিকতার মত্ত ছিল, যার কারণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাল-মন্দ, বিচার, বিবেচনাবোধ পর্যন্ত লোপ পেয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যুক্তিসম্মত, বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানভিত্তিক সংশোধনী প্রস্তাবগুলি বিরোধীতা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি এবং তাঁর সংবিধানের উপর দেয়া সংশোধনী প্রস্তাবগুলো অবহেলা করার পরিণতি বাংলাদেশের আপামর জনতাকে আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পরেও চরমভাবে ভোগ করতে হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও দুর্বৃত্তায়নের হীন ষড়যন্ত্র এখন চরম আকার ধারণ করেছে। যার কারণে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পরেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক মুক্তি আসেনি।

পরিশেষে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন এখন সমাজের মধ্যে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তৃত হয়ে পড়েছে এবং পুরো দেশকে গ্রাস করে ফেলেছে। এবিষয়ে কিছু কিছু অভিযান চালানো হয়েছে বটে কিন্তু সেগুলো কেবলমাত্র জুয়া বা ক্যাসিনোসংক্রান্ত অপরাধেই সীমাবদ্ধ ছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সমস্যা এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দিন বদলের অঙ্গীকার নিয়ে সরকারের ক্ষমতায় এসেছিল। এই অঙ্গীকার এর অংশ ছিল দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, দখলদারি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ সব অপকর্মের মূলোৎপাটন করা এবং একই সাথে অঙ্গীকার ছিল দলীয়করণের অবসানসহ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ইতিবাচক পরিবর্তন করা। কিন্তু আজ এগুলো কোনোটাই হয়নি! দুর্নীতির মতন রোগটি আরও জটিল এবং এর শিকড় আরও গভীরে গেঁড়ে বসেছে। অথচ এই দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন একটা জাতীয় সমস্যা। এই সমস্যাকে দূর করতে গিয়ে মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জাতীয় সংসদের যুক্তিসম্মত বক্তব্য নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মতোই প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার পরিচয় সেদিনের জাতীয় সাংসদ ও সংবিধান প্রণয়নকারীরা দিতে পারতো এবং মহান জাতীয় সংসদে তাঁর প্রস্তাবিত ভাষণের কথানুযায়ী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতো তাহলে বাংলাদেশের এমন জনবিরোধী চরম সংকটময় পরিস্থিতির জন্ম না হতো। সেজন্য মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বারবার স্মরণ করতে হয়, তাঁর জীবন ও সংগ্রাম পাঠ করতে হয় এবং তাঁর প্রদর্শিত আদর্শের ভিত্তিতে চলবার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। তাইতো তিনি আমাদের কাছে এখনও প্রাসঙ্গিক, স্মরণীয়, বরণীয় এবং মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে আমাদের বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও বাস্তবতায় আজও প্রয়োজন।

লেখক, পাহাড়ের অধিকার কর্মী

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *