দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে আদিবাসী নারীদের প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে: মানববন্ধনে বক্তারা

বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দেশে আদিবাসী নারীদের উপর সহিংসতা মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। পূর্বেকার সহিংসতাগুলোর কোনো বিচার না হওয়ার কারণে এ ধরণের ঘটনা বারংবার ঘটছে বলে মত দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। আদিবাসী নারীর উপর ক্রমাগত সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত সকল দোষীদের গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আজ ২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে এ কথা বলেন বক্তারা। পাবর্ত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম , বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক ও বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এ প্রতিবাদী মানববন্ধনের আয়োজন করে।

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক-এর সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমার সভাপতিত্বে এবং বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সদস্য সচিব আন্তনী রেমার সঞ্চালনায় মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খায়রুল চৌধুরী, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, জনউদ্যোগের প্রতিনিধি তারিক হোসেন মিঠুল, এএলআরডি’র বুলবুল আহমেদ, কাপেং ফাউন্ডেশন-এর প্রতিনিধি উজ্জ্বল আজিম, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যাবিলন চাকমা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এর প্রতিনিধি হরেন্দ্র নাথ সিং, গারো স্টুডেন্টস ফেডারেশনের প্রলয় নকরেক, আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অলীক মৃ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নাসির উদ্দিন প্রিন্স, মানবাধিকার কর্মী মাহবুব হক, বাগাছাস এর প্রতিনিধি বুশ নকরেক, মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, হাজং স্টুডেন্টস কাউন্সিল, মাদল, এফ মাইনর এবং অন্যান্য সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ।

মানববন্ধনের শুরুতে মূল বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের উপ-পরিচালক শাহনাজ সুমী। তিনি বলেন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে রাত প্রায় আড়াইটার সময় খাগড়াছড়ি সদরের ১ নং গোলাবাড়ি ইউনিয়নের বলপিয়ে আদাম নামক গ্রামে নিজ বাড়িতে দরজা ভেঙ্গে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত প্রায় ৯ জন সেটেলার বাঙালী মানসিক প্রতিবন্ধী এক চাকমা নারীকে (২৬) গণধর্ষণ ও তাদের বাড়িতে লুটপাট করেছে। এছাড়াও গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ দীঘিনালায় এক পুলিশ সদস্য কর্তৃক এক আদিবাসী স্কুল ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়। এছাড়াও গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ সন্ধ্যা ৫.৩০ টার সময় মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার ৭নং আদমপুর ইউনিয়নের কাটাবিল গ্রামের বাসিন্দা উমেদ মিয়া কর্তৃক মনিপুরী এক নারী (৬০) শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। কোভিড মহামারীর এ সময়ে আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করেছে বলেও তাঁর মূল বক্তব্যে তুলে ধরেন।

পাশাপাশি, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মধুপুরগড় অঞ্চলের পেগামারী গ্রামের বাসন্তী রেমার ৪০ শতক জায়গার পুরো কলাবাগান স্থানীয় বনবিভাগ বিনা নোটিশে কেটে ফেলে দেয়ার ঘটনা খুবই দু:খজনক। এটা এক চরম মানবাধিকার লংঘন বলে উল্লেখ করেন শাহনাজ সুমী।

উক্ত মানববন্ধনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অদ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ধরনের ধর্ষণ হয়েছিল, সেটিই শেষ ধর্ষণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্বাধীন এই বাংলাদেশে এখন এত বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে কেন, তিনি প্রশ্ন করেন। তিনি আরো বলেন, আদিবাসী নারীর প্রতি যে সহিংসতা ঘটছে তা রাষ্ট্রের একটি হাতিয়ার যা আদিবাসীদের উচ্ছেদেরই একটি অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. খায়রুল ইসলাম বলেন, আদিবাসী নারীদের জন্য আলাদা বিচার ব্যবস্থাও এর সাথে যুদ্ধাপরাধীদের মত অপরাধীদের ধরে বিশেষ ট্রাইবুনালের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। আদিবাসী নারী ধর্ষণ ও সহিংসতা সেটি জাতিগত নিপীড়নের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন বিশিষ্ট এই শিক্ষক। আদিবাসী নারীর উপর সংঘটিত সহিংসতায় জড়িতদের অবিলম্বে শাস্তিরও দাবী জানান এই আদিবাসী গবেষক।

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যাবিলন চাকমা তাঁর বক্তব্যে ধর্ষক এবং আদিবাসী নারী সহিংসতায় মদদদাতাদের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, আমরা বারংবার রাস্তায় নেমে আদিবাসী নারী ধর্ষণের বিচার চাচ্ছি। কিন্তু কোনো প্রকার সুরাহা পাচ্ছি না। পাহাড়ে এই ধরণের ঘটনা বারংবার সংঘটনের পেছনে মূল কারণ হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না করা। চুক্তি বাস্তবায়ন না করার ফলে পাহাড়ে দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামো বিরাজ করছে যা পাহাড়ে জুম্ম নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তাই অবিলম্বে পার্বত্য চুক্তির পূণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবীও করেন এই ছাত্রনেতা। অন্যথায় পাহাড়ে আবারো আগুন জ্বলবে বলেও হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

উক্ত মানববন্ধনে অংশ নিয়ে নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না। তাহলে কি বিচার ব্যবস্থায় কোন ত্রæটি আছে কিনা সেটা খুঁজে বের করতে হবে।
জনউদ্যোগের তারিক হোসেন মিঠুল উক্ত মানববন্ধনে বলেন, যে ধরনের নারীর প্রতি সহিংসতার খবর পত্রিকায় আসছে, তা নিয়ে আমরা শংকিত। যদি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হতে না চায় তাহলে বিচারব্যবস্থায় পরিবর্তন জরুরী বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া তিনি সহিংস ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী পরিবারের পূর্ণ সহযোগিতা প্রদানের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।

কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি উজ্জ্বল আজিম এই সমাবেশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিচার দ্রুত

করতে হবে। অন্যথায় এ ধরণের ঘটনা সংগঠনকারীরা আরো উৎসাহিত হবে বলেও অভিমত দেন তিনি। এছাড়া তিনি সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানান।

উক্ত মানববন্ধনের সভাপতি বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা বলেন, পাবর্ত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারীর প্রতি যে সহিংসতা সেটি জাতিগত নিপীড়ন ও জাতিগত নিধনের একটি প্রক্রিয়া। এই জাতিগত নিধনের প্রক্রিয়ায় পাবর্ত্য চট্টগ্রামকে ইসলামিকরণ করার জন্য ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আদিবাসী নারীদের প্রতি সহিংসতা ঘটনো হচ্ছে। এ সহিংসতা থেকে উত্তোরণে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দেওয়ারও আহ্বান জানান এই নারী নেত্রী।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *