মানুষরূপী হিংস্র নরপশু ধর্ষকদের না বলুন : বাচ্চু চাকমা

বাংলাদেশের আদিবাসী নারী হোক কিংবা বাঙালি নারী হোক তাদের আজ কোথাও নিরাপত্তা নেই। পত্রিকা খুললে চোখে পড়ে আদিবাসী নারী ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এমনই বাংলাদেশে নিত্য দিনের জঘন্যতম ঘটনা ঘটে চলেছে। দেশের মানুষ আজ বাকরুদ্ধ! এসব অমানবিক, বর্বর ঘটনা কারা সংঘটিত করছে? যখন সত্য ঘটনাবলী দেশের জনসম্মুখে প্রকাশ পায় তখন জানা যায় ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী গোষ্ঠী, সংগঠনের ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ, বাংলাদেশ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বরত সদস্য, এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও শুনা যায়, ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত খোদ আইনরক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সমর্থিত সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর সদস্য এবং বহিরাগত মুসলিম সেটেলার। তাহলে আজ বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের স্বর্ণদুয়ার খুলে দিয়েছে বলে সম্প্রতি বুলি আওড়াছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা ওবায়দুল কাদের। আসলে কি তাই? এসবের অন্তরালে ক্ষমতাসীন দলের তলে তলে পূর্ণ হচ্ছে দুর্নীতি, অনিয়ম, দুর্বৃত্তায়নের কলস। সম্প্রতি দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আরও বলেছেন, “সিলেটের এমসি কলেজের ঘটনায় সরকারের অবস্থান কঠোর। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না”। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে খাগড়াছড়ি জেলাতে তার চেয়েও অধিক গণধর্ষণের ঘটনা ঘটলো এবিষয়ে একটা টু শব্দ করলেন না কেন এবং এতে কি প্রকাশ পেয়েছে? তার এই বক্তব্যের মধ্যে সাম্প্রদায়িক এবং চরম বর্ণবাদী আচরণের প্রকাশ পেয়েছে।

এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারীর প্রতি সহিংসতা, নারীর শ্লীলতাহানি, নারীদের ধর্ষণের পর হত্যা. যার থেকে ছোট্ট শিশু, কিশোরী, মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়েও রেহাই পাচ্ছে না। লজ্জায় নিচু হয়ে যাচ্ছে মাথা, আর ক্ষোভে ফেটে পড়তে চাইছে মানুষ। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ দিবাগত রাত আড়াই ঘটিকার সময় খাগড়াছড়ি জেলার সদরে বহিরাগত সেটেলার বাঙালি কর্তৃক একজন মানসিক প্রতিবন্ধী জুম্ম নারীকে গণধর্ষণের বিরুদ্ধে সারা বাংলাদেশে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের জন্য গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়েছে। চলছে নরপশু ধর্ষক সেটেলারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ মিছিল,সমাবেশ ও মানববন্ধন ।এবং সেই প্রতিবাদ সমাবেশের জনতার মঞ্চ থেকে তীব্র আওয়াজ তুলে নিন্দা জানানো হচ্ছে।

ইতিমধ্যে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে সংঘটিত গণধর্ষণের মতন বর্বর ঘটনায় জড়িত ৭ মুসলিম সেটেলারকে গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। পত্রিকা মারফত খবর পাওয়া গেছে, গ্রেফতারকৃতরা অপরাধ স্বীকার করেছে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট? মানুষ এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না, গ্রেফতারকৃত দোষী ব্যক্তিদের আসলেই শান্তি হবে! কেননা পূর্বের ঘটনাবলী তার সাক্ষ্য বহন করে।
কয়েক বছর পূর্বেও লংগদুতে কিশোরী সবিতাকে এবং লামায় জনৈক মারমা নারীকে ধর্ষণের পর হত্যাকারী দুইজনই ধৃত হয়েছিল এবং নিজেরাই তারা প্রকাশ্যে অপরাধ স্বীকার করেছিল, কিন্তু তাদের সাজা হয়নি। পুলিশের দুর্বল ভূমিকার কারণে তারা জামিনে জেল থেকে বের হয়ে এসেছিল। খাগড়াছড়ি গণধর্ষণের সাথে জড়িত এখনো কয়েকজন ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। তবে গ্রেফতারকৃত মানুষরূপী নরপশু ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামিয়ে রাখা যাবে না।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ রাতে সিলেট এমসি কলেজের একজন বাঙালি নারীকে গণধর্ষণের সাথে জড়িত ছাত্রলীগের কর্মীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শাস্তির আওতায় আনতে হবে সম্প্রতি ঢাকাস্থ সাভারে নীলা রায়কে ২০ সেপ্টেম্বর তুলে নিয়ে ধর্ষণ এবং প্রেমের প্রস্তাবে ও ধর্মান্তরিত হতে রাজি না হওয়ায় হত্যা করার সেই নরপশু ধর্ষকদের। এসব ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সমাজে হোক, স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ফ্রন্টে আন্দোলন সমানতালে চলমান রাখতে হবে।

‘ধর্ষণ’ ছোট একটি শব্দ, কিন্তু তার অপমানের ওজন বহন করা যায় না। সভ্য সমাজের এমন অসভ্যতা সত্যিকার অর্থে নিন্দনীয়। যে মায়ের উপর নির্মমভাবে হিংস্রতার আক্রমণ চালিয়েছে, দলগতভাবে ধর্ষণ করে মাকে অপদস্ত করেছে, লাঞ্ছিত করেছে এবং চরমভাবে অপমানিত করেছে সেই সকল হিংস্র পশুদের কখনো ক্ষমা করা যায় না। এই ধর্ষণকারীরা মানুষ নয়, এরা মানুষরূপী হিংস্র পশু। তাই প্রতিবাদের ভাষা হোক আরও অধিকতর তীব্র, বলিষ্ঠ এবং আপোষহীন। এই প্রতিবাদের ভাষায় যেন মানুষরূপী নরপশুদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতা অত্যাচারী স্বৈরশাসকেরও টনক নড়ে উঠে। মিছিল যেন এগিয়ে চলে দুর্দান্ত প্রতাপে, প্রতিবাদ সমাবেশের বক্তব্য যেন পৃথিবীর সীমা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেখিয়ে দিতে হবে, আমরা যেমনি এই ভূমিতে লড়াই করে বাঁচতে শিখেছি তেমনি যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধেও রুঁখে দাঁড়াতে জানি।

গণধর্ষণের মতো ঘৃণ্য, বর্বরোচিত ঘটনা ক্ষমতাসীন সরকার সহ্য করতে পারে কিন্তু এই অসহ্য ভার বহন করা বাংলাদেশ জনগণের সম্ভব নয়। প্রতি বছর যেন এই অসহ্য যন্ত্রণার ভার বেড়েই চলেছে। ধর্ষণ শব্দটা উচ্চারণ করতেও এক সময় মানুষ লজ্জিতবোধ করতো; আর এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, অনলাইন পোর্টাল, টিভির খবর বা পত্রিকার প্রথম পাতায় স্থান করে নিচ্ছে প্রতিদিন। খবর শুনে বা পড়ে বাবা-মা তার সন্তানের কাছে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার ভাষা খুঁজে পায় না। লজ্জা ও অস্বস্তিতে কোন কথা বলতে বা কোনো কাজ করতে আমরা মানসিকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছি। মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজন সবাই মিলেমিশে টিভির খবর দেখবো শুনবো সে-ধরণের পরিবেশ মোটেই নেই। এই ধর্ষক নরপশুদের কারণে আমাদের সমাজব্যবস্থা দিন দিন কলুষিত হচ্ছে, বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিপরীতে পিছিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অগ্রগতি, উন্নতি এসব মনুষ্যত্বহীন নরপশুদের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই ধর্ষণকারীরা আমাদের শত্রু, সমাজের শত্রু এবং দেশের চরম শত্রু। মানুষরুপী নরপশু ধর্ষকদের না বলুন, সমাজ থেকে বিতারিত করুন।

২০১৯ সাল শুরু হয়েছিল নারী ধর্ষণের মধ্য দিয়ে। তারপর সারা বছর ধর্ষণ একটুও কমেনি বরং ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারী মাসটাও শুরু হলো নারীর ওপর আক্রমণ দিয়েই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। অর্থাৎ এক বছরে নারী ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। নারী ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে মানেই ধর্ষকের সংখ্যাও বেড়েছে। এই ধর্ষকরা কারা? এরা তো ভিনগ্রহ থেকে আসেনি, চেহারায়, পরিচয়ের সবকিছুতেই তো এদেশের মানুষ। এরা শুধু ধর্ষণ করে ক্ষান্ত হয়নি নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করছে বারবার। ধর্ষণের অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে অসংখ্য নারী। কতখানি নিষ্ঠুর হলে ধর্ষণের পর হত্যা করে অথবা জীবন কতখানি অসহনীয় মনে হলে আত্মহত্যা করে তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। কিন্তু আজ এই ধর্ষণকারীরা যে মানসিক অসুস্থতার বা জীবনের স্বাভাবিকতার প্রতিবন্ধক হয়ে উঠছে, তা বুঝতে দূরে যাওয়া লাগে না। এরা আমাদের সমাজকে পঙ্গু বানিয়ে ছাড়বে। তাই এসব হিংস্র পশুদের বিরুদ্ধে জনতার লড়াই চলমান রাখতে হবে।

নারীর প্রতি সহিংসতার অন্য পরিসংখ্যানগুলোও এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৬২২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৭০৩ জন। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ২৪৫ জনকে। অপহরণের শিকার হয়েছে ১৪৭ জন। নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে ২৬৪ জন। শুধু বর্তমানের চিত্র নয় ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের পরিসংখ্যান দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে থাকা যায় না। বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্যানুসারে এই সময়ে মোট ধর্ষণের শিকার ১৩ হাজার ৬৩৮ জন, গণধর্ষণের শিকার ২ হাজার ৫২৯ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৬ হাজার ৯২৭। ধর্ষণ পরবর্তী খুন ১ হাজার ৪৬৭ এবং ধর্ষণ পর অপমানের লজ্জা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ১৫৪ জন।

কাপেং ফাউন্ডেশনের মতে, করোনার সময়ে আদিবাসী নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার উদাহরণ হচ্ছে আগস্ট ২০২০ মাসে আদিবাসী নারীর উপর যৌন সহিংসতায় ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, মারধর ও হামলার শিকার হয়েছেন ২ জন পুরুষসহ ১৫ জন আদিবাসী নারী। বাংলাদেশ আজ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে? এসবগুলো ভাবলে মনটা ভয়ে আর আতঙ্কেই আটকে উঠে। তাই ধর্ষণকারী যেই হোক সমাজে সবাই ধর্ষকদের না বলুন।

বাচ্চু চাকমা, সাবেক সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *