বাসন্তী রেমাই হয়ে উঠুক আগামী দিনের আদিবাসীদের প্রতিরোধের প্রতীক: সরেজমিন পরিদর্শনে বললেন নাগরিক প্রতিনিধিদল

বিগত ১৪ সেপ্টেম্বর মধুপুরের গারো আদিবাসী বাসন্তী রেমার ৪০ শতাংশ জায়গার কলা বাগান কেটে ফেলে স্থানীয় বন বিভাগ। কোনো রকম পূর্ব নোটিশ ছাড়া স্থানীয় বনবিভাগ টাঙ্গাইলের মধুপুরের পেগামারি গ্রামে বাসন্তী রেমার ৪০ শতাংশ জমির উপর গড়ে তোলা এ কলা বাগান কেটে ফেলার ঘটনায় স্থানীয় আদিবাসী তথা নাগরিকগণ বিক্ষুবদ্ধ হয়ে দফায় দফায় বন বিভাগের কার্যালয় ঘেরাও এবং প্রশাসনের সাথে আলোচনা জারী রেখেছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ ২৫ সেপ্টেম্বর রোজ শুক্রবার বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে ঢাকা থেকে নাগরিক প্রতিনিধি দল বাসন্তী রেমার নিজ গৃহে গিয়ে স্থানীয় বনবিভাগের উক্ত নারকীয় তান্ডব সরেজমিন পরিদর্শনে যান। উক্ত নাগরিক প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরীণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক অদিতি ফাল্গুনী, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, মাওলানা ভাসানী বিজ্হান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জহুরুল ইসলাম, জন উদ্যোগ জাতীয় কমিটির তারিক মিঠুল, কাপেং ফাউন্ডেশনের উজ্জ্বল আজিম, এএলআরডি’র বুলবুল আহমেদ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক ফাল্গুনী ত্রিপুরা।

সরেজমিন পরিদর্শনের সময় পেগামারী গ্রামে বাসন্তী রেমার গৃহের উঠানে এক জনসভায় আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, মধুপুর বনে যুগ যুগ ধরে আদিবাসীদের বসবাস ছিল। আদিকাল থেকে তাঁরা এখানেই বনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত থেকে জীবন যাপন করে আসছে। কিন্তু বনবিভাগ ছিল না। কাজেই বন রক্ষার জন্য বনবিভাগকে এখানে থাকতে হবে এটা ঠিক নয়। বরং আদিবাসীরাই বনের প্রকৃত সংরক্ষক।

তিনি আরো বলেন, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু মধুপুরে দোখালায় এসেছিলেন।এখানেই সংবিধান রচিত হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এখন বেঁচে নেই। তিনি যদি বেঁচে থাকতেন এতক্ষণ বাসন্তী রেমার কষ্টে নিশ্চয় কষ্ট পেতেন। কারন বঙ্গবন্ধু গরীব মানুষের কথা ভাবতেন। বনবিভাগ তথা বর্তমান রাষ্ট্র করোনায় আক্রান্ত এবং অসুস্থ বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন এই আদিবাসী নেতা।

উক্ত সমাবেশে সংহতি বক্তব্যে ঢাবি শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, আমি স্পষ্ট বলতে চাই রাষ্ট্র সামাজিক বনায়ন জানেনা, বোঝেনা। সামাজিক বনায়নের মূল শর্ত হচ্ছে বনের সাথে মানুষের সম্পর্ক যে আছে সেটি আরো জোরদার করা। বনে যে গাছপালা- পশুপাখির বসবাস সেটির সাথে মানুষের সম্পর্ক সেটিকে জোরদার করা, সেটিকে নিশ্চিত করা। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্র সামাজিক বনায়ন বলতে যেটা বুঝে সেটা হচ্ছে জমি দখল করো, রাবার চাষ করা এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন করো। সে ভাবনার মধ্যে মানুষ নেই বলেও অভিমত দেন এই আদিবাসী গবেষক। বাসন্তী রেমার কাছ থেকে সাহস নিতে সেখানে যাওয়া বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

একই সমাবেশে সংহতি বক্তব্যে ঢাবির আরেক শিক্ষক ড. রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় খবর পায় যে, বন্য হাতি এসে আদিবাসীদের ফসল তছনছ করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যে এরকম এলোমেলো করতে পারে বন্য হাতির মত, এ কলাবাগান দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি যে এরকম উন্মত্ততা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান করতে পারে।

তিনি আরো বলেন, বাসন্তী দি দু’ থেকে তিনটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এরকম একটি কলাবাগান গড়েছেন। কিন্তু এই কলা গাছকে বনবিভাগ হত্যা করেছে। আজকে কলাগাছ হত্যা কালকে আদিবাসীদেরকেই হত্যা করবে। এই কলাগাছ নিধনের মধ্যেই তাই আমি আদিবাসীদের রক্ত দেখতে পায়। বনবিভাগকে ঘেরাও করতে হবে, যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ জারি রাখতে আদিবাসীদের আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারন সম্পাদক অলীক মৃ’র সঞ্চালনায় উক্ত সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠনের সভাপতি জন জেত্রা, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জহুরুল ইসলাম, জন উদ্যোগ জাতীয় কমিটির তারিক মিঠুল এবং বিশিষ্ট লেখিকা ও অনুবাদক অদিতি ফাল্গুনী। এছাড়া উক্ত সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় গারো ও কোচ আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনতা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *