নানা আয়োজনে আগামীকাল পালিত হবে এমএন লারমার ৮১ তম জন্মদিবস

আগামীকাল ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০। পাহাড় তথা সমতলের আদিবাসী ও নিপীড়িত মানুষের মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা’র ৮১ তম জন্মদিবস। এ উপলক্ষ্যে পাহাড় তথা সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনসমূহ নানা উদ্যোগ গ্রহন করেছে। এ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে আগামীকাল অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে আইপিনিউজ এর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন আগামীকাল সকাল ১১ টায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আলোচনায় অনলাইনে অংশ নিবেন ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি ও সাংসদ রাশেদ খান মেনন। এছাড়াও উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারন সম্পাদক কমরেড শাহ আলম, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস ও ড. জোবাইদা নাসরীন। আদিবাসী ফোরামের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক হরেন্দ্রনাথ সিং এর পরিচালনায় উক্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং।

এছাড়া সামাজিক দূরত্ব ও কোভিড-১৯ এর স্বাস্থ্য বিধি মেনে মহান নেতা এম এন লারমার ৮১তম জন্মদিবস উপলক্ষে আগামীকাল বিকাল ৪:০০ ঘটিকায় রাঙ্গামাটিতে এম এন লারমা স্মৃতি গণপাঠাগারের উদ্যোগে পাঠাগার কার্যালয়ে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন পাঠাগার সংশ্লিষ্টরা। এম এন লারমা স্মৃতি গণপাঠাগারের সভাপতি সুমন চাকমার সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক ইন্টুমনি তালুকদার।
এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের উদ্যোগে রাঙ্গামাটির কল্যাণপুরে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০:০০ টায় আলোচনা সভা এবং সন্ধ্যা ৬:০০ প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে বলে আইপিনিউজকে জানিয়েছেন উক্ত সংগঠন সমূহের নেতৃবৃন্দ।
এছাড়াও বাংলাদেশ আদিবাসী কালচারাল ফোরামের উদ্যোগে বিকাল ৫:০০ টায় অনলাইন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কবিতা পাঠের আসর আয়োজন করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন সংগঠনটির সাধারন সম্পাদক চন্দ্রা ত্রিপুরা। চন্দ্রা ত্রিপুরার সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিতব্য উক্ত কর্মসূচি আদিবাসী কালচারাল ফোরামের ফেসবুক পেইজ থেকে সরাসরি প্রচার করা হবে বলেও আইপিনিউজকে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

এদিকে অনলাইন নিউজপোর্টাল ‘হিল ভয়েস’-এর উদ্যোগে এম এন লারমার ৮১তম জন্মদিবস উপলক্ষ্যে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার বিশেষ প্রকাশনা বের হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ প্রকাশনায় এম এন লারমার বড় বোন ও সংগ্রামী নেত্রী জ্যোতি প্রভা লারমা, জনসংহতি সমিতির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট লেখক বাচ্চু চাকমা, পিসিপির নিপন ত্রিপুরা ও মিতুল চাকমা বিশাল প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের লেখা থাকবে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য যে, রাঙ্গামাটি শহরের অনতিদূরে এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম মহাপূরমের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর । তাঁর পিতা সেই গ্রামেরই জুনিয়র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক চিত্ত কিশোর চাকমা ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, মানবতাবাদী, সমাজসেবী ও গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার অধিকারী। মাতা সুভাষিণী দেওয়ান ধর্মপ্রাণ ও স্নেহময়ী।
১৯৫৬ সাল থেকে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনে পদার্পন করা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা ছিলেন ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা। তিনি ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে এবং ১৯৬০ সালে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯৬০ সালে পাহাড়ী ছাত্র সমাজে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৬২ সালে অনুষ্ঠিত পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন।১৯৬১ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। এর ফলে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নিবর্তনমূলক আইনে আটক (চট্টগ্রামের পাথরঘাটাস্থ পাহাড়ী ছাত্রাবাস হতে) করে। দুই বছরের অধিক কারাবোগের পর ১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ চট্টগ্রাম কারাগার থেকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি লাভ করেন।

১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেন এবং ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট ৪ দফা সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিনামা পেশ করেন।

তাঁর উদ্যোগে ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গঠিত হয়। জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে বীরেন্দ্র কিশোর রোয়াজা ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে জুম্মদেরকে ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রতিবাদে গণ পরিষদ অধিবেশন বর্জন করেন এবং বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাক্ষর প্রদান থেকে বিরত থাকেন।পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের লক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে তিনি ১৯৭৫ সালে বাকশালে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে নিয়মাতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল পথ রুদ্ধ তিনি আত্মগোপনে যান এবং সশস্ত্র আন্দোলনের হাল ধরেন।

১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর ভোর রাতে বিভেদপন্থী গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্রের বিশ্বাসঘাতকতামূলক অতর্কিত আক্রমণে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার খেদারাছড়ার থুমে নির্মমভাবে নিহত হন আদিবাসী তথা নিপীড়িত মানুষের পরম বন্ধু মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *