“সমতলের ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব, কারাম বৃক্ষ সংরক্ষণ ও প্রকৃতি রক্ষা’’ – উজ্জল মাহাতো

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উৎসব বলতে প্রথমেই সকলের মাথায় আসে ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই, আর চাকমাদের বিজু; তিন সম্প্রদায়ের উৎসবের নামের আদ্যক্ষর দিয়েই নামকরণকৃত বৈসাবি উৎসবের কথা। সমতলের আদিবাসীরা এখানেও অবহেলিত। তাদের উৎসবের কথা কমই মনে পড়ে। প্রকৃতির ভাদ্র মাসের একাদশীতে পালিত কারাম উৎসব। বাংলাদেশের সমতলের কয়েক লক্ষ আদিবাসীর প্রাণের উৎসব এটি।

কারাম উৎসবের পূর্বে ভাইয়ের কাছে বোনের আকুতি
বেহিন: ভাঁয়ারে, ভাসালে না গেঁরিয়াই
সভেরে সাতাভেল
ডালাওয়া সাঁঙ্গা পরিগেল,
ভ্যায়া: বেহিন গে, পরে দে ভাদারা মাস
আঁওয়ে দে কারামা
কিনি দেবাও ডালওয়া
তবে পুঁজবে কারামে গোসাই।

অনুবাদঃ
বোন: ভাই, মেঘ বইয়ে যাচ্ছে,
আমার ডালা কোথায়?
ভাই : বোনরে আসতে দে ভাদ্র মাস
আসুক কারাম
কিনে দেব ডালা
তবে করবি কারাম পুজা।

এটি হল সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘কারাম’ এর একটি গীত (উজ্জল মাহাতো রচিত কুড়মি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতি সংবলিত উপন্যাস ‘কারাম’ থেকে সংকলিত)। যা কুড়মি (মাহাতো) জাতির কুড়মালি ভাষায় লিখিত। শব্দগুলো চর্যাপদের পদ এর মতো হচ্ছে? গবেষকগণের ধারণা চর্যাপদের সাথে কুড়মালি ভাষার শব্দের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারাম ভাদ্র মাসের একাদশীতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সমতলের বিশেষ করে রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, সিলেট, অ লে এই সময় অনেক চা লতা ও ধর্মীয় উদ্দীপনার সাথে কারাম উৎসব পালন করা হয়। সাঁওতাল, উরাও, মাহাতো, বড়াইক, কুড়মি, সিং, পাহান, মাহালি সহ আরো কতিপয় নৃগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ রীতিতে পালন করে থাকে। কারাম নামক গাছের ডাল কেটে বিভিন্ন প্রাচীন প্রথা মান্য করে এই উৎসব করা হয় তাই এর নাম কারাম। ডাল গেড়ে পুঁজো করা হয় তাই এটি কোথাও কোথাও ডাল পুঁজো নামে পরিচিত।

কারাম উৎসবের পূর্বে ভরা বন্যায় স্বামী বউকে বাপের বাড়ীতে যেতে মানা করছে
বহু : পরালাই ভাদারা মাস
লাগালাই নেঁহিরাক আস,
দিনা চাঁরিক শোশুর যিঁবাই নেঁহিরাগো \
সঞা : ভরালাই মাঁই নেঁদী নালা ভরালায় সমুনুয়া
কে সে কেরি বহু যিঁবে নেঁহিরাগো?
বহু : কাটাবাই কাঁশিকুঁশি বান্ধাবাই
মাঁয়া নাওয়াঁ, ওঁহি চেঁড়হি সঞা
যাঁইবাই নেঁহিরাগো।

অনুবাদঃ
নববধূ : পড়েছে ভাদ্র মাস
বাপের বাড়ির কথা মনে পড়েছে
শুর দিন চারেকের জন্য বাপের বাড়ি যাই।
স্বামী : মা ভরেছে নদী নালা ভরেছে সমুদ্র
কেমনে তুমি যাবে বাপের বাড়ি?
নববধূ : কাশিকুশি কেটে বাধব
ছোট ভেলা
তার উপর উঠে স্বামী বাপের বাড়ি যাব \

কারাম উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা ৫ দিনের। কোথাও কোথাও ৭ দিন যাবৎ এই অনুষ্ঠান করা হয়। প্রথম দিন থেকেই কেরমেতিদের আমিষ হলুদ, তেল ও সকল প্রকার মসলা জাতীয় খাদ্য পরিহার করতে হয়। কেরমেতি বলতে যারা কারাম পুঁজায় অংশ গ্রহণ করে তাদের বোঝায়। তারা বিশ্বাস করে যদি এই খাবার পদ্ধতির কেউ অনিয়ম করে তাহলে ওরা অংশের জাঁওয়া মরে যায়। জাঁওয়া বলতে বোঝায় মাটি, বালি, মুং, কুর্থি, ছোলা ইত্যাদি উপকরণ সামগ্রীর সমন্নয়ে চারা গাছের যে ডালা তৈরী করা হয়। এটি আসলে অর্থে বৃক্ষের অঙ্কুরোদগমকেই বোঝায়। কৃষি ও বৃক্ষের সাথে আদিবাসীদের আত্মার সম্পর্ক। বিভিন্ন রকম আচার ও গীত এর মাধ্যমে জাঁওয়া তোলা হয়। প্রত্যেক দিন রাতে একই রকম আচার, গীত ও ঝুমুর এর মধ্য দিয়ে জাঁওয়াতে পানি দেওয়া ও জাগানো হয়। অর্থ্যাৎ প্রকৃতির বন্দনা করা হয়। নিয়মিত পরিচর্যায় বীজগুলো এ সময় দুই পাতা বিশিষ্ট হলুদ্রাভ সবুজ চারাগাছে পরিনিত হয়। প্রতীকী অর্থে বৃক্ষ রোপণ করার পর তার পরিচর্যাকে বোঝানো হয়। শেষের দিন কেরমেতিরা রাতে আঙ্গিনায় কারাম ডাল গেড়ে শাপলা ফুল, শশা, ফিতা প্রভৃতি দিয়ে সাজিয়ে, ডালের গোড়ায় ডালাগুলো রেখে জলন্ত প্রদীপ ও বরণ সাজে সজ্জিত কাসার থালা নিয়ে অধীর আগ্রহে কাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রথা বুকে লালন করে পুঁজোয় মনোনিবেশ করে। কার্মা ধার্মার উপদেশ মূলক গল্প জানা বৃদ্ধার নীতি গল্প শুনতে শুনতে এবং সঠিক সময়ে ডালকে প্রনাম ও ফুল ছিটয়ে ঐ রাতেই পুঁজোর কাজ সমাপ্ত হয়। গল্পটি সকলের চরিত্র গঠনে বিশেষ ভুমিকা রাখে। পরক্ষণে রাতভর কারাম ডালকে ঘিরে ঢোল, কাশি ও নিজ নিজ বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ঝুমুর ও গীত পরিবেশিত হয়। শিশু কিশোর, যুবক যুবতী, বয়স্কদের সমন্বয়ে ঢোলের বাড়ি ও প্রদীপের আলোর পুরো আদিবাসী পল্লীগুলোতে নৈসর্গিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরের দিন সকালে সকলে মিলে বিভিন্ন আচার সেরে গীত গাইতে গাইতে কারাম ডালকে নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।

কারাম ডাল বিসর্জনে সকলে মিলে গাইছে-

জাওয়া জাওয়া কারাম গাঁসা
কাস নেঁদী পার
ঘুঁরি ভাঁদার মাসে
আঁনবোও ঘুঁরাইকে
দিঁহে দিঁহে কারাম গাঁসা দিঁহে আঁশীষ \
দেঁলিও গেঁ কারমেতি দেলিও গে আঁশীষ
তঁহর বাপ ভাই যাঁতে বাঁচেও লাখে বাশিষ।
অনুবাদঃ
জাওয়া জাওয়া কারাম গোসাই
কাঁশ নদী পারে
পরের ভাদ্র মাসে
ফিরিয়ে আনব
কারাম গোসাই দিয়ো আমাদের আশীর্বাদ \
কারমেতি দিলাম তোমাকে আশীর্বাদ
তোমার বাবা ভাই যেন বাঁচে লক্ষ বছর।

কারাম উৎসবে মূলত কেরমেতিরা তার বাবা ও ভাই এর দীর্ঘায়ু কামনা করে। সেই সাথে বৃক্ষের বন্দনা করে থাকে। কিছুদিন আগে ভারতের ঝাড়খন্ডে শালগাছ নিধনের ধ্বংস যজ্ঞ চলে। হাজার হাজার গাছ তারা সহসায় কেটে ফেলে। অষ্ট্রেলিয়ার দাবানলে পুড়ে ছাই হাজার হাজার গাছপালা ও পশুপাখি। আমাদের দেশ ও তার ব্যতিক্রম নয়।

মুজিববর্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ কোটি গাছের চারা বিতরণ করেন, যে গাছগুলো আমাদের বিশুদ্ধ বাতাস ও সুশীতল ছায়া দিবে। কুড়মিরা প্রকৃতি প্রিয়। কৃষি ও গাছের সাথে এদের নিবিড় সম্পর্ক। কারাম উৎসব ও গাছের সাথে সম্পর্কিত। সৃষ্টির আদি থেকে এই উৎসব আজও চলমান তবে বর্তমানে কারাম বৃক্ষের সংকট দেখা দিয়েছে। গবেষকগণের মতে সুন্দর বনে মাত্র কয়েকটি গাছ রয়েছে। আর কিছু সংখ্যক রয়েছে এই সকল জনগোষ্ঠীদের নিজ নিজ এলাকায়। কারাম গাছটি সরকারীভাবে সংরক্ষণ এখন অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু এলাকায় এই গাছ একটাও নেই । তারা অন্য গাছের ডাল দিয়ে এই উৎসব পালন করছে।
এক বিংশ শতাদ্বীতে এসেও তারা তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে দৃড়ভাবে প্রতিজ্ঞ। সংশ্লিষ্ট সকলের সহায়তা পেলেই রক্ষা পাবে সমতলের আদিবাসীর বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে থাকা নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি।

উজ্জল মাহাতো
গবেষক ও লেখক।
uzzalmahato14@gmail.com

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *