জাতীয় আদিবাসী পরিষদ: সংগ্রাম ও গৌরবের ২৭ বছর (প্রেসনোট)

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের পঠিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি হুবুহু প্রকাশ করা হলোঃ-

সংগ্রাম ও গৌরবের ২৭ বছর
৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ জাতীয় আদিবাসী পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ও বর্তমানে আদিবাসীদের জীবনের সংকট এবং তাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে

সংবাদ সম্মেলন

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।

প্রিয় বন্ধুগণ,
আপনারা অবগত আছেন যে, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ দেশের উত্তরা লের সমতল ভূমিতে ৩৮টি আদিবাসী জাতিসত্তার প্রায় বিশ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস রয়েছে। সমতলে বসবাসরত আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯৩ সাল থেকে অদ্যবধি আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে। আপনারা জানেন আদিবাসীরা সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ। এই সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন সময় আদিবাসীদের অত্যাচার, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, জাল দলিল, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যা মামলা, লুটপাট জবর দখল, দেশ ত্যাগে বাধ্য করা সহ নানা নির্যাতন নিপিড়নের শিকার হয়ে আজ তারা সর্বশান্ত ও ভূমিহীনে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা বারবার ঘটছে। আদিবাসীরা এখন নিজ দেশে পরবাসীর ন্যায় জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। কিছু ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
২০০০ সালে নওগাঁ জেলার ভূমিদস্যু হাতেম গোদাইদের সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা ভীমপুর গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে ফেলা ও আদিবাসীদের নেতা আলফ্রেড সরেনকে হত্যা। ২০০৯ সালে পোরশা থানার খাতিরপুর সোনাডাঙ্গায় ৭৩টি আদিবাসী পরিবারকে উচ্ছেদ ও তাদের বসতবাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২০১০ ও ২০১১ সালে নিয়ামতপুর থানার নাকইল আদিবাসী বারাম্বাড়ি আদিবাসী পাড়ায় অগ্নিসংযোগ ও তাদের পৈত্রিক জমি জবর দখল।

২০১১ সালে গোদাগাড়ী থানায় কার্তিক কিস্কুকে হত্যা, ২০১৩ সালে নওগাঁর মান্দা থানায় ৪ জন আদিবাসীকে পিটিয়ে হত্যা। ২০১৪ সালে পতিœতলা থানায় ৮ম শ্রেণীর ছাত্র মিঠুন উরাওকে গুলি করে হত্যা। ২০১৬ সালে রাজশাহী কলেজের মাস্টার্স বর্ষের ছাত্র তানোর থানার মহেনপুর গ্রামের বাবলু হেমব্রমকে নিজ বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় গলাকেটে হত্যা।

২০১৪ সালে দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানার কচুয়া (ডাড়কামারী) গ্রামের ঢুডু সরেনকে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, পার্বতীপুর থানার হাবিবপুর, চিড়াকুটা গ্রাম লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। ২০১৬ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মে রংপুর চিনিকল কতৃপক্ষ, সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলা এবং গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের গুলিতে ৩ জন আদিবাসীকে হত্যা, তাদের ঘরবাড়িতে পুলিশ কতৃক অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ নারীদের শ্লীলতাহানী ও শিশুদের স্কুলঘর পুড়িয়ে দেয় এবং একশ দশ জন আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ৮টি মামলা করে । চাপাইনবাবগঞ্জ জেলা গোমস্তাপুরের জাতীয় আদিবাসী পরিষদের নেত্রী বিচিত্রা তির্কির ৪৮ বিঘা জমি দখলের উদ্দেশ্যে ভূমিদস্যুরা তার উপর নির্মম নির্যাতন চালায়।

২০১৯ সালে নওগাঁর ধামুইরহাটের কাগজকুটা গ্রামে আদিবাসী পল্লিতে হামলা, অগ্নিসংযোগ। একই উপজেলার জাম্বু চড়েকে হত্যা।
এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুর জেলার সদর থানার কর্নাই গ্রামের শ্রীমতি বড়কুল কিস্কুর ১৪ একর জমি ভূমিদস্যু হাসান আলি জাল দলিল করে জবর দখলের চেষ্টা এবং তার ছেলে বিশু মুর্মু অরপে কাটি মুর্মুর বিরুদ্ধে ২৫ আগষ্ট ২০২০ তারিখে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানী, যার মামলা নং ৬৫/৬২৭। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ইটাহারী গ্রামে একজন আদিবাসী নারীকে ধর্ষণ চেষ্টা করা হয় এবং এই ঘটনায় গোদাগাড়ী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। যার মামলা নং ১০/২৯৭। ঘটনার মুল আসামী জহিরুল ইসলামকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারে নি। । সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গা থানায় ৩৩টি আদিবাসী পরিবারকে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে মো: দেলবার খার নেতৃত্বে ১০০ জনের দেশীয় অস্ত্রেসস্ত্রে সজ্জিত সন্ত্রসী বাহিনী আদিবাসীদের বসত বাড়ীতে হামলা করে। এই ঘটনায় আদিবাসীরা সলঙ্গ থানায় ১৩ এপ্রিল ২০২০ তারিখে ১২/১১৫ নং মামলা করলে হামলাকারীরা নিজেদের লোককে হত্যা করে আদিবাসীদের মামলার বিরুদ্ধে সলঙ্গ থানায় ১৩/১১৬ নং মিথ্যা মামলা করে। মামলা এবং পুলিশের ভয়ে আদিবাসী গ্রামটি এখন পুরুষ শুন্য হয়ে গেছে। নারী শিশু ও বয়স্করা আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতায় দিনযাপন করছে। নওগাঁর নিয়মতপুরের কুমরইল কানুপাড়া মৌজার লক্ষীরাম চড়েঁর সাড়ে ২২ বিঘা জমি একই এলাকার ডিবি পুলিশ কর্মকর্র্তা মাসুদ রানা ভুয়া পারমিশন নিয়ে জাল দলিল দেখিয়ে জবর দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশিত হয়েছে। এই জেলার পোরশা থানার গাঙ্গুরিয়া ইউনিয়নের সারাইগাছি গ্রামের কোল সম্প্রদায়ের ১.৭ একর শশ্মানঘাটের জমি এলাকার হারুনুর রশিদসহ ৮ জনের সন্ত্রাসীগং দখল করার চেষ্টা করছে। একই গ্রামের শ্রীমতি সেনচেরী পাহানের ০.৩৩ শতক বসত ভিটা দখলের অভিযোগ উঠেছে খাদেমুল শেখসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে। বগলগাছি থানায় নরেশ উরাওয়ের ২৮ একর জমি দখলের উদ্দেশ্যে উক্ত থানার গোয়েশপুর গ্রামের ভূমিদস্যু হাসিনুর কামান্না চৌধুরী আদিবাসীদের বিরুদ্ধে মাদক, সন্ত্রাসী, চাদাবাজীতে ৮টি মামলা করে হয়রানী করছে। তাদের মধ্যে তিন জন এখনো জেল হাজতে রয়েছে। যার মামলা নং ১২৯/২০। এছাড়াও উত্তারা লের বিভিন্ন জেলায় আদিবাসীদের উপর ঘটে যাওয়া অসংখ্য অত্যাচার নির্যাতনের ঘটনা রয়েছে যেগুলো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব হয় নি। এসব ঘটনার কোন বিচার হয় নি।

বন্ধুগণ,
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ এ সকল ঘটনার বিচারের দাবীতে অসংখ্যবার মানববন্ধন, ঘেরাও, বিক্ষোভ, লংমার্চ এবং সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের নিকট স্বারকলিপি প্রদান করে আসছি। কিন্তু কোন প্রতিকার এবং সুবিচার পাওয়া যায় নি। ভূমিদস্যু এবং সন্ত্রাসীরা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং আদিবাসীদের প্রতি মহূর্তে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে যাচ্ছে। আদিবাসীদের উপর নিপিড়ন, ভূমি দখল, উচ্ছেদ, ধর্ষণ, হত্যার মামলায় থানা পুলিশ, স্থানীয় অসৎ জনপ্রতিনিধি ও ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের পক্ষাবলম্বন করে সহায়তা করে আসছে। ফলে আদিবাসীরা আরও অসহায় হয়ে পড়ছে।

সাংবাদিক বন্ধুগণ,
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ বারবার সরকারের নিকট দাবি উত্থাপনের ফলে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোসনা করেছে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহার দেখে আদিবাসী জনগন আসস্ত ও বিশ^াস করেছিল যে, এবার তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় নি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার প্রেসনোটের সাথে সংযুক্ত করা হল।

বন্ধুগণ,
আদিবাসীদের জীবন ও জনপদ বাঁচাতে নি¤œক্ত দাবি ও কর্মসূচি ঘোষনা করছিঃ
আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রনালয় ও স্বাধীন ভূমি কমিশণ গঠনের রোড ম্যাপ ঘোষনা করতে হবে।
সকল আদিবাসী জাতিসত্তার শিশুদের জন্য নিজ মাতৃভাষায় প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
আদিবাসীদের বেদখল সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারী খরচে আইনগত সহায়তা দিতে হবে।
জাতীয় বাজেটে সমতল আদিবাসীদের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্ধ দিতে হবে।
সকল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিও বিশেষ সুযোগ, ১ম ও ২য় শ্রেণীসহ সকল সরকারি চাকুরীর ক্ষেত্রে কোটা কার্যকর করতে হবে।
অর্পিত সম্পত্তি আইনের আওতায় থাকা আদিবাসীদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে হবে।
প্রতিটি জেলায় আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমী প্রতিষ্ঠা, রাজশাহী বিভাগীয় আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমীতে উপ-পরিচালক পদে নিয়োগসহ, দিনাজপুর, নওগাঁর আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমীতে দ্রুত জনবল নিয়োগ ও সরকারীকরণ করতে হবে।
ছিন্নমুল ও উদ্বাস্তু আদিবাসীদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
আদিবাসীদের দখলে থাকা খাস জমি, পুকুর, শশ্মান ও করবস্থান আইনগত মালিকানা দিতে হবে।
আদিবাসীদের উপর সকল প্রকার নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যা মামলা, জবর দখল, উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে।
করোনার ফলে চরম খাদ্য ও আর্থিক সংকটে থাকা আদিবাসী পরিবারকে বিশেষ বরাদ্ধ দিতে হবে।
কর্মসূচি
৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলায় একযোগে উপরোক্ত দাবিতে আদিবাসী সমাবেশ, মানববন্ধন, মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।

আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

রবীন্দ্রনাথ সরেন,
সভাপতি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *