করোনাকালে খাসিয়া ও গারো আদিবাসীরা ভালো নেই: আইপিডিএস

করোনাকালে খাসিয়া ও গারো আদিবাসীরা ভালো নেই । করোনার কারণে আদিবাসীরা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখী হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণে সরকার, বেসরকারী সংস্থাসমূহ বিভিন্নভাবে কাজ করছে। মূলত মৌলভীবাজার অঞ্চলের গারো ও খাসিয়া পুঞ্জিতে বসবাসরত আদিবাসীদের জীবন, জীবিকা ও তাঁদের সংগ্রাম নিয়ে আইপিডিএস এর এক আলোচনায় এই কথাগুলো বলেন বক্তারা। গত ৩০ আগষ্ট রবিবার বেসরকারী সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগীতায় এবং ইন্ডিজিনাস পিপলস্ ডেভলপমেন্ট সার্ভিসেস (আইপিডিএস) এর আয়োজনে এক অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আইপিডিএস এর সভাপতি সঞ্জীব দ্রং এর পরিচালনায় বেসরকারী সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জাহেদ হাসান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার অঞ্চলের স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দ এবং মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ।

কুলাউরা ও বড়লেখা অঞ্চলের আইপডিএস এর সমন্বয়ক অরিজিন খোংলা বলেন, কুলাউরা এবং বড়লেখা অঞ্চেলের গারোরা দীর্ঘ চার মাস ধরে লকডাউনের মধ্যে আছেন। এই সময়ে তারা অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশার মধ্যে আছেন। প্রথাগত লকডাউনের মধ্যে থাকায় পান বিক্রিতে তাঁদের অসুবিধা হচ্ছে।আইপিডিএস থেকে এযাবৎ ৩৫০ টি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও আগামীতে ২৩০ পরিবারকে ২৫০০ টাকা করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহায়তায় নগদ অর্থ সহায়তাও প্রদান করা হবে । তবে সরকারী ও অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকে যে সহায়তা দেওয়া হয়েছে তা অনেক অপ্রতুল।

উক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে কুবরাজ আন্ত-পুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন এর উপদেষ্টা এবং ফাদার যোসেফ গোমেজ বলেন, আমরা করোনা শুরুর প্রথমদিকে পুঞ্জিতে পুঞ্জিতে গিয়ে আমরা উঠান বৈঠক করেছি। পুঞ্জিতে যেন স্বাস্থ্যবিধি পালন করা হয় এবং যথাযথ লকডাউন পালন করা হয়। বাংলা ও খাসিয়া ভাষায় লিফলেট তৈরী করে সেগুলো জনসাধারণের কাছে বিতরণ করেছি।

তিনি আরো বলেন, পুঞ্জিতে যেন করোনা হানা দিতে না পারে সেজন্য পুঞ্জির বাইরে নির্দিষ্ট জায়গায় পান বেচা কেনা চলছে যা এখনো চলমান রয়েছে। এছাড়া বাজার থেকে কেনা সামগ্রী সতর্কভাবে পুঞ্জির মধ্যে প্রবেশ করানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। গত তিন মাসে পুঞ্জিতে কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছেনা যার জন্য এখনো পুঞ্জি করোনামুক্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।

আদিবাসী ফোরামের ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক রিপন চন্দ্র বানাই বলেন, এই করোনাকালে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থার মধ্যে পড়েছে সংখ্যায় ছোট আদিবাসীরা। তার মধ্যে বানাই, কোচ, হাদি, ডালুই যারা আছে তারা। করোনা তাঁদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে। তাদের আয় রোজগারের মূল পন্থাটি হলো শ্রম বিক্রি করা। কিন্তু করোনাকালে সেটা একবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারী স্থানীয় প্রশাসনের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে তেমন কোনো ত্রানও পৌঁছায়নি এবং আদিবাসীরাও কারো কাছে সহায়তা চায়নি। বিউটিশিয়ান, গার্মেন্টস ফেক্টরীর শ্রমিক কিংবা ড্রাইভার হিসাবে চাকুরী করা আদিবাসীরা আরো বেশী খারাপ অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কুবরাজ আন্ত-পুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন এর সাধরন সম্পাদক ও আদিবাসী নারী নেত্রী ফ্লোরা বাবলী তালাং বলেন, খাসিয়ারা মূলত পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই সময়েই পান চাষের মৌলিক কাজগুলো করতে হয়। কিন্তু প্রথাগত লকডাউন চলমান থাকায় শ্রমিকরা পুঞ্জিতে ঢুকতে পারছে না। যার ফলে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। কাজ করতে না পারার ফলে পান চাষ ব্যহত হচ্ছে এবং আগামীতে পান উৎপাদন কম হবে যার জন্য অথ্যনৈতিক চাপের মধ্যে পড়তে হবে।

পানের দাম এই সময়ে কমে যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, খাসিয়া আদিবাসীরা এই সময়ে নানাভাবে ঋণগ্রস্থ হচ্ছেন। মহাজন কিংবা পান ব্যবসায়ীর কাছে অগ্রীম পানের টাকা নিয়ে চলতে হচ্ছে যার জন্য আগামীতে ঋণগ্রস্থ হয়ে বিপদে পড়ার আশংকার কথাও জানান তিনি। এছাড়া গর্ভবতী মহিলা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সেবা খুব নাজুক এবং সংসদ টিভির মাধ্যমে যে পাঠদান করা হচ্ছে তা খাসিয়া আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য বোধগম্য নয়।

আইপিডিএস এর নিজস্ব ফেসবুক পেইজ থেকে সম্প্রসারিত এই লাইভ আলোচনায় জাহেদ হাসান বলেন, আইপিডিএস এর গবেষণায় উঠে এসেছে করোনার এই সময়ে সমতলের ৯২শতাংশ আদিবাসীর আয় কমে গেছে। নানা বৈষম্যের মধ্যে থাকা আদিবাসীরা এই সময়ে আরো বেশি কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। যার জন্য সবার সহযোগীতা প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, আমরা যারা উন্নয়ন কর্মীরা নানাভাবে খাসিয়া পুঞ্জির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি তাঁরা অনেকেই জানি যে, নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে আমরা পুঞ্জির মানষজনকে সংযুক্ত করতে পারিনা। সে জায়গায় কীভাবে অনলাইন ক্লাসের সুবিধা খাসিয়া আদিবাসী শিশুরা নেবে।

তিনি আরো বলেন, আমি যখন মৌলভীবাজারের খাসিয়া পুঞ্জিতে গিয়েছিলাম তখন দেখেছি যে সেখানকার আশেপাশে কোনো হাসপাতাল নেই। এখন হয়ত সেখানে করোনা নেই। কিন্তু অন্য কোনো রোগী কিংবা কোনো কারণে যদি করোনারও সংক্রমণ ঘটে তাহলে সেই পুঞ্জি থেকে স্বাস্থ্যসেবার জন্য রোগীকে কোথায় নিয়ে যাবে সেটাই উদ্বেগের বিষয়।

এছাড়া তিনি বলেন, করোনাকালে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নিজস্ব উদ্যোগে বিউটি পার্লারের চাকুরী হারানো ১২৫ টি আদিবাসী গারো মেয়েকে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। আগামীতে আরো কিছু পরিবারকে আমরা আগামী তিন মাস এধরণের সহায়তা দিবো। এ ধরণের সহযোগীতা প্রদান মানে তাদের সহায়তা নই তাদের অধিকার। যার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে বলেও জানান তিনি।

আইপিএস এর সভাপতি সঞ্জীব দ্রং বলেন, একটি সমাজ কতখানি গণতান্ত্রিক ও সভ্য সেটার বিচার্য বিষয় হওয়া উচিত এ দেশের খাসিয়া, গারো ও সান্তাল মানুষ কেমন আছে। এই কঠিন করোনা সময়ে সবাইকে একসাথে সংযুক্ত থেকে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে বাঙালি আদিবাসী সবাই একসাথে উৎযাপনে মেতে ওঠার মত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে বলেও দাবী করেন এই আদিবাসী নেতা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *