ফুলবাড়ী আন্দোলনঃ একজন পলায়নবাদীর বয়ান – দীপায়ন খীসা

ফুলবাড়ী কয়লা খনি আন্দোলন নিয়ে অনেক নিবন্ধ, রচনা এবং গবেষণা পুস্তুকও প্রকাশিত হয়েছে। লেখকবৃন্দ কোন না কোন ভাবে ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে অনেক-অনেক জ্ঞান রাখেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে আমার মতো লেখকদের সংখ্যায় বোধ হয় বেশি। যারা দু-তিন দিন ফুলবাড়ী কাটিয়ে এসে, সর্বোচ্চ শো খানেক লোকের সঙ্গে কথা বলে একেবারে কয়লা বিশেষজ্ঞ হয়ে যান। আমিও সেসব বিশেষজ্ঞ (!) লেখকদেরই একজন হিসেবে একটু বেশি স্পর্ধিত চিত্তে ফুলবাড়ী নিয়ে জ্ঞান বিতরণের সুমহান কাজে হাত লাগালাম। খুব বেশি দিন হয়তো নয়। ৩৬৫ দিন ছুঁই-ছুঁই করছে। বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আহ্বানে আমার ফুলবাড়ী যাওয়া। যাদের সঙ্গে ফুলবাড়ী যাওয়া তাদের প্রধান কাজ ছিল গান গেয়ে, আবৃত্তি করে মহল্লায় – গ্রামের পথে-পথে ঘুরে-ঘুরে আন্দোলনের জন্য জনগণকে সচেতন করে তোলা। আমি গায়ক কিংবা আবৃত্তিকার কোনটাই নই। আমার কাজটা ছিল গানের খাতা বহন করা আর তাদের পিছন-পিছন পথ চলা। সে-সঙ্গে একটি আন্দোলনকে অনুধাবন করার চেষ্টা করা।

২৬ আগস্ট ২০০৬ ছিল ফুলবাড়ী এশিয়া এনার্জী অফিস ঘেরাও করার দিন। ঘেরাও কর্মসূচিকে সফল করতে ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্র, শিক্ষক, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতিক কর্মীরা ফুলবাড়ীতে জড়ো হয়েছিলেন। তাঁর অংশ হিসাবে আমাদের ফুলবাড়ী যাওয়া। গ্রাম-গঞ্জে আন্দোলনের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে ধারণা হয়েছে, মানুষ আন্দোলনের পক্ষে। তারা এশিয়া এনার্জীর হাতে দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের বিপক্ষে। কিন্তু ২৬ আগস্ট যে-গণ-বিষ্ফোরণ দেখলাম, তা আমার ধারণাতীত বললেও তেমন অন্যায় হবে না। ৪/৫ দিন গ্রামের পথে-পথে ঘুরেও আমি জনতার ক্ষোভের মাত্রা আগে থেকে বুঝতে পারিনি। এ-যে এক অনন্য গণ-জাগরণ। চারিদিকে শুধু মিছিল আর মিছিল। সাধারণতঃ আমরা ঢাকা শহরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমাবেশে যে-সব মিছিল দেখি, ফুলবাড়ী মিছিল ছিল তার চেয়ে ভিন্ন। এ-মিছিল ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগের ও প্রাণের জোয়ারে ভরপুর। এ-যে সাধারণ কোন মিছিল নয়। প্রতিটি শ্লোগানই আমার কাছে মনে হয়েছিলো রণ-হুংকার। জীবনে অনেক মিছিল দেখেছি, অনেক মিছিলে শরীকও হয়েছি। কিন্তু ফুলবাড়ী মিছিলের রণ-ধ্বনি আর জীবন জয় করা প্রতিরোধ আমার মনকে আজীবন ছুঁয়ে যাবে। ঢাকা মোড়, নীমতলা, ছোট যমুনা ব্রীজ-সহ ফুলবাড়ীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আত্মাহুতির মিছিলে যোগ দেয়া সে-সব জীবন আমার মানসপটে স্থায়ী বাসা বেঁধে থাকবে।

তবে সে-সব স্মৃতি বয়ান করা আমার লেখার উদ্দেশ্য নয়। ফুলবাড়ী আন্দোলনে জনগণের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের পাশাপাশি কিছু বিষয় আমাকে একটু অন্যভাবে ভাবিয়ে যায়। যমুনা ব্রীজের ওপাশ থেকে ছুটে আসা বুলেটকে যখন ফুলবাড়ীর জনতা একের পর এক বুকে আলিঙ্গন করে নিচ্ছিলো, তখন আমি দেখেছি আরেকটি ভিন্ন রূপ। ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সে-মিছিল অংশগ্রহণকারী একটি বিপ্লবী (?) মহল তখন জীবন ভয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজতে ব্যস্ত। একই সাথে যাওয়া সাথীকে ফেলে নিজের জীবনটা নিয়ে পালাবার পথ খুঁজতেও অনেককে দেখেছি। তখনও ফুলবাড়ীতে ছোপ-ছোপ তাজা রক্ত। রাজপথে ছড়ানো তাজা রক্ত একটুও মুছে যায়নি। প্রতিরোধের সারিতে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো জনতার মিছিল তখনও চলছে। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে তখন ঢাকা থেকে যাওয়া অনেক বিপ্লবী (?) উধাও। প্রতিরোধ সংগ্রামকে বেগবান করার পরিবর্তে ঢাকার নাগরিক বিপ্লবীদের অনেকে পালানোর পথ খুঁজছেন হন্যে হয়ে – একটু আগেও যাঁরা ছিলেন অসীম সাহসী। মাইক্রোফৌনে যাঁদের গলায় ছিলো অমিত তেজ, সে-সব লড়াকু মুখগুলো আমার কাছে হঠাৎ যেনো অচেনা হয়ে গেলো।

পলায়নের আয়োজন সম্পন্ন হলো। পরদিন সকালে নগরের বিপ্লবীরা (?) সদর্পে নিজেদেরকে অক্ষত অবস্থায় ঢাকায় পদার্পণের আনন্দে বিভোর হলেন। সকলেই মহা খুশী – আহা আমার জানটা বেঁচে গেলো। আমার মতো অনেকে হিসেব করছে ফুলবাড়ীতে কে কী রেখে এসেছে। সেগুলো কীভাবে পাওয়া যাবে। ঢাকায় পৌঁছার পরও নাগরিক বিপ্লবীদের (?) আরেকটা পিছুটান ছিলো। সেটা হচ্ছে ফেলে আসা ব্যাগ, কাপড়-চোপড় কিংবা নিজের কিছু জিনিষ-পত্রের জন্য। নিরাপদে ঢাকায় ফেরার পর পরিস্থিতি বুঝে নাগরিক বিপ্লবীরা (?) আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলেন। ভীমের রণ-হুংকার দিয়ে উদ্যত গদা হাতে তর্জন-গর্জন। এর প্রধান কারণ ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীর বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ পরের দিনের জাতীয় দৈনিকগুলোর অন্যতম শিরোনাম হওয়া। সাথে-সাথে ঢাকা ফেরত বিপ্লবীদের মধ্যে একটা হিড়িক পড়ে গেলো। পলায়নবাদীরা জোর গলায় সোচ্চার দাবী তুলতে লাগলেন যে, প্রতিরোধ সংগ্রামে তারাও শরীক ছিলেন। ২৭ আগষ্ট থেকে ঢাকায় বিভিন্ন মানব বন্ধন, সমাবেশ ও মিছিল শুরু হয়ে গেলো।

পলায়নবাদীরা বিভিন্ন সমাবেশে উচ্চকন্ঠে দাবী তুলতে লাগলেন, ফুলবাড়ীর প্রতিরোধ সংগ্রামে তাদের অনেক-অনেক অবদান ছিলো। বলতে লাগলেন, ২৬ আগস্ট তাঁরাও মারা যেতে পারতেন। কিন্তু সত্য হচ্ছে, নাগরিক বিপ্লবীরা কেউ মারা যাননি। যতো দূরত্বে থাকলে বুলেট বিঁধবে না, তার হিসাব রেখেই নাগরিক বিপ্লবীরা মিছিলে শরীক হয়েছিলেন। অস্বীকার করার উপায় নেই পলায়নবাদীদের সাথে আমিও ছিলাম। সুতরাং নাগরিক বিপ্লবীরা আসুন পলায়নবাদের অপবাদটা গায়ে লাগিয়ে ফুলবাড়ীর জনতার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিই। তবে ক্ষমা চাওয়ার ধৃষ্টতাও আমার নেই।

দীপায়ন খীসাঃ সম্পাদক, মাওরুম

২০ অগাস্ট ২০০৭ সালে লন্ডনের ukbengali.com থেকে প্রকাশিত

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *