খুলে দেয়া হয়েছে পাহাড়ের পর্যটন : জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্ধেগ বিভিন্ন মহলের

সতেজ চাকমা: করোনার চলমান প্রকোপের মধ্যেও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে শিক্ষা ব্যতীত অন্যান্য খাতের সকল কার্যক্রম। বিগত ৮ মার্চ সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে করোনারোগী শনাক্তের কথা জানা যায় বাংলাদেশে। তখন থেকেই দফায় দফায় সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অফিসগুলো বন্ধ থাকার পর খুলে দেওয়া হয়েছে সবকিছু। দেশের প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে গত ১৭ মার্চ থেকে যা এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি। টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রম কবে আবার ক্লাসরুমের স্বাভাবিক বাস্তবতায় ফিরে যাবে তা এখনও কেউ ঠিকমত বলতে পারছে না। অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এদিকে দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুবরণকারী সংখ্যা এখনো বেশ উদ্বেগর মধ্যে থাকলেও পাহাড়ে একে একে খুলে দেওয়া হয়েছে পর্যটন এলাকাগুলো।

উত্তরবঙ্গের সান্তাল, ওঁরাও, মুন্দা,মাহাতো এবং টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের গারোসহ অন্যান্য আদিবাসী এলাকাসমূহ এবং বৃহত্তর সিলেটের খাসিয়া পুঞ্জির নিজস্ব প্রথায় করোনা মুক্ত থাকার খবর বিভিন্ন মাধ্যমে ইতিমধ্যে জানা গেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ অন্যান্য সমতল এলাকাগুলোতে করোনার ছোবল তুলনামুলকভাবে প্রকট হলেও পাহাড়ের তিন পার্বত্য জেলায় করোনা তেমন বেশী প্রাণ সংহারী ও বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারেনি।এ বিষয়ে বিভিন্ন মহলের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত এবং আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুব বেশি নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নিপণ ত্রিপুরা বলেন, এর পিছনে মূল কারণ হচ্ছে, সরকার লকডাউন ঘোষনা করার অনেক আগে থেকেই পাহাড়ের আদিবাসী অধ্যুষিত জনপদগুলোতে নিজস্ব প্রথায় গ্রামে গ্রামে লকডাউন পদ্বতি অনুসরণ করা হয়েছে। তাছাড়া পাহাড়ের আদিবাসীদের নিজস্ব যে খাদ্যভ্যাস এবং পেশাগত যে বৈশিষ্ট সেটার জন্য তাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যার জন্য তাঁদের প্রথাগত সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যেই মহামারী উত্তোরণের অভিজ্ঞতা থাকায় তারা সহজেই এ বিষয়গুলো নিয়ে আগে থেকেই সজাগ ছিল। যার জন্য করোনা ভাইরাস পাহাড়ে তেমন বেশি তান্ডব চালাতে পারেনি বলে মনে করেন পাহাড়ের এই তরুণ। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটন খুলে দেওয়ার ফলে পাহাড়ের পর্যটন এলাকায় সমতল থেকে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণের আশংকা বেড়ে গেল বলেও উদ্বেগ জানান তিনি।

এ বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় ৫ মাসেরও অধিক বন্ধ খাকা এ পর্যটন খুলে দেওয়া হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে।গত ৩ আগষ্ট রাঙ্গামাটিতে সীমিত পরিসরে পর্যটন খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।এদিকে গত ২০ আগষ্ট বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২১ আগষ্ট ২০২০ থেকে পর্যটন স্পট ও জেলায় নিবন্ধিত আবাসিক হোটেল, মোটেল, রোস্তোরাঁ এবং রিসোর্ট সমূহ খুলে দেওয়ার কথা জানানো হয়। পর্যটকদের জন্য সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং গাইডলাইন অনুসরণের নির্দেশনার কথা উক্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।

এদিকে গত ২৩ আগষ্ট খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ছয় শর্তে আগামী ২৮ আগষ্ট থেকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পর্যটন স্পটসমূহ সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়ার কথা জানানো হয়। স্বাস্থ্য বিধি মানা সহ বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা থাকলেও এ বিষয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় কাজ করা স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা জাবারাং কল্যান সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা।

এক মুঠো আলাপে আইপিনিউজকে তিনি জানান, প্রশাসন কী বিবেচনা করে এইসময়ে পর্যটন স্পটগুলো খুলে দিলো আমি ঠিক জানি না।বাজারে বের হলে এখনো ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ মাস্ক ছাড়া ঘোরাফেরা করে। আর পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরন করা আধো সম্ভব কী না তা ভেবে দেখা দরকার।

তিনি আরো বলেন, অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা এবং প্রবৃদ্ধির জন্যতো আমাদেরকে অবশ্যই কাজ করতে হবে। থেমে থাকলে চলবে না। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত গ্রহনে স্থানীয় প্রশাসনের যদি বাস্তবসম্মত কোনো মূল্যায়ন থেকে থাকে তবে সেটা সবার সাথে খোলাসা করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য বিধি মানার ক্ষেত্রে এবং সবার মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য অবশ্যই সরকারকে আরো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান আইপিনিউজকে বলেন, প্রশাসন বলছে পর্যটন খুলে দিলেও তারা স্বাস্থ্য বিধির বিষয়টা কড়াকড়িভাবে দেখবে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণে জনগণ আসলে এখনো সেভাবে সচেতন নয়।যার জন্য এক ধরণের আশংকা থেকেই যায়। দোকানপাত ও বাজার যখন খুলে দেওয়া হয় তখন থেকেই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে গেছে বলেও মত দেন এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তবে এমন সময়ে পর্যটন খুলে দেয়া ঠিক হয়নি বলে অভিমত এই শিক্ষাবিদের।

এদিকে সাজেক এবং বান্দরবান জেলার নীলগীরি ও নিলাচলের পর্যটন স্পটের পাশের কয়েকজন আদিবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটন খোলার বিষয়টাকে তারা দু’ভাবে দেখছে। এতদিন পর্যটন স্পটগুলো বন্ধ থাকায় স্থানীয় জুম চাষীদের উৎপাদিত ফসলাদির দাম কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সেসব বিক্রি করতে না পারায় ক্ষতির সম্মুখীনও হচ্ছেন। যার ফলে আয় না থাকায় জীবিকার সংকটে থাকা এইসব আদিবাসীদের জীবন চলছে খুব কষ্টে। জীবন এবং জীবিকার এমনি সংকটে সমতল থেকে পর্যটনে ঘুরতে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিটাকে তারা তেমন গুরুত্বের সাথে দেখছেন না বলেও জানান পর্যটন জীবিকা সংশ্লিষ্ট এইসব মানুষ। তবে সরকারের কোনো রকম প্রণোদনা না পাওয়ার কষ্টের কথাও তুলে ধরেন আইপিনিউজকে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও বান্দরবানের উন্নয়ন কর্মী ডনাইপ্রু নেলী আইপিনিউজকে বলেন, করোনা যখন বান্দরবানে হানা দেয় তখন আমরা একটু চিন্তিত ছিলাম। জনসচেতনতা বাড়াতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারপরেও এখনো অনেকেই মাস্ক ছাড়াই অবাধে রাস্তাই ঘুরছে।এমনি সময়ে পর্যটন খুলে দেওয়াটা মোটেও ঠিক হয়নি।

তিনি আরো বলেন, বান্দরবানে করোনা সংক্রমণ যা হয়েছিল তার অধিকাংশই শহর ও উপজেলা সদর এলাকায়। রুমা, থানছি কিংবা অন্যান্য উপজেলায় কয়েকজন প্রথমদিকে আক্রান্ত হলেও এই পর্যন্ত প্রত্যন্ত এলাকায় করোনা পৌঁছতে পারেনি। কিন্তু আমি দেখছি পর্যটন খুলে দেওয়ার পর গত কয়েকদিন ধরে দলে দলে পর্যটক আসা শুরু করেছে যাদের অধিকাংশের মুখে মাস্ক এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা নেই। মাস্কের কথা জিজ্ঞেস করাতে উক্ত পর্যটকরা তাদের করোনা নেই বলেও ঔদ্ধত্ত দেখাচ্ছে। এ অবস্থায় করোনা কিছুদিনের মধ্যে বগালেক, নাফাখুম থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও পৌঁছাবে বলে উদ্বেগ জানান তিনি। তাছাড়া সমতল থেকে আসা পর্যটকরা পর্যটন এলাকার আদিবাসীদের অনুস্মৃত নিজস্ব প্রথাগত ’লক-ডাউন’ পদ্বতির বিষয়টি তোয়াক্কা না করে পাড়া এলাকায় অনুপ্রবেশ করে করোনা সংক্রমণের আশংকার বিষয়টিও তুলে ধরেন বিশিষ্টজনরা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *