করোনাকালে আদিবাসীদের জীবনজীবিকা জন্য প্রণোদনা দরকারঃ জনউদ্যোগের ভার্চুয়াল আলোচনা

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে জনউদ্যোগের আয়োজনে ১২আগস্ট ২০২০ এক অনলাইন আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম শিরোনামে আলোচনায় আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক, বিশিষ্ট লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী সঞ্জীব দ্রং; লেখক ও গবেষক সালেক খোকন; ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি) এর সমন্বয়কারী জ্যোতি চট্টোপাধ্যায়; উন্নয়নকর্মী ও নারী নেত্রী সারাহ মারান্ডী; আইইডির সহকারী সমন্বয়কারী সুবোধ এম বাস্কে ও হরেন্দ্রনাথ সিং অংশগ্রহণ করেন। অনলাইন আলোচনাসভাটি সঞ্চালনা করেন প্রাণবৈচিত্র্য গবেষক পাভেল পার্থ।

দারিদ্র্যের সাথে আদিবাসী মানুষের লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে সঞ্জীব দ্রং বলেন, আমাদের দেশে আদিবাসীরা দারিদ্র্যের সাথে লড়াই সংগ্রাম করে আসছে। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বব্যাপী আদিবাসী মানুষের প্রতি অবিচার, অন্যায় ও শোষণ হয়েছে। এসব কারণে তারা আজ দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতম। দেশে অনেক মানুষ বিচারহীনতার শিকার হচ্ছে। তারমধ্যে দরিদ্র হওয়ার কারণে, আদিবাসী হওয়ার কারণে, প্রান্তিকতার ফলে তাদের ওপর বিচারহীনতা, শোষণ, বঞ্চনা সীমাহীন আকার ধারণ করেছে। ফলে দেশের আদিবাসীদের সার্বিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাচেছ। এ প্রসঙ্গে তিনি আদিবাসীদের দরিদ্রতা নিরূপণে সম্প্রতি পরিচালিত গবেষণা ফলাফল উল্লেখ করে বলেন, গত মার্চ থেকে সমতলের আদিবাসীরা নতুন করে ৭০% দারিদ্র্যসীমার ভেতর চলে গেছে। অনেক অদিবাসী যারা শহরে বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করতো তারা আজ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। তাদের অনেকের চাকরি চলে গেছে কিংবা চাকরি থাকলে বেতন ঠিক মতো পাচ্ছেন না। এমতাবস্থায় আমাদের সরকারকে আদিবাসীদের বিষয়টা নতুন করে, ভিন্নভাবে দেখার আহ্বান করেন।

রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আদিবাসীরা কেমন সুযোগ, সুবিধা ও অধিকার ভোগ করছেন এ প্রসঙ্গে আলোকপাত করেন সালেক খোকন। তিনি বলেন, করোনা সময়ে আদিবাসী গ্রাম ও পাড়া গুলোতে খাদ্যের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক আদিবাসী কর্মহীন হয়ে পড়ছেন বিশেষকরে সমতলের আদিবাসীরা যাদের অধিকাংশই কৃষিশ্রমিক চরম অর্থ কষ্টে আছেন। করোনা মহামারি আদিবাসীদের চিরায়ত পেশা থেকে ছিটকে দিয়েছে। ফলে অনেককে তিন থেকে চার মাস চলার জন্য বাধ্য হয়ে ভূমিমালিক ওমহাজনের কাছ থেকে আগাম শ্রমবিক্রি করে চড়া সুদে অর্থ নিতে হয়েছে। এমনি সময় যেখানে শ্রমের মূল্য ৩০০কিংবা ৫০০ টাকা সেখানে ভুট্টা কিংবা ধান কাটার মৌসুমে ১৫০ টাকা মজুরির বিনিময়ে মহাজনের ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, এমন দুর্যোগ সময়ে আদিবাসীদের সুরক্ষা না দিতে পারা রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে। রাষ্ট্রের অবশ্যই আদিবাসীদের বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে পাশাপাশি তাদের জন্য নীতি পরিবর্তন ও নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এটা কেবল আদিবাসী হিসেবেই নয়, মানুষ হিসেবে টিকে থাকার জন্য, ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আদিবাসীদের মূল স্রোতে সামিল না করতে পারা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

করোনা মহামারি আদিবাসী মানুষের জীবনে দ্বিগুণ আঘাত হেনেছে জানিয়ে সারাহ মারান্ডী বলেন, লকডাউনের কারণে সমতলের আদিবাসীরা অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। তারা পরিবারের নিয়মিত আয় থেকে ছিটকে গেছে। সবাই জানি ৯০% আদিবাসী কৃষিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল আর কেউ কেউ কলকারখানার শ্রমিক, কোভিড-১৯ সবার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করেছে। এতে করে তাদের জীবনযাত্রার মান নিচের দিকে চলে গেছে। আদিবাসী নারীদের ওপর কোভিড-১৯ ব্যাপকতা বিষয়ে তিনি বলেন, এমনিতেই আদিবাসী নারীরা স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খাদ্য, ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। মহামারির কারণে তা আরো শোচনীয় আকার ধারণ করেছে। গর্ভবর্তী মা ও শিশুদের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি পুষ্টি প্রয়োজন কিন্তু সেগুলো পাচ্ছে না। অন্যদিকে নারীর প্রতি সহিংসতা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঘটছে। এ সময়ে তারা লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার হয়েছে। কোভিডকালে যেখানে মানুষ জীবন জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত এমন পরিস্থিতিতেও আদিবাসী নারীরা সহিংসতা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।

জ্যোতি চট্টোপাধ্যায় বলেন, বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ভাষা, জীবন-জীবিকা, সত্তা, ঐতিহ্য ও ধারণা বিষয়ে অসংবেদনশীলভাবে চিন্তা করেছে। ফলে আজ তারা প্রান্তিকতায় গেছে। কিন্তু জাতিসংঘের কারণে অনেক দেশ আদিবাসীদের প্রতি চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসছে। অনেক দেশ তাদের প্রতি ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক অবিচার, অন্যায়, শোষণ, নির্যাতন ও বঞ্চনাজন্য ক্ষমা চেয়েছে, অনুতপ্ত হয়েছে। কিন্তু আমরা আজও পারিনি। তিনি আরো বলেন, আদিবাসীদের জ্ঞান, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, উৎসবকে সাথে নিয়ে ও বিকশিত করার সুযোগ দিয়ে আমরা ভারসাম্যপূর্ণ ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন করতে পারি। বৈচিত্র্যময় দেশ গড়ে তোলার জন্য আদিবাসীদের জীবন-জীবীকা, তাদের প্রাণসত্তা, লোকজ্ঞান ও চিন্তাকে রক্ষার জন্য আমাদের অনেক কিছু করণীয় আছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, সাংবাদিক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও যুবসমাজকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। এটি কেবল আদিবাসীদের প্রতি আমাদের চিরায়ত মনোভাব ও মনোগঠন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অর্জন সম্ভব। আদিবাসীদেরও এক্ষেত্রে করণীয় রয়েছে, তাদেরও নতুন নতুন কাজে যুক্ত হওয়া এবং নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ ও চর্চার মাধ্যমে নানা ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। যাতে তারা বৃহৎসমাজে নানা ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

সঞ্চালক পাভেল পার্থ বলেন, আদিবাসীদের মহামারি থেকে রক্ষা পাবার জন্য নিজস্ব সক্ষমতা রয়েছে, তাদের মধ্যে অনাদিকাল থেকে কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের ধারণা ও চর্চা চলমান। তাদের থেকে আমাদের অনেক শিক্ষণীয় রয়েছে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *