‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৯ বছর: স্থানীয় জনগণের ভূমি অধিকার ও বাস্তবতা’ : পল্লব চাকমা

বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দীর্ঘ ১৯ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর দীর্ঘ আড়াই দশকের সংঘাতের অবসান ঘটে এবং উন্নয়নের অনুকূল ক্ষেত্র তৈরী হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
বিগত ১৯ বছরে চুক্তির বাস্তবায়িত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-
# ১৯৯৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন;
# ১৯৯৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন ও ১৯৯৯ সালে আঞ্চলিক পরিষদ গঠন;
# ১৯৯৭ সালে ভারত থেকে প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন;
# চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি, ভূমি কমিশন ও টাস্কফোর্স কমিটি গঠন অব্যাহত রয়েছে;
# পাঁচ শতাধিক অস্থায়ী ক্যাম্পের মধ্যে ১৯৯৯ সালে ৬৬টি ক্যাম্প এবং ২০০৯ সালে ৩৫টি ক্যাম্প প্রত্যাহার;
# ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন,
# ২০০১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন প্রণয়ন এবং ২০১৬ সালে তা যথাযথভাবে সংশোধন।
# মোট ৩৩টি বিষয়ের মধ্যে এযাবৎ মোট ১৭টি বিষয় ও বিষয়ের অংশবিশেষ জেলা পরিষদ সমূহে হস্তান্তর – পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে ১১টি বিষয় হস্তান্তর। – বিএনপি সরকারের আমলে ১টি (যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর) হস্তান্তর। – মহাজোট সরকারের বর্তমান মেয়াদে ৫টি বিষয় হস্তান্তর। – চুক্তির পূর্বে হস্তান্তরিত বিষয়/বিভাগের অধীন ১০টি কর্ম/অফিস হস্তান্তর। (ড.ফখরুদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৩টি এবং বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে ৭টি কর্ম/অফিস হস্তান্তর)

চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-
# পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং এজন্য আইনী ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
# পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন যথাযথভাবে কার্যকর করা। বিশেষ করে সাধারণ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সহ সকল উন্নয়ন কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
# তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বিষয় ও কার্যাবলী হস্তান্তর ও কার্যকরকরণ। বিশেষ করে জেলার আইন-শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান, সংরক্ষণ ও উহার উন্নতি সাধন, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুলিশ স্থানীয়), বন ও পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়সমূহ হস্তান্তর করা।
# তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিতকরণ; এক্ষেত্রে নির্বাচন বিধিমালা ও ভোটার তালিকা বিধিমালা প্রণয়ন করে তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা।
# ভূমি কমিশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা।
# ভূমিহীনদের ভূমি বন্তোবস্ত দেয়া।
# টাস্কফোর্সের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তু ও প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ ও তাদের স্ব স্ব জায়গা-জমিতে পুনর্বাসন করা।
# সেনা শাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’সহ চার শতাধিত অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা।
# অস্থানীয়দের নিকট প্রদত্ত সকল ভূমি ইজারা বাতিল করা।
# পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল চাকরিতে জুম্মদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ দেয়া।
# পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য পুলিশ এ্যাক্ট, পুলিশ রেগুলেশন ইত্যাদিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য অন্যান্য আইন (আইন, বিধিমালা, আদেশ, পরিপত্র, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মবন্টন বা Allocation of Business ইত্যাদি) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত বিশেষ আইনসমূহ (পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ ইত্যাদি) সংশোধন করা।
# সেটেলার বাঙালিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন ইত্যাদি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা রাজনৈতিক উপায়ে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের সকল সম্ভাবনা নস্যাৎ হতে চলেছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থার মর্যাদা চিরতরে ক্ষুন্ন করার পাঁয়তারা চলছে। ফলে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ও নিরাপদহীন হয়ে উঠে। বস্তুত: পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান সমস্যা রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই। চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নস্যাৎ করার যে কোন প্রয়াস দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কখনোই শুভ ফল বয়ে আনতে পারে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও আদিবাসী পাহাড়ীদের ভূমি অধিকার
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক পার্বত্যাঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্বলিত বিশেষ শাসনব্যবস্থা পুনপ্রবর্তিত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে সাধারণ প্রশাসন তত্ত্বাবধান, আইন-শৃঙ্খলা, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুলিশ (স্থানীয়), সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত নয় বন ও পরিবেশ ইত্যাদিসহ ৬৮টি কর্ম সম্বলিত ৩৩টি বিষয় হস্তান্তরের বিধান রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক সংশোধিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে বলা হয়েছে যে, পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোন জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাবে না। এছাড়া পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সাথে আলোচনা ও এর সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তরে বাধানিষেধ রয়েছে। অধিকন’ ‘ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা’ বিষয়টি পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরের বিধান রয়েছে।
অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ভূমি কমিশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করার বিধান রয়েছে। এ চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুয়ায়ী কমিশন বিরোধ নিষ্পত্তি করবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা ও এর সমাধান
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুসারে ১৯৯৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন গঠিত হয়। এই ধারা অনুযায়ী বিগত ১৭ বছরে এ যাবৎ পাঁচজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পাঁচজন ব্যক্তিকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারাগুলো সংশোধন না হওয়ার কারণে কমিশনের কাজ এতদিন শুরু করা যায়নি।
গত ১ আগস্ট ২০১৬ তারিখ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারা সংশোধনকল্পে মন্ত্রীসভার নিয়মিত বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০১৬ ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি সাপেক্ষে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ৯ আগস্ট “পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০১৬” জারী করা হয়েছে এবং গত ৬ অক্টোবর ২০১৬ জাতীয় সংসদে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০১৬ পাশের মধ্য দিয়ে আইনটি সংশোধন সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে ভূমি কমিশনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কাজ শুরু করার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন করা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের একটা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবে নি:সন্দেহে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই আইন যথাযথভাবে সংশোধন করা শেষ কথা নয়। এই আইন যথাযথভাবে ও সাহসী রাজনৈতিক দৃঢ়তা নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই আইন সংশোধনকে কেন্দ্র করে তথা এই আইনের সংশোধনীর বিরোধিতার নামে সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও উগ্র বাঙালি জাতীয়তবাদী মহল যে অপপ্রচার, হরতাল ও হুমকি-ধামকি দিয়ে চলছে তার বিরুদ্ধে তিন পার্বত্য জেলার স্থানীয় আওয়ামীলীগ ও প্রশাসন একেবারেই নিরব ভূমিকা পালন করে চলেছেন। এই সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও উগ্র জাতীয়তবাদী শক্তির অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে তারা একেবারেই দেখেও না দেখার ভান করে চলেছে। অপরপক্ষে স্থানীয় আওয়ামীলীগসহ জাতীয় রাজনৈতিক দলের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত অনেক ব্যক্তিবর্গ ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনীর বিরোধিতাকারী পাঁচ সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোর সাথে নানা কায়দায় সম্পৃক্ত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যায্যভাবে উচ্ছেদ ও ভূমি হারানোর আশঙ্কা অমূলক
বস্তুত ভূমি কমিশন আইনের উক্ত সংশোধনীর মাধ্যমে কমিশনে জুম্মদের সদস্য সংখ্যা যেমনি বৃদ্ধি করা হয়নি, তেমনি বাঙালিদের সদস্য সংখ্যাও কমানো হয়নি। কমিশনের চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা কমিয়ে ও কোরামের জন্য চেয়ারম্যানসহ দুইজন সদস্যের পরিবর্তে তিনজন করার ফলে অন্য কোন সদস্যের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়নি। বরঞ্চ অধিকতর গণতান্ত্রিক ধারা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাকে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তার মধ্য দিয়ে পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের ভূমি অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে ‘পাহাড়িদের আধিক্য থাকবে ও বাঙালিদের অধিকার ক্ষুন্ন হবে’ কিংবা ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালিরা ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবেন এবং ভূমির অধিকার হারাবেন’ এমন আশঙ্কা নিতান্তই অমূলক ও অবান্তর।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী পাহাড়ি-বাঙালি যাদের জায়গা-জমি বন্দোবস্ত ও ভোগদখল রয়েছে তাদের অন্যায্যভাবে উচ্ছেদ হওয়ার বা ভূমি অধিকার হারাবার কোন কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতিকে লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে, জবরদস্তি উপায়ে কিংবা পদ্ধতি-বহির্ভূতভাবে জায়গা-জমি বন্দোবস্তী নিয়েছেন বা বেদখল করেছেন তাদের তো আইনের আওতায় আসতেই হবে এবং তা যদি প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে তো অবৈধ বন্দোবস্তী বা বেদখল ছেড়েই দিতে হবে। সেইসব অবৈধ দখলদারদের পক্ষে সাফাই গাওয়া কখনোই মানবিক, ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক হতে পারে না। বলাবাহুল্য, বাঙালিরা ভূমি থেকে উচ্ছেদ ও ভূমি অধিকার হারাবার সস্তা শ্লোগান তুলে ধরে সাধারণ বাঙালিদের তথা দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার যেভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে সেভাবে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও চুক্তির বিরুদ্ধে সেইরূপ অপপ্রচার চালিয়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
পার্বত্যবাসীর ভূমি অধিকার ও বাস্তবতা
জুম্মদের বেহাত হওয়া জায়গা-জমি প্রত্যর্পণের পরিবর্তে জুম্মদের জায়গা-জমি জবরদখল ও তাদের চিরায়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। জুম্মদের প্রথাগত ভূমি অধিকারকে পদদলিত করে জুম্মদের মৌজা ও জুম ভূমির উপর পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। বহিরাগত প্রভাবশালীদের কাছে শত শত একর ভূমি ইজারা প্রদান করে এবং পদ্ধতি-বহির্ভুতভাবে রিজার্ভ ফরেষ্ট ঘোষণা করে জুম্মদেরকে তাদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ও চুক্তি মোতাবেক প্রণীত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে “ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা” বিষয়টি তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বিষয় হলেও তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকরা ভূমি প্রশাসন পরিচালনা করে চলেছেন। জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতীত ভূমি হস্তান্তর, বন্দোবস্তী, অধিগ্রহণ ইত্যাদির বিধি-নিষেধ থাকলেও আইন লঙ্ঘন করে জেলা প্রশাসকরা ভূমি হস্তান্তর, বন্দোবস্তী, অধিগ্রহণের কার্যাবলী সম্পন্ন করে চলেছেন। জেলা প্রশাসকরা ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির দোহাই দিয়ে এ ক্ষমতা ও এখতিয়ার প্রয়োগ করে চলেছেন। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একাধিক আইনের মধ্যে যদি সাংঘর্ষিক ধারা থাকে, তাহলে পূর্বের আইনের উপর শেষের আইনটি প্রাধান্য লাভ করে থাকে। কিন্তু জেলা প্রশাসকরা সেটা জেনেও না জানার ভান করে ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইন-শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন এখতিয়ার ও কার্যাবলী পরিচালনা করে চলেছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ১৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও ভূমি কমিশন কর্তৃক এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ার পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি সমস্যা উত্তরোত্তর জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। আদিবাসী পাহাড়ীদের জমিজমা এখনো সেটেলার বাঙালীদের জবরদখলে। পক্ষান্তরে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও চলছে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় সেটেলার বাঙালি কর্তৃক অব্যাহতভাবে ভূমি জবরদখল। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন লঙ্ঘন করে সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য সরকার কেবলমাত্র বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ৭৫,৬৮৬ পাহাড়ভূমি অধিগ্রহণ করেছে। বনবিভাগ পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্ষিত ও অশ্রেণীভুক্ত বনাঞ্চলের ২,১৮,০০০ একর ভূমি রিজার্ভ ফরেষ্ট হিসেবে ঘোষণা করেছে। আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকারকে সম্মান না দেখিয়ে অস্থানীয় বাঙালিদের কাছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা রাবার চাষের জন্য কেবলমাত্র বান্দরবান জেলায় ৪০,০৭৭ একর ভূমির ১৬০৫টি প্লট ইজারা প্রদান করা হয়েছে। এসব পাহাড়ভূমিগুলো ছিল মূলতঃ আদিবাসীদের জুমভূমি ও যৌথ মৌজা বন। এই ইজারা প্রদানের ফলে শত শত আদিবাসী পরিবার প্রথাগত জুমচাষ ও গৃহস্থালীর জন্য বনজ সম্পদ আহরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সার্বিকভাবে তাদের জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। তাদের জমি, বন ও পাহাড় হারানোর ফলে তারা অধিকতর নিঃস্ব হচ্ছে। ভূমিহীন হয়ে তারা গরীব থেকে গরীবতর জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিসমূহের উপর এই বৈষম্য-বঞ্চনার পেছনে অন্যতম যে কারণ তা হচ্ছে পশ্চিমা দুনিয়ার ঔপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্র ধারণা। এই জাতিরাষ্ট্রের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রসমূহের মূল নীতি হচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসমূহকে দমন-পীড়ন ও বঞ্চনার মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে অঙ্গীভূত করা নতুবা তাদের জাতীয় অস্তিত্ব চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। ফলে আজ আদিবাসীদের চিরাচরিত ভূমি অধিকার চরমভাবে বিপন্ন ও হুমকির সম্মুখীন।
সুপারিশ
# পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক স’ানীয় অধিবাসীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য-
# পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন যথাযথভাবে কার্যকরকরণের মাধ্যমে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা;
# ‘ভূমি এবং ভূমি ব্যবস’াপনা’ বিষয়টি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী যথাযথ ও জরুরী ভিক্তিতে জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা;
# অবৈধভাবে রাবার চাষ ও অন্যান্য প্লান্টেশনের জন্য বরাদ্ধকৃত জমির ইজারা বাতিল করা;
# ‘অপারেশন উত্তরণ’সহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার এবং স্থানীয় পার্বত্য পুলিশ বাহিনী গঠন করা;
# প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস’দের পুনর্বাসন করা,
# সেটেলার বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন করা।
(পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৯ বছর: স্থানীয় জনগণের ভূমি অধিকার ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ লিখিত বক্তব্য পাঠ করা হয়েছে)

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *