কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতাঃ পাভেল পার্থ

অংথাংয়ের পিজংয়ে কী আছে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। অং থাং সিয়্যেনের বয়স তখন তিন কী চার। একদিন দুটি জাপানি জেট ফাইটার বিমান হঠাৎ তাদের এলাকায় আছড়ে পড়ে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ধুলাশ্বর ইউনিয়নের বৈলতলী রাখাইন গ্রামের কাছে। সেই বিকট আওয়াজ আর ধোঁয়ার স্মৃতি এখনো তার মনে ভাসে। করোনাকালের থমকে যাওয়া সময়ে এমন আরো কত স্মৃতি তড়পায়। করোনার আগে আরো দুই মহামারীর কথা মনে আছে তার। ‘চাউ রগা (গুটিবসন্ত)’ আর ‘ওয়্যাঁও রগা (কলেরা)’। মহামারীকে রাখাইন ভাষায় বলে ‘রিনাহ রগা’। তার নিজেরই বসন্ত হয়েছিল, ডান হাতে গুটির দাগ এখনো আছে। কলেরার চেয়ে বসন্তে মানুষ মরেছিল বেশি, আর কলেরায় ভুগেছিল বেশি। অং থাং সিয়্যেন এখন একজন প্রসিদ্ধ রাখাইন ‘সিত্যেমা (কবিরাজ)’। তিনি আদি রাখাইন চিকিৎসাবিদ্যা ‘বিংদ ছেরা’ জানেন। তার কাছে শতবছরের প্রাচীন অনেক ‘পিজং (তালপাতায় লেখা আদি চিকিৎসাশাস্ত্র)’ আছে। সেখানে নানা ভেষজবিধি ও করণীয় লেখা আছে। ইতিহাস থেকে ইতিহাসে সামাল দিতে হয়েছে নানা মহামারী ও বিপদ। গড়ে ওঠেছে মহামারী সামালের স্বাস্থ্যবিধি। আজ করোনাকালেও সেইসব বিধির নিয়ম আর শিখনগুলোই কাজে লাগছে রাখাইনদের। বাংলাদেশে রাখাইনদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪,৫০০। এর ভেতর পটুয়াখালী ও বরগুণা নিয়ে বরিশাল বিভাগের রাখাইন জনসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। এখনও পর্যন্ত রাখাইনদের ভেতর কেউ করোনায় মারা যাননি, এমনকি উপসর্গ নিয়েও মৃত্যু হয়নি। পাশাপাশি গুরুতর সংক্রমণের কোনো তথ্যও নেই। দেশ-দুনিয়া যখন করোনায় বেসামাল, কিন্তু রাখাইনরা সামাল দিয়ে চলেছেন এক বৈশ্বিক মহামারী। কীভাবে? মহামারী সামালে তিনটি বিষয় মেনে চলার বিধান রাখাইনদের ভেতর আদি থেকেই চল ছিল। লকডাউন-সঙ্গনিরোধ-সাময়িক বিচ্ছিন্নতা বিষয়ক স্বাস্থ্যবিধি পালন, বিশেষ খাদ্যাভাস এবং সামাজিক কৃত্য-রীতি আয়োজন। অসুখ ও মহামারী থেকে বাঁচতে রাখাইনরা সামাজিকভাবে ‘চোয়াইসেন মা এম্প্যা’ পূজা আয়োজন করেন। এসময় পাড়ায় মানুষের প্রবেশ ও যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে পাড়ায় প্রতিটি বাড়ি কাপাস তুলোর সূতা দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় এবং পূজার মঙ্গল পানি ছিটিয়ে পরিচ্ছন্ন করা হয়। এভাবে মহামারী সামাল দিতে রাখাইনরা ‘প্রারাই এরা’ বিধির মাধ্যমে মহামারী শেষ না হওয়া কিছুদিনের জন্য পাড়া বন্ধ করে দেন। কঠিন অসুখ ও মহামারীতে কেউ মারা গেলে বা গ্রামের বাইরে কেউ মারা গেলে রাখাইনদের ভেতর সেই মৃতব্যক্তির সৎকারে কঠিন সামাজিক বিধি পালিত হয়। প্রতিটি রাখাইন পাড়ায় দু’ধরণের ত্যান্সায় বা শশ্মান থাকে। এনঙ্গাদু ত্যান্সায় বা অতিথি শশ্মান এবং রওয়া ত্যান্সায় বা পাড়ার শশ্মান। রোগের সংক্রমণ ও মহামারীতে মৃতদের সৎকার থেকেই এই বিশেষ স্থাপনার চল হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি পাড়া বা গ্রামের বাইরে মারা যান তবে মৃতদেহকে গ্রামের বাইরে শশ্মান বা বিহার থেকে নিরাপদ দূরত্বে তৈরি অস্থায়ী ঘরে সৎকারের আগ পর্যন্ত রাখা হয়। শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মৃতদেহকে ‘এনঙ্গাদু ত্যান্সায়’ শশ্মানে সৎকার করা হয়। মৃতের ব্যবহৃত বস্ত্র, কাপড় ও তার স্পর্শে আসা সকলকিছু পুড়িয়ে ফেলা হয়। গ্রামের বাইরে বা রোগের সংক্রমণে মৃতদের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের ঘরে ফেরার আগে গ্রামের বাইরের পুকুরে ভালো করে ¯স্নান করতে হয়। ঘরের সামনে হলুদ মেশানো পানি এবং আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়। হলুদ-পানিতে হাত-পা ধুয়ে এবং আগুনে সেঁকে তারপর ঘরে প্রবেশ করতে হয়। কেবল রাখাইন নয়, দেশের প্রায় সকল আদিবাসী সমাজেই মহামারী সামালের লোক স্বাস্থ্যবিধি ও কৃত্যআচার আছে। কোভিড-১৯ থেকে শুরু করে আগামীর কোনো মহামারী সামালের ক্ষেত্রে এসব বিধি ও ব্যবস্থাপনা থেকে আমাদের শেখার ও জানার আছে অনেককিছু।

বিগত মহামারী ও আদিঅভিজ্ঞতা
২০১৯ সনের ডিসেম্বরে চীনের উহানে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে বিষয়টিকে ‘প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের’ সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে লেখা শুরু করি জানুয়ারি থেকে। শুরু থেকেই মহামারী সামালে আদিবাসী সমাজের বিজ্ঞান ও দর্শনকে বোঝার চেষ্টা করেছি। দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে খোঁজার চেষ্টা করেছি মহামারী সামালের আদিবাসী বিজ্ঞানভাষ্যের স্মৃতিটুকরোগুলো। করোনা মহামারী সামালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেসব স্বাস্থ্যবিধি ঘোষণা করছে, সেসব আদিবাসী সমাজে বহু আগেই চর্চা হয়েছি। নিজস্ব কায়দায় লকডাউন,আইসোলেশন, সঙ্গনিরোধ, বিশেষ খাদ্যাভাস থেকে শুরু করে লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা পর্যন্ত। রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’, ‘ট্রাইবাল’ পরিচয়গুলো ব্যবহৃত হলেও চলতি আলাপে ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়খানি ‘আত্মপরিচয়ের অধিকার’ মান্য করে ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ এ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গা, বম, পাংখোয়া, চাক, খিয়াং, খুমি, লুসাই, কোচ, সাঁওতাল, ডালু, উসাই(উসুই), রাখাইন, মণিপুরী, গারো, হাজং, খাসিয়া, মং, ওরাও, বর্মণ, পাহাড়ী, মালপাহাড়ী, কোল এবং বর্মণ নামে মোট ২৭ জনগোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়। পূর্বের ২৭ আদিবাসী জাতির পাশাপাশি বর্তমানে কুর্মি মাহাতো, কন্দ, গঞ্জু, গড়াইত, মালো, তুরি, তেলী, পাত্র, বানাই, বাগদী, বেদিয়া, বড়াইক, ভূমিজ, মুসহর, মাহালী, রাজোয়ার, লোহার, শবর, হদি, হো এবং কড়া এই ২১ আদিবাসী জাতির নাম পরবর্তীতে তফশিলভূক্ত হয়। সাধারণভাবে দেশের আদিবাসীদের অনেকে ‘সমতল’ ও ‘পাহাড়ের’ এভাবে ভাগ করেন। আবার বিদ্যায়তনিকভাবে ‘মঙ্গোলয়েড’ ও ‘অস্ট্রালয়েড’ এরকম ভাগও আছে। করোনাকালে চলমান পাঁচমাসের গবেষণায় দেখতে পেয়েছি তুলনামূলকভাবে ‘মঙ্গোলয়েড’ আদিবাসী জাতিসমূহের ভেতর মহামারীর স্মৃতি ও বিধি পালনের চর্চা এখনো প্রবল। ‘মঙ্গোলয়েড’ আদিবাসী জাতিদের ভেতর মহামারী, লকডাউন, বিচ্ছিন্নতা, সঙ্গনিরোধ বিষয়ক সুস্পষ্টবিধি ও এসবের নিজস্ব নাম পাওয়া যায়। ‘অস্ট্রালয়েড’ আদিবাসী জাতিদের ভেতর মহামারী সামালের প্রার্থনা, পূজা ও কৃত্যের চল থাকলেও সুরক্ষাবিধির বৈচিত্র্য ও নিজস্ব শ্রেণিকরণ সকলের খুঁজে পাওয়া যায়নি। অধিকাংশদের ভেতর কলেরা, গুটিবসন্ত, কালাজ্বর মহামারীর সাম্প্রতিক স্মৃতি আছে। মহামারী সামালের আদিবাসী স্বাস্থ্যবিধিসমূহ ‘সুপ্রাচীন’ এবং এসব বিধি মূলত জাতিসমূহের ভেতর প্রচলিত আদি ধর্মদর্শনের সাথে অধিকতর সম্পর্কিত। দেখা গেছে অধিকাংশ জাতি এবং অঞ্চলে মহামারী সামালের স্বাস্থ্যবিধিগুলো করোনা মহামারীকালে আবারো ‘লকডাউন-সাময়িক বিচ্ছিন্নতা-বিশেষ খাদ্যাভাস এবং কিছু বিশেষ কৃত্য’ হিসেবে পুন:চর্চার চল শুরু হলেও এসব আদি বিধি ও বিধি সম্পর্কিত দর্শন এবং ভাষিক অনুষঙ্গের প্রচলন নতুন প্রজন্মের কাছে ‘প্রায় অনুপস্থিত’।

মহামারীর কত নাম!
কোনো ভাষায় কোনো শব্দের চল সেই ঘটনার ঐতিহাসিকতা জানান দেয়। করোনাকালে আমরা বাংলায় ‘মহামারী ও অতিমারী’ শব্দগুলোই বেশি শুনেছি। আদিবাসী ভাষাগুলোতেও মহামারী পরিস্থিতিকে বোঝানোর জন্য শব্দ-প্রত্যয় আছে। মান্দি-গারোদের আচিক ভাষায় মহামারী মানে ‘সিগ্রেমা’। কোচ ভাষায় ‘মালাংনি’, খুমি ভাষায় ‘কাংহয়’, ম্রো ভাষা ‘হয়’, লেঙ্গাম ভাষায় ‘ঙিয়াপখখ্লাম’, পাংখোয়া ভাষায় ‘রি-পুই’, সাঁওতালি ভাষায় ‘মারাংনাস’, খাসি ও জৈন্তিয়া ভাষায় ‘ইয়াপখ্লাম’, কড়া ভাষায় ‘দুরদশা’, রবিদাস ভাষায় ‘আকাল গিরালবা’, বম ভাষায় ‘পুলপি’, খিয়াং ভাষায় ‘লগা’, লুসাই ভাষায় ‘হৃ পুই’, পাহাড়িয়া ভাষায় ‘তালহৗরি’ মীতৈ মণিপুরী ভাষায় ‘লাইচ্যৎ’, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় ‘মুর্কি’। এইসব শব্দব্যঞ্জনা কী প্রমাণ করে? জানানা দেয় এসকল ভাষাভাষিরা
বিগত মহামারী পরিস্থিতিগুলো সামাল দিয়েছেন। তাহলে তাদের নিশ্চয়ই কিছু অভিজ্ঞতা আর বেঁচে থাকবার নিজস্ব কৌশল আছে। কিন্তু করোনা মহামারীর শুরু থেকে আমরা সেসব কী হদিশ করেছি? মর্যাদা বা স্বীকৃতি দিয়েছি। আমরা কেবল তাকিয়ে আছি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আর নানাবিধ বহুজাতিক কোম্পানির দিকে।

মহামারীর বিরুদ্ধে তিন শক্তি
মহামারী সামালের ক্ষেত্রে আদিবাসী স্বাস্থ্যবিদ্যা তিনটি বিষয়কেই আদিকাল থেকে মান্য করেছে। ১. পরিবার ও পাড়ার সকলে মিলে লকডাউন, বিচ্ছিন্নতা ও সঙ্গনিরোধের নিয়মপালন, ২. বিশেষ কৃত্য ও প্রার্থনা এবং ৩. খাদ্যাভাস ও লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা। বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর যখন মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না তখন আদিবাসী গ্রামগুলো কিন্তু এসব বিধি মানছে। তাহলে আদিবাসী সমাজের এই বিশেষ শক্তি ও কৌশলগুলি কি? টক, তিতা স্বাদের খাবার গ্রহণ থেকে শুরু করে ভেষজ গ্রহণ এবং প্রচুর পানি পান কিন্তু সকলেই চর্চা করছেন। এগুলো পালন করতে গেলে সবসময় কেবল অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে দরবার নয়; চারপাশের প্রাণসম্পদ চেনাজানার একটা বড় বিষয় থাকে। আর আদিবাসী গ্রামগুলো কঠোরভাবে লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মানছেন। বান্দরবানের বমপাড়া হোক কী মৌলভীবাজারের খাসিপুঞ্জি হোক। পরিবার, পাড়া ও গ্রামপ্রধান সকলের মাধ্যমে যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা কেউ অমান্য করছে না। কারণ অমান্য করলে তার আর মহামারীকালে গ্রামে ফেরা হবে না। সবকিছু আবার ঠিকঠাক হওয়ার পর তিনি আবার গ্রামে প্রবেশ করতে পারবেন। কিন্তু দেশে তো আদিবাসী জনগোষ্ঠী মাত্র তিরিশ লাখ। তাহলে বাদবাকী ষোলো কোটি মানুষের অধিকাংশই কেন স্বাস্থ্যবিধি মানছে না এর সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সকল কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি। এখানে আদিবাসী সমাজ থেকে শিক্ষা ও কৌশল নানাকিছুই গ্রহণ করা যেতে পারে।

লকডাউন এক আদিপদ্ধতি
মহামারী সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে ঘর, পাড়া, রাস্তা, গ্রাম বন্ধ করে দেয়া, সাময়িক বিচ্ছিন্নতা, কোথাও দূরে কিছুদিন চলে যাওয়া, সঙ্গনিরোধ এসব আদিবাসী সমাজের বেশ প্রাচীন পদ্ধতি। লকডাউনের মাধ্যমে গ্রামবন্ধ করাকে বমরা বলে ‘প্লেংখাম’। মান্দিরা ‘সঙ দেংচেংআ’, কোচেরা ‘চিংয়ে হারিকু খাই চিয়ে আ’, খুমিরা ’আভাং আখো’, পাংখোয়ারা ‘খোয়া খার’, চাকমারা ‘আদাম বন গরানা’,ম্রোরা ‘খাং কোয়া’, লেঙামরা ‘খাং চোনং বাই ঙিয়াপখ্লাম’, ত্রিপুরারা ‘কামি নি লামা মুথুকজাক’, সাঁওতালরা ‘আতো কুলুপ’, খাসিরা ‘খাং কারদেপ ছোনং বাহ ইয়াপখ্লাম’, কড়ারা ‘বাধ দেয়া’, রবিদাসরা ‘উঘর না যায় পড়ি’, লালেংরা ‘গাওরাখলা আবইল্যা বনসোয়ে’, খিয়াংরা ‘হেনেই’, লুসাইরা ‘খুয়া যারহ’, জৈন্তিয়ারা ‘খাং সোনং’, তঞ্চংগ্যারা ‘পাড়া বন করা’, ওঁরাওরা ‘গাও বাইন্ধ লিবে’, মীতৈ মণিপুরীরা ‘খুন চংনদবা’, মারমারা ‘রোয়া খাং’, কডারা ‘টলা বন্ধ’, কোলরা ‘মাতো টল’ এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা বলে ‘গরে ত না নিকুলানি’।

প্রকৃতির নিয়ম, জীবনের দর্শন
অসুখ ও মহামারী সামালের ক্ষেত্রে প্রকৃতির প্রতি নতজানু আদিবাসী সমাজের আদি জীবনদর্শন এবং সাংস্কৃতিক বীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি নয়, সামষ্টিক কায়দায় মহামারী সামালের ইতিহাস গড়ে ওঠেছিল এখানে। সমাজের সকলেই যেন একই বিধি ও বিধান মান্য করে এজন্য তৈরি হয়েছিল প্রকৃতিঘনিষ্ঠ নানা কৃত্যরীতি। মহামারী সামালের ক্ষেত্রে আদি মান্দি কৃত্যের নাম ‘দেনমারাংআ’। কোচদের ‘নকনিওয়াই-কামাক্ষ্যা-শীতলা-গেরাম পূজা’, খুমিদের ‘আপাই চিমিউ’, ¤্রােদের ‘ডুব আং’, পাংখোয়াদের ‘ লুংতেরঙেট ইন তোয়ালে রিত’, চাকমাদের ‘থাম্মানা’, ত্রিপুরাদের ‘কেরপূজা’, সাঁওতালদের ‘ বাহা পরব এবং মৗঞ্জহিথানে দা: দুল’, খাসিদের ‘ কাইনিয়া ছোনং’, কড়াদের ‘শিবথান পূজা’, মুন্ডাদের ‘সারুল’, রবিদাসদের ‘ অঘনী, শাওনী, বাইশাখী এবং শীতলা’, লালেংদের ‘সিতলিসেবা’, বেদিয়া মাহাতোদের ‘গাওগাঞ্জারী’, খিয়াংদের ‘চোবই’, লুসাইদের ‘ রাম নুয়াই আহ আন ত্লান’, তঞ্চংগ্যাদের ‘সুমলাং ও ফকির পূজা’, জৈন্তিয়াদের ‘বেহেহ রিম’, ডালুদের ‘রক্ষাকালী’, ওঁরাওদের ‘ফাগুয়া পরব’, পাহাড়িয়াদের ‘পুন্ডাডি আরিয়ান’, মীতৈ মণিপুরীদের ‘ ফত্তবি লাই, লাইওয়া-লাইসোন, নহাইরোন’, মারমাদের ‘পুরি নারে’, কডাদের ‘টলা পূজা’, হাজংদের ‘ভাসান কালি পূজা’, কোলদের ‘মাতো পূজা’ এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ‘নগরকীর্তন’। এসব কৃত্য আরাধনা ও আয়োজনে প্রকৃতির ধারে নতজানু হওয়ার কায়দা আছে।

কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা
চলতি আলাপখানি শুরু করেছিলাম রাখাইনদের এক আদি চিকিৎসাশাস্ত্র গ্রন্থ পিজংয়ের স্মৃতি টেনে। আলাপখানি শেষ করছি আরেক আদি পবিত্রগ্রন্থ ‘পুয়ার’ স্মরণে। ‘সনামহি’ বা আদি মীতৈ মণিপুরী ধর্মের পবিত্রপুস্তক ‘পুয়াতে’ মহামারী বা দুর্যোগের বিবরণ আছে এবং উল্লেখ আছে এমন পরিস্থিতিতে ঘরের সীমানার ভেতর বসবাসের আর যদি নিতান্তই শক্তি নি:শেষ হয়ে যায় তবে গৃহদেবতা ‘লাইনিংথৌ সনামহির’ শরণাপন্ন হতে। মহামারী থেকে সামাল দেয়ার এই ‘সঙ্গনিরোধ ও বিচ্ছিন্নতার’ স্বাস্থ্যবিধি কোনো আদি পবিত্রগ্রন্থে খুঁজে পাওয়া এমনতর স্বাস্থ্যবিধি পালনের ঐতিহাসিকতা তুলে ধরে। করোনার আগে আদিবাসী সমাজের সাথে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র কী বহুজাতিক কোম্পানি কে কী করেছে তার সকল খতিয়ান আর রক্তদাগ মাটি ও মগজে আছে। করোনা-উত্তর সময়ে দুম করে এই প্রান্তিকতার ময়দান ও ক্ষমতার গণিত বদলে যাবে কী? কেউ জানে না। আলাপখানি এ নিয়ে নয়। অধিপতি প্রতিষ্ঠান কী বিদ্যায়তনের গরিমা আর বিদ্যার দৌড় কিছুটা হলেও এই করোনাকাল আমাদের দেখিয়েছে। সেসব এখানে টানছি না। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, প্রান্তিকতা, বৈষম্য আর বঞ্চনা নিয়েই আদিবাসী সমাজ। কিন্তু এমনসব বঞ্চনা সামাল দিয়েও আদিবাসী সমাজ করোনাকালে কীভাবে বৈশ্বিক মহামারী সংক্রমণ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখলেন এর কী কোনো স্বীকৃতি ও বাহবা হবে না? কেবল ব্যক্তি নয়, পাড়াভিত্তিক সামাজিকভাবে আপ্রাণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার যে উদাহরণ এখনো আদিবাসী গ্রামগুলোতে বহাল আছে তার শিক্ষা ও কৌশল কী আমরা জাতীয় নীতিকৌশলে যুক্ত করবো না? ফেব্রুয়ারি থেকেই আদিবাসী সমাজের মহামারী সামালের জ্ঞানভাষ্যকে মহামারী সামালের সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার জোর দাবি জানিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলাম। পাঁচ মাস পর জাতিসংঘ বিষয়টি ‘আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য’ করেছে। ‘কোভিড-১৯ মহামারী ও আদিবাসী সক্ষমতা’। বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মহামারী সামালের এমনতর নিম্নবর্গীয় জ্ঞানভাষ্য ও কায়দাকে মর্যাদা ও স্বীকৃতি দিবে। এই করোনাকালেই।

গবেষক ও লেখক। ই-মেইল: [email protected]

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *