রাষ্ট্রের সাথে সাথে সবাই আদিবাসী বা আদিবাসী দিবস ভুলে যাচ্ছে: অনলাইন আলোচনায় বললেন মেনন

রাষ্ট্রের সাথে সাথে সবাই আদিবাসী বা আদিবাসী দিবস ভুলে যাচ্ছে। আদিবাসী বা আদিবাসী দিবস পরিকল্পিতভাবে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আজকেও (৯ আগষ্ট) পত্রিকা খুললে দেখবেন যে, আজকে যে একটি আন্তর্জাতিক দিবস তার হদিস কোথাও নেই। এটা পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে।আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২০ উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আয়োজিত ভার্চ্যুয়াল আলোচনায় এসব কথা বলেন ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি ও সাংসদ রাশেদ খান মেনন।গতকাল ৯ আগষ্টবিকাল ৫ ঘটিকায় অনলাইন জুম আলোচনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ছাড়াও উক্ত আলোচনায় আরো অংশ নেন আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের ডীন অধ্যাপক সাদেকা হালিম, টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, আদিবাসী ফোরামের সদস্য মেইনথিন প্রমীলা ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী অভিলাষ ত্রিপুরা প্রমুখ।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে অভিলাষ ত্রিপুরা বলেন, দেশের সকল মানুষের মতো আদিবাসীরাও এদেশের নাগরিক। একাত্তরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সকলের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার আমরা করেছিলাম। আদিবাসী দিবসে আশা করছি, একদিন এই করোনাকাল শেষে রাষ্ট্র ও সরকার নিজে জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী দিবস উদযাপন করবে। আদিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আদিবাসী-বাঙালি হাতে হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাংসদ রাশেদ খান মেনন বলেন, আদিবাসী দিবসের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় স্বীকৃতি প্রয়োজন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠা ও একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম গেল শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা ছিল। কিন্তু বাঙালি হিসেবে নিজ জাতিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠার মাদকতা দেশের সংখ্যালঘু জাতিসত্তার উপস্থিতি সম্পর্কে আমাদের বিস্মৃত করেছিল। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী দেশের সামনে পুরাতন ভুল শুধরে নেওয়ার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সেখানে তাদের দাবি মোতাবেক আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারিনি। পাকিস্তান আমলে বাঙালি হিসেবে অস্বীকার যেমন আমাদের মনে ক্ষোভ ও জ্বালা সৃষ্টি করত, আদিবাসী হিসেবে স্বীকার না করা আদিবাসীদের মনে ক্ষোভ ও জ্বালা সৃষ্টি করে রেখেছে।

আদিবাসী দিবসে সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচায বলেন, আজ ২৩ বছর হতে চলল পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে আজও বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ দেশের স্বার্থে এ চুক্তি বাস্তবায়ন হওয়া অতীব জরুরী। তিনি সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশনের জোর দাবি জানান।

উক্ত আলোচনায় সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, আদিবাসী শব্দ একদিন আমাদের সংস্কৃতিতে জায়গা করে নেবে আমি সেই আশাবাদ ব্যক্ত করি। আমাদের এলাকায় কৃষির বিকাশ আদিবাসীদের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আজ আদিবাসীদের সেই জায়গা-জমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে আদিবাসীরা এর থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমিকমিশন গঠনের জোর দাবিও জানান তিনি।

ভার্চুয়াল আলোচনায় অংশ নিয়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, করোনা মহামারিতে আদিবাসী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরা বেকায়দায় পড়েছে। আদিবাসী এলাকায় বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ পৌঁছায় নি। বাংলাদেশে আদিবাসীরা নানাভাবে অধিকার বঞ্চিত রয়েছে। তারা নানাভাবে প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে। এজন্য মূলধারার জনগোষ্ঠী দায়ী। সেজন্য আমি লজ্জিত।

টিআইবি’র পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আদিবাসী’ শব্দটার মধ্যে আশ্রয়হীন, অনাথ অর্থ প্রকাশ করে। তারা নিজদেশে প্রবাসী। তাদের পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই। বিচারবহির্ভুত হত্যা, অধিকারহীনতা, বঞ্চনা, মৌলিক অধিকারহরণ, দখল, উচ্ছেদ, ভূমি অদিকার ভুলন্ঠিত হওয়ার যত আয়োজন তার সবকিছুই হচ্ছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল প্রতিটি নাগরিকের সমানাধিকার। কিন্তু আজ নিজেদের পরিচয় আদিবাসী বলা যাবে না। আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, ব্যবহার করলে হেনস্তার শিকার হতে হয়। এর চেয়ে আর কী বিব্রতকর অবস্থা আছে।

উক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট আদিবাসী গবেষক ও ঢাবি অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে একটা নতুন উপলব্ধি এসেছিল যে ১৯৭২ সালে সংবিধানে যে ভুলটা করেছিলাম এবং সে ভুলের বর্ধিত রূপ হিসেবে জিয়া ও এরশাদের শাসনামলে পাহাড়ের জনমিতিকে পরিবর্তন করে দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সেগুলোর পরিসমাপ্তি হবে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ২২ বছর পরও এর বাস্তবায়ন হয়নি। এটা অত্যন্ত দু:খজনক।
পাহাড় তথা পুরো আদিবাসীদের সমস্যাকে নিরাপত্তার হুমকি হিসাবে পুরনো রীতিতে দেখা হচ্ছে দাবী করে তিনি আরো বলেন, পুরো দেশে আমলা কর্তৃত্ব ঝেঁকে বসেছে। তার জন্যই পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন ও আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেনা ।

আদিবাসী ফোরামের সদস্য মেইনথেইন রাখাইন প্রমীলা বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমাদের আদিবাসীদের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। রাষ্ট্র কীরকম নিষ্ঠুর তার উদাহরণ অর্পিত সম্পত্তি আইন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আদিবাসী জীবনকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। আমরা করোনাকে ভয় পায় না, মানুষরূপী দানব যারা মানবাধিকার লংঘন করে তাদেরকে ভয় পাই। তারা আমাদের জায়গা-জমি কেড়ে নিচ্ছে, আমাদেরকে উচ্ছেদ করছে, দেশান্তরী করছে।

এছাড়া উক্ত আলোচনায় অংশ নেন এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। তিনি বলেন, মানবসভ্যতায় আদিবাসীদের যে অবদান সেই অবদানের স্বীকৃতি তারা পান নাই। বরং তথাকথিত আধুনিকতা তাদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। তাদের মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া দরকার। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনেক সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও আজ হতাশার সৃষ্টি করেছে এটি বাস্তবায়িত না হওয়ার জন্য। বাংলাদেশের মঙ্গলের জন্য আদিবাসীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে।

সারাদিনব্যাপী ভার্চ্যুয়াল বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে আদিবাসীদের ব্যান্ড ও কণ্ঠশিল্পীদের পরিবেশনা এবং আদিবাসী নৃত্যশিল্পীরা আদিবাসী নাচ পরিবেশন করেন। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী জয়দেব রোয়াজা ভিজুয়াল আর্ট পারফর্ম করেন।সন্ধ্যায় আদিবাসী অধিকার আন্দোলনে যারা আত্মত্যাগ করেছেন এবং করোনা মহামারিতে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের উদ্দেশ্যে প্রদীপ প্রজ্জলন করা হয়। এরপর রাত ৮.০০ টায় আদিবাসী কালচারাল ফোরামের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পরিবেশিত হয়।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *