আদিবাসী দিবস ভার্চুয়াল উদযাপন চলছে, আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভাল নয়ঃ সন্তু লারমা

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২০ উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম অদ্য ৯ আগস্ট ২০২০ রোজ রবিবার সারাদিনব্যাপী ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে এ ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয়। এরপর বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন। শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের সকল মানুষের মতো আদিবাসীরাও এদেশের নাগরিক। একাত্তরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সকলের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার আমরা করেছিলাম। আদিবাসী দিবসে আশা করছি, একদিন এই করোনাকাল শেষে রাষ্ট্র ও সরকার নিজে জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী দিবস উদযাপন করবে। আদিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আদিবাসী-বাঙালি হাতে হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা তাঁর সভাপতির বক্তব্যে বলেন, দেশে আজও আদিবাসী জনগণের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশের বিভিন্ন অ লে আদিবাসীদের ভূমি বেদখল ও তাদের চিরায়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার হীন উদ্দেশ্যে আদিবাসীদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা, ভূমি জবরদখল ও উচ্ছেদ, আদিবাসী নারীর উপর নির্যাতন ও সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রæতি দিয়েছিল। কিন্তু ২২ বছরেও মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেনি। বিশেষত ভূমি কমিশন পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় রয়ে গেছে। বহুবার দাবি তুলে ধরা সত্তে¡ও চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যকর সময়সূচিভিত্তিক পরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা হয়নি। অস্থায়ী সেনাক্যাম্পসহ ‘অপারেশন উত্তরণ’ প্রত্যাহার করা হয়নি।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাংসদ রাশেদ খান মেনন বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠা ও একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম গেল শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা ছিল। কিন্তু বাঙালি হিসেবে নিজ জাতিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠার মাদকতা দেশের সংখ্যালঘু জাতিসত্তার উপস্থিতি সম্পর্কে আমাদের বিস্মৃত করেছিল। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী দেশের সামনে পুরাতন ভুল শুধরে নেওয়ার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সেখানে তাদের দাবি মোতাবেক আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারিনি। পাকিস্তান আমলে বাঙালি হিসেবে অস্বীকার যেমন আমাদের মনে ক্ষোভ ও জ্বালা সৃষ্টি করত, আদিবাসী হিসেবে স্বীকার না করা আদিবাসীদের মনে ক্ষোভ ও জ্বালা সৃষ্টি করে রেখেছে।

আদিবাসী দিবসে সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচায বলেন, আজ ২৩ বছর হতে চলল পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে আজও বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ দেশের স্বার্থে এ চুক্তি বাস্তবায়ন হওয়া অতীব জরুরী। তিনি সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশনের জোর দাবি জানান।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের রাকেজুজ্জামান রতন বলেন, এইদিনে আমি আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই। আমরা সকলেই চেয়েছিলাম এদেশে মানুষ হিসেবে বাঁচবো। প্রান্তিক আদিবাসীরা তাদের ন্যায্য অধিকার পেতে চেয়েছেন। কিন্তু এদেশের সংবিধান ও দেশ পরিচালনাকারীরা তার ব্যবস্থা করে দিতে পারেননি। আদিবাসী মানুষের উপর কোভিড ১৯ এর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে। সেজন্য আদিবাসীদের কর্মের নিশ্চয়তা, খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যের অধিকার রাষ্ট্রকে সুনিশ্চিত করতে হবে। আমরা লড়ব, লড়তে হবে। আদিবাসী দিবসে সেই লড়াইয়ের আহ্বান জানাচ্ছি।

আদিবাসী দিবসে সংহতি জানিয়ে সুন্দরবন এলাকার মুন্ডা প্রতিনিধি কৃষ্ণপদ মুন্ডা বলেন, করোনার পাশাপাশি আমাদের এলাকায় ঘূর্ণিঝর ’আম্ফান’ আঘাত হেনেছে। আদিবাসীরা সামাজিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আদিবাসীরা ভূমি বেদখলের শিকার হচ্ছে। আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি হবে। সুন্দরবন আদিবাসীদের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে। আদিবাসীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম আদিবাসীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, করোনা মহামারিতে আদিবাসী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরা বেকায়দায় পড়েছে। আদিবাসী এলাকায় বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ পৌঁছায় নি।

মাওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, প্রতি বছর আদিবাসী দিবস পালিত হয়। ৪৯ বছরেও আদিবাসীদের দুঃখ মোষণ হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার তাদেরকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু আদিবাসীরা সেটা মানতে চাচ্ছে না। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। পাহাড়ে বাঙালি সেটেলারদের বসতি দেওয়া হয়েছে। আদিবাসীদের নিজ মাতৃভাষায় পড়াশুনার যে উদ্যোগ সেটা বাস্তবায়িত হতে পারছে না। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার যেকোন জাতির জন্য দরকার। সেজন্য আদিবাসীদেরও সেঅধিকারটা দিতে হবে। দেশে আদিবাসীসহ সকল নাগরিকের হত্যা, গুম, ক্রসফায়ার বন্থ করতে হবে। করোনাকালে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে ও সেনাক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করতে হবে।

বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, আমরা সবাই জানি আদিবাসীরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। তারা মৌলিক অধিকার থেকে বি ত। অথচ মানুষ হিসেবে তাদের সে অধিকারগুলো দরকার। আমরা আদিবাসীদের সংগ্রামের সাথে সহভাগী হতে চাই।

টিআইবি’র পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আদিবাসী’ শব্দটার মধ্যে আশ্রয়হীন, অনাথ প্রকাশ করে। তারা নিজদেশে প্রবাসী। তাদের পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই। অধিকারহীনতা, ব না, মৌলিক অধিকারহরণ, দখল, উচ্ছেদ, ভূমি অদিকার ভুলন্ঠিত হওয়ার যত আয়োজন তার সবকিছুই হচ্ছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল প্রতিটি নাগরিকের সমানাধিকার। কিন্তু আজ নিজেদের পরিচয় আদিবাসী বলা যাবে না। এর চেয়ে আর কী বিব্রতকর অবস্থা আছে।
মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান সবাইকে আদিবাসী দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আদিবাসীরা তো সারাটা জীবন রাষ্ট্রকে দিয়ে গেলেন। কিন্তু রাষ্ট্র সেভাবে আদিবাসীদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারেনি।

এছাড়াও শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন কনা, রোবায়েত ফেরদৌস, শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী, পরিবেশকর্মী জুমলিয়ান আমলাই বম, কণ্ঠশিল্পী মাকসুদ, মাদল ব্যান্ডের হরেন্দ্রনাথ সিং, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি উজ্জল, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি জুয়েল চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি দেবশ্রী তনচংগ্যা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের প্রতিনিধি প্রমুখ।

সারাদিনব্যাপী ভার্চ্যুয়াল এ অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে আদিবাসীদের ব্যান্ড ও কণ্ঠশিল্পীরা নিজেদের গান এবং আদিবাসী নৃত্যশিল্পীরা আদিবাসী নাচ পরিবেশন করেন। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী জয়দেব রোয়াজা ভিজুয়াল আর্ট পারফর্ম করেন। ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী বাশিঁর সুরও পরিবেশিত হয়।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *