রাষ্ট্রের কাছে পুরনো আদিবাসী সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি

ময়মনসিংহের লোক মাত্রই ঘায়রা শামসুলের বিশেষত্বের কথা জানেন, জনে জনে মুখে মুখে তাঁর গারুয়ামির কথা আঞ্চলিক ইতিহাসে অলিখিতভাবে স্থায়ী আসন গেড়ে আছে, কেবল মৈমনসিংহ গীতিকায় স্থান পাওয়া বাকি। কলেজের শহর ময়মনসিংহে পড়তে এসে খোকা স্যারের (মফিজুননূর খোকা) কাছেই প্রথম বিখ্যাত এই লোকটার স্পেশিয়ালিটি সম্পর্কে ডিটেইলে জানতে পারি। লোকটা ছিলেন অসম্ভব রকমের জেদী, একরোখা, দুর্বিনীত স্বভাবের। যা বলতেন শত কঠিনের মাঝেও সেটি সম্পাদন করেই ছাড়তেন। ওয়াদা রক্ষায় যেন তিনি কলিযুগের যুধিষ্ঠির। যে বিষয়টি তাকে ‘গারুয়ামির বিশেষ মসনদে’ পাকাপোক্ত ভাবে বসিয়েছে সেটি, তিনি যা বলতেন একমাত্র সেটিই ঠিক বলে ধর্ত্যব্য জ্ঞান করতেন, বিপরীত কারো যুক্তি গ্রাহ্য করতেন না, মানতেন না। তিনি এমনই গারুয়া ছিলেন।

ঘায়রা শামসুল সম্পর্কে একটি বহুল চলিত ঘটনার প্রচলন আছে। একবার এক জনসভায় শামসুল সাহেব বক্তৃতাকালে ফস করে নাকি বলে ফেলেছিলেন- ‘৭১রে ৩০ কোটি শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশ পেয়েছি’। পাশে থাকা ভদ্রলোকটি মুখ রাখতে সঠিক তথ্য কানে কানে বলে দিয়েছিলেন, ৩০ কোটি নয়, ৩০ লাখ। কিন্তু তিনি ঠিক বেঠিকের ধার ধারেননি, যা বলেছেন তাই ঠিক। প্রতুত্ত্যরে তাৎক্ষনিক শামসুল সাহেব মাইক্রোফোন অন থাকা অবস্থাতেই বলেছিলেন, ‘কইছ্যি তো কইছ্যিই, একটাও কমাইতাম না’। এমন উচ্চ মার্গীয় গারুয়া ছিলেন তিনি। আমার বক্তব্য অন্যত্র, ব্যক্তির এই গারুয়ামির প্রভাব সার্কেলে থাকা মানুষ গুলোর উপর গিয়ে বর্তায়, তাদের সহ্য করতে হয়, পোহাতে হয় গারুয়ামির দুর্ভোগ। তা হয়তো সামষ্টিক বিচারে কিছু নয় কিন্তু ব্যক্তির গণ্ডি পেরিয়ে সব নাগরিকের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্র সরকার যখন কারো অধিকারের স্বীকৃতি না দিয়ে গারুয়ামি তালটিবালটি ফক্করামি শুরু করে তখন দুর্ভোগ দুর্যোগের মাত্রা কীরূপ ভয়াবহ হতে পারে তা অচিন্তীয়।

এখানে আমি রাষ্ট্রের গারুয়ামির কথা বলতে চাই। রাষ্ট্র গারুয়ামী করে মানতে চায় না যে, বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র। এই দেশ এককভাবে সংখ্যাগুরু জাতির স্পেসিফিক করে বললে বাঙালির একার নয়। না মানলেও জলের ন্যায় নির্মল সত্য তো এই যে, এদেশে বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির-ধর্মের মানুষ আবহমানকাল থেকেই গ্রাম্য মেলা সদৃশ বর্ণিল বৈচিত্র্য নিয়ে পাশাপাশি প্রতিবেশী হয়ে বসবাস করে আসছে।

দক্ষিন এশিয়ার নদী বিধৌত ৫৬ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন এই বাংলা ভূণ্ডে বাঙালি জাতি ছাড়াও আরো প্রায় পয়ঁতাল্লিশের অধিক জনজাতি আছে, যাঁরা পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে বিকশিত হওয়ার সমস্ত নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ঠ্য, স্বতন্ত্র পরিচয় লালন ধারণ করা সত্ত্বেও কেবলমাত্র পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় সুযোগ সমতার অভাবে বিকশিত হয়ে উঠতে পারেনি, পারেনি নিজেদের স্বকীয়তা মেলে ধরতে। কারণ জাতিরাষ্ট্রে জাতি হয়ে উঠা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন করে রাষ্ট্র। এই নিয়ন্ত্রনের দরুণ বাঙালি ভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মানুষ প্রান্তিক থেকে পরিণত হয়েছেন আরো প্রান্তিকে, নিঃস্ব থেকে আরো নিঃস্বে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানচিত্রে অ্যাপসেন্ট থাকা আদিবাসী মানুষ গুলো গরীবের মধ্যেও গরীব, দুঃখী মানুষের মাঝে ভর জনমদুঃখী। এইসব মানুষের জীবনে হতাশা, দুর্দশা, বঞ্চনা, বৈষম্য, নির্যাতন, না পাওয়া, হারানোর তীব্র যন্ত্রনা শরীরের চামড়ার মতোই নিত্যসঙ্গী। আদিবাসীরা যে মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করে সেখানে জীবনের সাথে যাপনের কোন সংযোগ নেই। এর বদল দরকার। এই জন্যেই চাই সাংবিধানিক স্বীকৃতি, অধিকারের সাংবিধানিক গ্যারান্টি। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকা মানে সংবিধানে আদিবাসীদের ভাষাগত, সাংস্কৃতি বৈশিষ্ঠ্যগত ও ঐতিহ্যবাহী ভূমির উপর প্রথাগত অধিকারের স্বীকৃতি। বাঙালি ভিন্ন সেইসব জাতিসত্তার সেমি অস্তিত্ব বাংলাদেশ রাষ্ট্র কলেবরে স্বীকার করলেও তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় আত্মপরিচয় প্রদানে কাবুলিওয়ালার পরিচয় দিয়েছে।

সংবিধান, যা রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়, সেখানে বাংলাদেশের সংবিধান অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় (আদিবাসীরা যে পরিচয়ে পরিচিত হতে চায়) প্রদান করেনি। সেইসব পরিচয়হীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ গুলো নিজেদের জাতি পরিচয়ের পাশাপাশি কমন মর্যাদা সম্পন্ন আদিবাসী পরিচয়ে পরিচিত হতে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করে, আদিবাসীরা আদিবাসী পরিচয়েই পরিচিত হতে চায়। অন্যের চাপিয়ে দেয়া কোন পরিচয়ে নয়। কিন্তু রাষ্ট্র এখানে খল ভূমিকায় অবতীর্ণ, রাষ্ট্র পরিচয়ের সীমারেখা বেঁধে দিয়ে এক জাতির একাধিপত্য জুলুম অনাচার জোরজবরদস্তি বৈষম্য, পরিচয়ের রাজনীতি জারি রেখেছে। অথচ বৈষম্য শোষণ নিপীড়ন দূরীকরণেই আমরা বাঙালি-আদিবাসী হাতে হাত, কাধেঁ কাধঁ রেখে সমতা, ন্যায্যতা আর মর্যাদাসম্পন্ন সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। যুদ্ধ শেষ হলে পর, দেশের সংবিধান রচয়নকালে দেখা গেল বাঙালি ভিন্ন অন্য জাতিসত্তার মানুষ গুলো সাংবিধানিক পরিচয় প্রাপ্তি থেকে হল বঞ্চিত। আমরা দেখলাম, দেশের প্রথম সংবিধান অর্থাৎ ’৭২রের সংবিধান কে দেশের অবাঙালি জাতিসমূহের জাতীয় পরিচয় মুছে ফেলার গভীর এক ষড়যন্ত্রের হাতিয়ারে পরিণত করা হল, লাগিয়ে দেয়া হল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে। যার বিরুদ্ধে ’৭২ সালে মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা (এমএন লারমা) রাষ্ট্রীয় দরবার গণপরিষদে প্রাতিষ্ঠানিক কায়দায় দুর্দান্ত সাহসের সাথে প্রতিবাদ করেছিলেন, বলেছিলেন ‘সংবিধাান হচ্ছে এমন একটা ব্যবস্থা যা, অনগ্রসর জাতিকে, পিছিয়ে পড়া ও নির্যাতিত জাতিকে অগ্রসর জাতির সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে আসার পথ নির্দেশ করবে। কিন্তু বস্তুতঃ পক্ষে এই পেশকৃত সংবিধানে আমরা সেই রাস্তার সন্ধান পাচ্ছি না (গণপরিষদ বিতর্ক, ১৯৭২)। ’৭২রে হারিয়ে ফেলা সেই পথের সন্ধান আমরা এখনো পাইনি। ইতোমধ্যেই সংবিধান পনেরো বার সংশোধিত হয়ে গেছে তবু দেশের অবাঙালি আদিবাসী জাতিসমূহ সাংবিধানিক পরিচয় লাভ করল না। বরং পঞ্চদশ সংশোধনীতে যা অর্জন করল তা ’৭২রের প্রাপ্ত রূপ।

আগেই উল্লেখ করা হয়ে গেছে, সংবিধানের সর্বশেষ পঞ্চদশ সংশোধনীতেও আদিবাসীদের আদিবাসী পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। বরং পুরনো রেকর্ড করা বেসুরো গান বাজিয়ে বলা হয়েছে ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন [সংবিধান: অনুচ্ছেদ ৬(২)]। বাঙালি ভিন্ন জাতি গুলোকে একই সাথে ‘উপজাতি’ ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ‘নৃ-গোষ্ঠী’ ‘সম্প্রদায়ের মানুষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জাতি পরিচয় পরিচিতির প্রশ্নে তালগোল পাকিয়ে রাষ্ট্র স্বয়ং আদিবাসী সমস্যাকে জটিল থেকে জটিলতর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। এর অবসান জরুরী, কেননা এ সমস্যা থেকেই উদ্ভূত হতে পারে আরো প্যাচাঁলো দুরূহ সমস্যা, এই সমস্যার জের ধরেই অদূর ভবিষতে ঘটে যেতে পারে অপেক্ষাকৃত বড় মাপের ঐতিহাসিক বিপর্যয়। রাষ্ট্রের ভুললে চলবে না, নিপীড়িত জাতি তার অস্তিত্ব মর্যাদার প্রশ্নে কখনো নীরব থাকে না, প্রতিবাদ প্রতিরোধ সংগ্রাম আন্দোলন বিদ্রোহ গড়ে তুলে। নিকট ভবিষতে আদিবাসীরা সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে বিদ্রোহী হয়ে উঠলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না, রাষ্ট্র স্বয়ং সাংবিধানিক স্বীকৃতি না দিয়ে আদিবাসীদের বিদ্রোহের পথেই ঠেলে দিচ্ছে না তো?

আমরা দেশের আদিবাসীরা ’৯৩ সাল থেকে সাধ্যের সবটুকু দিয়ে আদিবাসী সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছি কিন্তু রাষ্ট্রের কম্ভকর্ণগিরীর ফলে অধিকার স্বীকৃতি থেকে গেছে অধরা। এতে আশাহত হলেও আদিবাসীরা সংকল্পহীন নয়। আদিবাসীরা জানে কম্ভকর্ণকে কী করে জাগাতে হয়, না শুনলে কানে কী প্রকারে পানি ঢালতে হয় সে ব্যাপারেও আদিবাসীরা জ্ঞান রাখে। আদিবাসীরা হল দ্রোহের আলাম, চিরকালই আদিবাসী জীবন সংগ্রামের, উপনিবেশিক শাসন আমলে তথাকথিত শিক্ষিতজন যখন প্রতিবাদ প্রতিরোধের স্পর্ধা দেখাতেই পারেনি তখন আদিবাসীরা তাবৎ দুনিয়া তালিমকারী বৃটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, রচনা করেছে আন্দোলনের পথ। দেখা গেছে, এই পথ ধরেই পরবর্তীতে হেটেঁছে ভারতের অনেক প্রথিতযশা বিপ্লবী। ইতিহাসের নির্মম ট্র্যাজেডি বিদ্রোহের সূচনাকারী দেশের আদিবাসী সম্প্রদায় জাতিরাষ্ট্রে অদ্যাবধি যথাযথ স্বীকৃতি লাভ করেনি।

আদিবাসী সম্প্রদায় আদিবাসী পরিচয়ে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে চায়, এখানে রাষ্ট্র কেন বাধঁ সাজে তা এক জাতি পরিচয়ের নিগড়ে দেশকে চালিত করার তৎপরতার মাঝেই বোঝা যায়। রাষ্ট্র সরকার আদিবাসী সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানে কেন গড়িমসী করছে? আদিবাসী শব্দে ভয় আতঙ্ক কেন? বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই তো আদিবাসী শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে (বৈষম্য, উপজাতি, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী: এরপর কীÑ শাহানা হুদা)। স্বাধীনতাত্তোর কালে আদিবাসী প্রত্যয়টি দিয়ে যে মানুষ গুলোকে পরিচিত করানো হতো বিভিন্ন সময়, মানুষ গুলোর তো বদল ঘটেনি, এলিয়েন হয়ে যায়নি, তবে শব্দের বদল কী রূপে ঘটতে পারে। আদিবাসীরা যে সাল থেকে নাম আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করছে তার অনেক আগে থেকেই আদিবাসী শব্দের প্রচলন আছে। এখন আদিবাসীরা স্বয়ং যখন আদিবাসী পরিচয় নিয়েই দেশ বিদেশে দাঁড়াতে চাইছে তখন রাষ্ট্র বলছে যে দেশে আদিবাসী নেই! যারা আছে তারা উপজাতি, বলি, তথাকথিত এই উপজাতিরা কোন জাতির ‘উপ’?

একদিকে মোরগ ডাকা ভোরে পিতরের মতো অস্বীকার করে বলা হচ্ছে দেশে আদিবাসী নেই, অন্যদিকে খোদ সরকারের বিভিন্ন নীতিমালায় আদিবাসী শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এরূপ রাষ্ট্র নিজেই নিজের মুখাপেক্ষী অবস্থানে অবস্থান নিয়ে আছে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলা আছে, “আদিবাসী শিশুরা যাতে স্কুলে তাদের মাতৃভাষা শিখতে পারে তার ব্যবস্থা করা”। বাক্যটি কিন্তু মুক্ত নয়, মাতৃভাষা শেখা না মাতৃভাষায় শেখা? দুটো এক জিনিস নয়। অনেকের মতে, কথাটা হওয়া উচিত, মাতৃভাষায় শেখার ব্যবস্থা করা (প্রশান্ত ত্রিপুরা)। যাহোক, জাতীয় শিক্ষানীতি আদিবাসীদের কথা স্বীকার করে নিচ্ছে কিন্তু খোদ সংবিধান বলছে যে, দেশে আদিবাসী বলে কিছু নেই। অনুরূপভাবে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের প্রশমন-১ শাখা কর্তৃক স্বারক নং সংস্থাপন (এডি-২) ৩৯/৯১-১৪৩ তারিখ ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ মূলে আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ ’৯৩ সাল থেকে শুরু করা আদিবাসী নাম শব্দের দাবি উত্থাপনের আগে সরকার স্বয়ং আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবেই চিহ্নিত উল্লেখ করেছে। স্বারক নামায় লেখা হয় “চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী ও উপজাতীয় চাকরির বয়সসীমা স্বাভাবিক বয়সসীমার তুলনায় ১০ বৎসর এবং শ্রম সাধ্য কর্মের ক্ষেত্রে ৫ বৎসর পর্যন্ত শিথিল করা হইয়াছে”। তেমনিভাবে, ১৯৯৫ সালে জাতীয় সংসদে প্রণীত ১২ নং আইনে এবং এ আইনের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ১২ জুলাই ১৯৯৫ লেখা সরকারী পরিপত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ‘আদি গিরিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আদিবাসী শব্দের রাষ্ট্রীয় পূর্ব ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও সংবিধানে আদিবাসী শব্দের প্রয়োগ, স্বীকৃতি না থাকাটা রাষ্ট্রের শামসুল গারুয়ামীর স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।

রাষ্ট্র, সরকারের সাথে রাজনৈতিক দল গুলোর মাঝেও আদিবাসী শব্দের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। আওয়ামীলীগ বিরোধী দল থাকাকালীন সময়ে দলীয় সভ্য শেখ হাসিনা ’৯৩ সালে এবং ক্ষমতায় আরোহকালীন প্রধানমন্ত্রী সময় ২০০০, ২০০৯ সালে বেসরকারীভাবে পালিত হওয়া আদিবাসী দিবসে দেয় শুভেচ্ছা বাণীতে আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। আওয়ামীলীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যেটাকে আমরা দিন বদলের সনদ বলেই জানি, সেই দিন বদলের সনদে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিসহ দেশের আদিবাসী সম্প্রদায়কে আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেই আওয়ামীলীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ভোল পাল্টে আদিবাসী শব্দ পাল্টে অবমাননাকর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শব্দ কীরূপ ব্যবহার করেন। শুধু শেখ হাসিনাই নন, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিতব্য আদিবাসী দিবসে আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে মেনে নিয়েই শুভেচ্ছা সংহতি বার্তা দিয়েছেন। সাবেক দাপুটে তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন সাহেবও ২০০৮ সালে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে বাণী দিয়েছেন, এরকম সরকারের মাননীয় অনেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা আদিবাসী বিভিন্ন কর্মসূচীতে এসে সংহতি জানিয়েছেন, আদিবাসী সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবির সাথে সুরে সুর মিলিয়েছেন, কার্যত পরবর্তী সময়ে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে সরল আদিবাসীদের সাথে ডিগবাজী খেলা খেলেছেন। এ খেলার শেষ কোথায় জানি না। ওয়াদা দিয়ে তা রক্ষা করাকে আমরা অবশ্য কর্তব্য, ফরজ বলেই জানি, ওয়াদা দিয়ে তা রক্ষা করতে না পারাটা ইসলাম বিধান বলে ওয়াজিব, গুনাহ। আদিবাসীদের বেলায় রাষ্ট্র, সরকার কত প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ভুল ভুলিয়ে মিষ্টি কথায় ভুলিয়েছে অবশেষে নিম বিমাতাসুলভ আচরণ করে অধিকারের জিজ্ঞাসা নিসংকোচে এড়িয়ে গেছে।

চারপাশে সক্রিয় প্রাতিষ্ঠানিক অপ্রাতিষ্ঠানিক ধান্ধাবাজ টাউট বাটপার ফক্কর গোষ্ঠীর শকুনি তৎপরতার দরুণ আদিবাসীরা দিনকে দিন নাজেহাল হয়ে পড়ছে, অস্তিত্বের অন্তিম পর্যায়ে এসে এই বোধোদয়ে উপনীত, অধিকারের স্বপক্ষে প্রয়োজন কঠিন জীবনজয়ী সংগ্রাম। যে সংগ্রাম আদিবাসী সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ অন্যান্য ন্যায্য অধিকারের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে পারে। গণতান্ত্রিক হিসেবে দাবিদার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উচিত আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া। স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করার জন্য মালয়েশিয়ার মতো সব জাতিগোষ্ঠী, সম্প্রদায়-ধর্মের মানুষের সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকা প্রয়োজন। আর যতোক্ষন পর্যন্ত আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা না হবে নাগরিক অধিকারের বিষয়ে ততোক্ষণ পর্যন্ত সংবিধান পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারবে না।
লেখক: উন্নয়ন ডি. শিরা, ই-মেইল:unnayan1432@gmail.com

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *