করোনা সংকটে আদিবাসী দিবসের অধিকাংশ কর্মসূচি অনলাইন মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে

করোনার চলমান সংকটে সকল ধরণের স্বাভাবিক কার্যক্রম যেভাবে ব্যাহত হচ্ছে তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না আগামীর আদিবাসী দিবসের আয়োজনও। ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। প্রতিবছরের ন্যায় আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠন জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা কর্মসূচি হাত নিতে শুরু করেছে। কিন্তু চলমান বাস্তবতাকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর কারণে অধিকাংশ কর্মসূচি অনলাইন ভিত্তিক হবে বলে জানিয়েছেন আদিবাসী নেতৃবৃন্দ। তবে সীমিত পরিসরে বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া পোস্টার, স্যুভেনিয়র, ক্রোড়পত্র, লিফলেট ইত্যাদিও প্রকাশ করা হবে।

এদিকে জাতিসংঘ এ বছর ২০২০ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করেছে- “COVID-19 and Indigenous Peoples’ Resilience”। জাতিসংঘের উক্ত প্রতিপাদ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশের আদিবাসীদের সর্ববৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে “কোভিড-১৯ মহামারীতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম”।

জাতিসংঘের এই প্রতিপাদ্য বিষয় সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে যে, শীর্ষস্থানীয় গবেষণা সংস্থার গবেষণায় পরিবেশগত ক্ষতি ও মহামারীর মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে উঠে এসেছে। পরিবেশগত ক্ষতির কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ কোভিড-১৯ না হওয়ার আগে মহামারীর আশঙ্কা করছিলেন। তাই মাহমারী সংক্রমণ রোধে বর্তমানে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও তাদের সনাতনি জ্ঞানব্যবস্থা রক্ষা করা খুবই জরুরী। বিশ্বের ৮০% জীববৈচিত্র্য ভান্ডার আদিবাসী অধ্যুষিত ভূখন্ডগুলোতে অবস্থিত। প্রকৃতির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ও ভবিষ্যত মহামারীর ঝুঁকি কমাতে আদিবাসীদের জ্ঞানব্যবস্থা পথ প্রদর্শন করতে পারে। আদিবাসীরা এই মহামারী মোকাবেলায় তাদের নিজস্ব সমাধানের পথ খুঁজছে। তারা তাদের প্রথাগত জ্ঞানব্যবস্থা ও পদ্ধতিকে ব্যবহার করে স্বেচ্ছামূলক সঙ্গনিরোধ (আইসোলেশন), তাদের এলাকাকে বন্ধকরণ তথা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ঘোষিত “কোভিড-১৯ মহামারীতে আদিবাসীদের জীবন জীবিকার সংগ্রাম” প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এন্ড ডেভেলাপমেন্ট (এএলআরডি), উত্তরবঙ্গের জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন সংস্থা, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদ (পাসকোপ), সাতক্ষিরা জেলার সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থা (সামস), কক্সবাজার শাখার আদিবাসী ফোরাম, জনউদ্যোগ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সেসব কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম হলো-
৫ আগস্ট আদিবাসীদের মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশন “দ্রুত চাহিদা নিরূপন প্রতিবেদন: বাংলাদেশের আদিবাসী ও ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠীর উপর কোভিড-১৯-এর প্রভাব” শীর্ষক অনলাইন আলোচনা সভা আয়োজন করবে।

এছাড়া ৬ আগস্ট বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করবে।

৭ আগস্ট অস্ট্রেলিয়া আদিবাসী স্কলার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আসাব) ”কোভিড-১৯ এন্ড এন্ডিজিনাস পিপলস রেসাইলিয়েন্স” শীর্ষক অনলাইন আলোচনা সভা আয়োজন করবে।

৮ আগস্ট এএলআরডি জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর সহউদ্যোগে অনলাইন আলোচনা সভা আয়োজন করবে।

৯ আগস্ট বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম দিনব্যাপী কর্মসূচি আয়োজন করবে। তার মধ্যে অনলাইন আলোচনা, বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তির শুভেচ্ছা বার্তা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অনলাইন পোস্টার, ‘সংহতি’ সংকলন ও জাতীয় দৈনিকে ’ক্রোড়পত্র’ প্রকাশ ইত্যাদি রয়েছে। ফোরামের অনলাইন আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে বিকাল ৫:০০ ঘটিকায় বলেও জানিয়েছে আদিবাসী ফোরাম নেতৃবৃন্দ।

এদিকে ৯ আগস্ট উপলক্ষ্যে উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রাজশাহী, নওগাঁ ও ঠাকুরগাঁতে “কোভিড-১৯ মহামারীতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম” শীর্ষক আলোচনা সভা ও সমাবেশের আয়োজন করবে বলে নিশ্চিত করেছেন আইপিনিউজকে।

এছাড়া ৯ আগস্ট জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন সংস্থা মধুপুরের আদিবাসীদের ভূমি অধিকারসহ বিভিন্ন দাবিতে টাঙ্গাইল জেলার জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করবে বলে আইপিনিউজকে জানিয়েছে।

এছাড়া একই দিন পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদ (পাসকোপ) সিলেটে “কোভিড-১৯ মহামারীতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম” শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজন করবে বলেও জানা গেছে।

সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থা (সামস) ও উক্ত দিবসকে সামনে রেখে সাতক্ষিরার শ্যামনগর উপজেলায় “কোভিড-১৯ মহামারীতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম” শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজন এবং শ্যামনগর উপজেলার নির্বাহী অফিসারের বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ।

একই দিনে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কক্সবাজার শাখা কক্সবাজার জেলায় “কোভিড-১৯ মহামারীতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম” শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজন এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের বরাবরে আদিবাসীদের বিভিন্ন অধিকারের দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করবে বলে আইপিনিউজকে নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়া ১০ আগস্ট ঝিমিত ঝিমিত গ্রুপের একটি অনলাইন প্লাটফর্মে আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে কবিতা আবৃত্তি ও গান পরিবেশন করবে। তাদের প্লাটফর্ম থেকে সন্ধ্যা ৫:০০ টা থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত এ লাইভ চলবে বলেও জানান আয়োজকরা।

এছাড়া আদিবাসী দিবসকে কেন্দ্র করে ১২ আগস্ট বিকাল ৫:০০ টা থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত জনউদ্যোগ ঢাকা থেকে “কোভিড-১৯ মহামারীতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম” শীর্ষক অনলাইন আলোচনা সভা আয়োজন করবে।

এ দিবসকে কেন্দ্র করে ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক যৌথভাবে “করোনা মহামারী কালে আদিবাসী নারীদের জীবন ও জীবিকা” শীর্ষক অনলাইন আলোচনা সভা আয়োজন করবে বলেও জানিয়েছেন উক্ত সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

এছাড়া আগামী ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) নিজস্ব অফিসে “নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য” বিষয়ক এক অনলাইন আলোচনা সভা আয়োজন করবে বলেও নিশ্চিত করেছেন আইপিনিউজকে।

এদিকে আদিবাসী ফোরাম নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, আদিবাসী দিবস উপলক্ষে তাঁদের সকল অনলাইন কার্যক্রম অনলাইন সংবাদমাধ্যম আইপিনিউজ এর অনলাইন ফেসবুক পেইজ থেকে পরিচালনা করবে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এক রিজুলেশনের মাধ্যমে ৯ই আগষ্টকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জাতিসংঘের ‘বৈষম্য প্রতিরোধ ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা বিষয়ক সাব-কমিশন’ অধীনে প্রতিষ্ঠিত ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটি’র প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮২ সালের ৯ আগস্ট, যা ছিল আদিবাসী বিষয়ে জাতিসংঘের প্রথম আনুষ্ঠানিক সভা। সেই দিনকে স্মরণে রেখে ৯ আগস্টকে বিশ্বের দেশে দেশে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা ও প্রসারের লক্ষ্যে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *