আজ ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসঃ নানা আয়োজনে সিধু-কানুকে স্মরণ

“সিদো-কানহু খুড়খুড়ি ভিতরে
চাঁদ-ভায়রো ঘোড়া উপরে
দেখ সে রে! চাঁদরে! ভায়রো রে!
খোড়া ভায়য়োরে মুলিনে মুলিনে।”

অর্থাৎ সিধু-কানু পালকিতে এবং চাঁদ-ভৈরব ঘোড়ায় চড়ে বিদ্রোহীদের পাশে। আর এভাবেই বিদ্রোহীদের উৎসাহ দিতেন ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়করা। সেই উৎসাহ ও উদ্দীপনা পেয়ে বিদ্রোহীদের নতুন আশা ও হৃদয়ে সাহস সঞ্চারণ হতো বলে উল্লেখ আছে উক্ত সাঁওতাল গানে। তাই সাঁওতাল আদিবাসীরা এখনো এই গান গেয়ে ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের ফুলকি ছড়ায় নতুন দিনের শপথে।

আজ ৩০ জুন ২০২০। ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম সশস্ত্র গণসংগ্রাম এটি। সাঁওতাল আদিবাসীদের সেদিনের বিদ্রোহ এবং তাঁদের দেশপ্রেম, সংগ্রাম, আদর্শ ও আত্মত্যাগ পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। উদ্দীপ্ত সাহস ও উদ্দীপনায় প্রাণিত করেছিল পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। তাই সাঁওতাল বিদ্রোহ এখনো মুক্তিকামী মানুষের কাছে দ্রোহের ফুলকি ছড়ায় এবং সাহস সঞ্চার করে।

সাঁওতাল বিদ্রোহের পেছনে যে দুই নায়ক ভাইকে স্মরণ না করলে নয় তাঁরা হলে —সিধু মুরমু ও কানু মুরমু। এ দুই বীরের স্মরণে ও শ্রদ্ধায় সাঁওতালদের অনেকেই এই দিনটিকে সিধু-কানু দিবসও বলে থাকেন অনেকেই। মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের এ দেশীয় সামন্তীয় দালাল, অত্যাচারী জমিদার, মুনাফা লোভী এবং তাদের পালিত লাঠিয়াল বাহিনী, দারোগা-পুলিশের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সাঁওতাল নেতা সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব—এই চার ভাইয়ের নেতৃত্বে রুখে দাঁড়ান তখনকার সাঁওতালরা।এই চার বীরের সাথে ছিলেন তাঁদের দুই বোন ফুলোমনি মুরমু ও ঝালোমনি মুরমু। অবিভক্ত ভারতের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও ভাগলপুর জেলার প্রায় দেড় হাজার বর্গমাইল এলাকায় এ বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এই অঞ্চলটি ‘দামিন-ই-কোহ্ বা ‘পাহাড়ের ওড়না’ এলাকা হিসেবে পরিচিত। সেই ভাগলপুরের ভগনা ডিহি গ্রামের সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব—এই চার ভাইয়ের নেতৃত্বেই দামিন-ই-কোহ্ অঞ্চলে সংঘটিত হয় এই ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ। ১৮৫৫ সালের আজকের এই দিনে ভগনা ডিহি গ্রামে সেখানকার ৪০০ গ্রামের প্রতিনিধি ও ১০ হাজার সাঁওতাল কৃষকের এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।উক্ত জনসভাতেই ভাষণ দেন দুই ভাই সিধু-কানু । এ সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, ব্রিটিশ অত্যাচারী শোষকদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবার ঐক্যবদ্ধ লড়াই ব্যতীত কোনো বিকল্প নেই । ভাষণে ঘোষণা দেন, এখন থেকে কেউ জমির কোনো খাজনা দেবেন না এবং প্রত্যেকেরই যত খুশি জমি চাষ করার স্বাধীনতা থাকবে। আর সাঁওতালদের সকল প্রকার ঋণ এখন থেকে বাতিল হবে। এছাড়া তাঁরা মুলুক দখল করে নিজেদের স্ব নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার কায়েম করে নিজেদের শাসন জারী রাখবেন।

সেদিনই সেই জনসভায় একত্রিত ১০ হাজার সাঁওতাল কৃষক শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েছিলেন। জমায়েত হওয়া সেই ভগনা ডিহি গ্রামের ওই সভার শপথ ছিল সাঁওতালদের বিদ্রোহের শপথ এবং দ্রোহের প্রতিজ্ঞা। সেই শপথের মূল দাবিটিই ছিল- ‘জমি চাই, মুক্তি চাই’। তাঁরা অত্যাচারী জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ সরকারের শাসন-শোষণ ও জুলুম থেকে মুক্ত হয়ে শান্তির সঙ্গে নতুনভাবে মুক্ত জীবন ধারণ করার সংকল্প নিয়ে সাঁওতাল কৃষকরা সেদিন জনসভা স্থল ত্যাগ করেন। সেই সাথে তাঁদের এ বিদ্রোহের সঙ্গে যোগ দেন সেই এলাকার শোষণ ও বঞ্চনার শিকার বাঙালি ও বিহারের হিন্দু-মুসলমান গরিব কৃষক এবং কারিগরেরা। যার ফলে ক্রমেই সাঁওতাল বিদ্রোহ হয়ে উঠে সব সম্প্রদায়ের এবং গরিব জনমানুষের মুক্তির সংগ্রাম। যাঁর জন্য সাঁওতাল বিদ্রোহ এখনও শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক দ্রোহী মাইলফলক।

তাই বিদ্রোহের এই দিনটিকে স্মরণ করে সাঁওতালরা এবং সকল মুক্তিকামী মানুষ এ দিনটিকে স্মরণ করে শ্রদ্ধার সংগে। নিপীড়িত মানুষ প্রতিরোধের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয় এই দিনে। বিদ্রোহী দুই ভাই সিধু-কানুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পন, প্রতিবাদী শোভাযাত্রা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ও বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলের সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসীরা ও দেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক সিধু-কানুসহ সব আত্মদানকারীকে। দ্রোহ ও প্রতিরোধের শপথে সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসটিকে উৎযাপন করে থাকে।

এদিকে এই ঐতিহাসিক বিদ্রোহের ১৬৫তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আদিবাসী সাংস্কৃতিক পরিষদ, আদিবাসী নারী পরিষদ, উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম, আদিবাসী মুক্তি মোর্চা, নাচোল আদিবাসী একাডেমি, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), নওগাঁ জেলা শাখা বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাটের বিভিন্ন স্থানে সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস পালন করছর নানাভাবে।

এ ছাড়া উক্ত বিদ্রোহের স্মরণে সাওতাল আদিবাসীদের গানের দল “সেঙ্গেল” ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিদ্রোহ দিবসের ওপর আলোচনা ও গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে বলে আইপিনিউজকে জানিয়েছে। উক্ত লাইভ আলোচনা ও গানের অনুষ্ঠানে ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সাঁওতাল সাংস্কৃতিক নেতারা অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

এছাড়া সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস উপলক্ষ্যে সিধু-কানুর স্মরনে আদিবাসী অনলাইন নিউজ পোর্টাল আইপিনিউজও প্রতিবাদী গানের আয়োজন করবে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *